শান্তনু দত্তগুপ্ত: শিরোনাম হতেই পারত, ‘একটি ভাইরাল ভিডিও এবং নির্বাচন কমিশন’। নেপথ্য কারণ অবশ্যই ম্যাডাম রানি কুমারি। সাংবাদিক অজিত অঞ্জুমের ইউটিউব চ্যানেলে দেখা যাচ্ছে, এই বুথ লেভেল অফিসার ইনিউমারেশন ফর্মের দিস্তা নিয়ে বসে আছেন। পরপর সই করছেন। এবং পছন্দ মতো ভোটারের নাম তালিকায় রাখছেন, বা বাদ দিচ্ছেন। ভোটারের নামের পাশে ইচ্ছেমতো লিখছেন ‘মৃত’ বা ‘স্থানান্তরিত’। ইনিউমারেশন ফর্ম কী? ভোটার তালিকার ইন্টেনসিভ রিভিশনের জন্য প্রয়োজনীয় গীতা, কোরান, বাইবেল। এটি ফিল আপ করে, ছবি লাগিয়ে আপলোড করতে হচ্ছে সার্ভারে। তারপর বিচার শুরু কমিশনের।
শিরোনাম হতেই পারত, ‘ইন্টেনসিভ রিভিশনে ভূতের হট্টগোল’। কারণ, মৃত মানুষ বেঁচে উঠছে। শর্মাজি অনলাইনে ভোটার লিস্ট দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন, তাঁর বাবা এবং মা দু’জনেই বেঁচে উঠেছেন। এতে তিনি খুশি নন। বরং তাজ্জব।
বাবা চলতি বছরই ২৫ জানুয়ারি মারা গিয়েছেন। আর মা ছ’বছর আগে। এ কী ভূতুড়ে কাণ্ড রে বাবা! বিএলও’র সঙ্গে যোগাযোগ করলে ওই নির্বাচনী অফিসার সাফ বললেন, টেনশন নিচ্ছেন কেন? পরে ঠিক করে নেবেন। পরে কবে? ভোট মিটলে? তার মানে শর্মাজির বাবা-মা দু’জনেই এবার ভোট দেবেন! প্রশ্ন হল, কাকে?
শিরোনাম হতেই পারত, ‘সেনা অফিসারের ফর্মেও অটো-সিগনেচার!’ পোস্টিং তাঁর যোধপুরে। স্ত্রীও সেখানেই থাকেন। বিহারে থাকেন শুধু অফিসারের মা। ছুটি নিয়ে এলেন। বিএলওকে ফোন করে বললেন, ‘কোথায় যাব?’ বিএলও মহাশয় প্রথমে বললেন, স্কুলে আসুন। কারণ, তিনি একটি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। স্বামী-স্ত্রী সেখানে গিয়ে শুনলেন বিএলও নেই। বাড়িতে আছেন।
আবার ছুটলেন শিক্ষকের বাড়িতে। যে ফর্ম তিনি মায়ের কাছে রেখে এসেছিলেন, সেটি ফিল আপ করে, ছবি সাঁটিয়ে, সই করেই এনেছেন সেনা জওয়ান। বিএলও শুধু সেটা নেবেন, আর আপলোড করবেন। কিন্তু বিএলও’র সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারলেন, তাঁর গোটা পরিবারের ফর্ম আপলোড হয়ে গিয়েছে। সই কে করেছেন? বিএলও মাথা নিচু করে স্বীকার করলেন, তিনিই করেছেন। আর মায়ের আঙুলের ছাপ? অন্য কেউ একজন দিয়েছে। দোষ স্বীকার করলেন বিএলও। বললেন, আমার কিছু করার ছিল না। উপরতলা থেকে নির্দেশ এসেছিল, সব ফর্ম তাড়াতাড়ি ফিল আপ করে আপলোডের জন্য। কে সেই উপরতলা? বিডিও? জেলাশাসক? কোনও নেতা?
এই একটিও শিরোনাম না হয়ে বিরোধীদের খোঁচা কেন? কারণ একটাই—লাগাতার ইস্যু হাতে পেয়েও রাজনীতির ময়দানে কাজে লাগাতে না পারা। গত পাঁচ বছরে কী দেয়নি মোদি সরকার? মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, জিএসটি, নোট বাতিল, অপরিকল্পিত লকডাউন, রাফাল, কর্পোরেট বন্ধুর অনিয়ম, মেরুকরণ, সড়ক দুর্নীতি, এজেন্সিকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগানো, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, এনআরসির নামে বাঙালিদের হেনস্তা, ইন্টেনসিভ রিভিশনের নামে প্রকৃত ভোটার বাদ...। কিছু বাদ গেল? হিসেবটা আমাদেরই করতে হবে। মাথাভারী কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বিরোধীদের দিয়ে হবে না। হলে, এতদিনে তার ছিটেফোঁটা প্রভাব দেখা যেত আর্থ-সামাজিক ক্যানভাসে। শাসককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো কর্মসূচি, বিবৃতি দিতে বাধ্য করা, জনবিরোধী নীতি থেকে পিছু হটা। সাদা চোখে যা দেখা যায়, তাতে বিরোধীদের কাজ কিছুটা করছে বিচার ব্যবস্থা। তারা বরং প্রশ্ন তুলছে বিজেপি সরকারের ‘কর্মকাণ্ড’ নিয়ে। নির্বাচনী বন্ড দুর্নীতি নিয়ে। বিরোধী নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছভাবে এজেন্সিকে কাজে লাগানো নিয়ে। ১০০ দিনের কাজ বছরের পর বছর বাংলায় বন্ধ থাকা নিয়ে। পলিসি থেকে সরতে বাধ্য হয়েছে সরকার... কৃষক আন্দোলনে। নাগরিকত্ব নিয়ে জুলুমবাজি বন্ধ হয়েছে... আম জনতার লাগাতার বিক্ষোভে। বিরোধীদের ভূমিকা তাতে কতটা ছিল বা আছে? ইন্টেনসিভ রিভিশনের নামে বিহারে যা চলছে, তা তো গোটা দেশের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। তারপরও ক’টা কর্মসূচি নিয়েছে কংগ্রেস সহ
তামাম বিরোধীরা? কমিশন অভিযান হয়েছে? স্তব্ধ হয়েছে সরকারি দপ্তরে বসে রাজনৈতিক কাজ কারবার? জাতীয় নেতারা আসলে এখন টেক স্যাভি। তাঁরা বলছেন, ওই তো সোশ্যাল মিডিয়ার হ্যান্ডলে শেয়ার করেছি। তাতেই ভোট হয়ে যাবে তো? গায়ে রোদ না লাগালে, চটির ভাঁজে পায়ের পাতা ছড়ে না গেলে রাজনীতি হয় না। এই সহজ সত্যটা আমাদের বিরোধী বাবুদের কিছুতেই মগজে ঢুকছে না। বাঙালি ইস্যু নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়াইটা দিচ্ছেন। কিন্তু জাতীয় পরিসরে এই প্রতিবাদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য কি বাকি বিরোধীদের কোনও কর্তব্য নেই? তাঁরা বলবেন, করছি তো! ওই সোশ্যাল মিডিয়ায়।
নরেন্দ্র মোদি একটা বিষয় প্রমাণ করে ছেড়েছেন, এই মহাজোট ইন্ডিয়ার কোমরে জোরটাই নেই। হঠাৎ শোনা যায়, একটি দল জোটমঞ্চ ছেড়ে দিয়েছে। আবার শোনা যায়, ছেড়ে দেওয়া একটি দল ইন্ডিয়ায় ফিরে এসেছে। ছ’মাস পর আচমকা শোরগোল, জোটের বৈঠক আছে। বিরোধিতার কী নমুনা! বিহারে খুল্লামখুল্লা অভিযোগ, যে আসনগুলিতে লালুপ্রসাদ যাদবের আরজেডি শক্তিশালী, সেই সব কেন্দ্রেই জোর কাটাছেঁড়া চলছে ইন্টেনসিভ রিভিশনের নামে। আসন্ন ভোটে একের পর এক আসনে আরজেডি যদি খুব সামান্য ব্যবধানে হেরে যায়, তাহলে কিন্তু তখন হাত কামড়ানো ছাড়া অন্য কিছু করার থাকবে না। অস্ত্র ধীরে ধীরে হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। অস্ত্র মানে? প্রাথমিকভাবে অবশ্যই ইনিউমারেশন ফর্ম। এখানে একটা টেকনিক্যাল প্রশ্ন আছে। কমিশন প্রত্যেক ভোটারের জন্য ফর্ম ইস্যু করছে। ধরা যাক, বিএলও আপনার বাড়ি গিয়ে আপনার জন্য নির্ধারিত ফর্ম দিয়ে এসেছেন। সেই ফর্ম ফিল আপ করে জমা দেওয়ার আগে তাহলে কীভাবে তা আপলোড হয়ে যাচ্ছে? যেটা ওই সেনা জওয়ানের সঙ্গে হয়েছে! উত্তরটা বেশ মজাদার। প্রত্যেক ভোটারের জন্য দু’টি ফর্ম বিএলও’র হাতে দিচ্ছে কমিশন। একটি ফিল আপ করিয়ে জমা নেওয়ার জন্য, আর অন্যটি অ্যাকনলেজমেন্ট কপি। নজর করার মতো বিষয় হল, সিংহভাগ ক্ষেত্রেই বিহারে অ্যাকনলেজমেন্ট কপি কেউ পাচ্ছেন না। সেটাই এক শ্রেণির অফিসার ফিল আপ করে দেদার আপলোড করে চলেছেন। দেখার কেউ নেই। আর দেখলেও, বলার কেউ নেই। একুশে আইনের নতুন ফরম্যাট। একুশ দফা নাকে খত দিলেও প্রকৃত ভোটারের মর্যাদা আইন মাফিক পাওয়া যাবে না। সেটা ঠিক করবেন বিএলও এবং তাঁর উপরওয়ালারা। চোখ বুজে উবু, দশ, কুড়ি, তিরিশ... হেঁকে।
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই। আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্লোগান? ‘পরিচয়পত্র ছাড়া ভোট নয়।’ নো এপিক, নো ভোট। ৩২ বছর পর আজ আরও একবার ইস্যু ভোটার। ভোটার তালিকা। পরিচয়পত্র। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! এখন বিহার। কাল বাংলা। তারপর কিন্তু গোটা দেশ। বিহার যা ছবি দেখাল, তাতে গোটা দেশের ভোটার মানচিত্র বদলাতে চলেছে। এখনই সতর্ক না হলে। শাসক দেখছে, তারা যা করছে সেটাই নিয়ম। তারা যা বলছে, সেটাই আইন। প্রতিবাদ আসছে, তবে তা গায়েই লাগছে না। মিনমিন করে আর যাই হোক, ভারতে রাজনীতি হয় না। রাহুল গান্ধীরা এটা যে কবে বুঝবেন, আর বুঝতে বুঝতে আরও ক’টা ভোট চলে যাবে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। ভোটার তালিকা কিন্তু বিরোধীদের হাতে পাহাড়প্রমাণ ইস্যু তুলে দিয়েছে। তারা কি সেটা বুঝতে সক্ষম? তাহলে পথেঘাটে, কমিশনে, সরকারের অন্দরে বা সংসদে এই আঘাতের প্রত্যাঘাত কোথায়? নজরে পড়ছে না তো! প্রতিবাদের স্বর যদি পাটনা থেকে দিল্লি পর্যন্ত শোনা যেত, তাহলে ব্যাকফুটে যেত সরকারও। যে আধার, ভোটার, রেশন কার্ডকে সুপ্রিম কোর্ট বলার পরও মান্যতা দেওয়ার প্রয়োজন মনে হচ্ছে না, সেটাই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করত। কিন্তু না, আমাদের জাতীয় স্তরের বিরোধীরা এখনও ঠান্ডাঘরে বসে আপেল খেতে খেতে এক্স হ্যান্ডলে দুটো পোস্ট করতেই পছন্দ করবেন।
বিহারের সমীকরণ কিন্তু গত বিধানসভা ভোটের মতো আর নেই। পাল্টি খেতে খেতে নীতীশ কুমার তাঁর রেপুটেশন তলানিতে নিয়ে গিয়েছেন। এখনও জেডিইউয়ের যত অন্ধ ভক্ত আছে, তারা আবার বিজেপির দাদাগিরি একেবারে সহ্য করতে নারাজ। তারা মনে করছে, নীতীশজিকে নিয়ে যা খুশি তাই করছে বিজেপি। আবার বিজেপির একাংশ মনে করছে, নীতীশ কুমার বেঁচে রয়েছেন তাদেরই দয়ায়। রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা তলানিতে। কাজ নেই। নুন আনতে পান্তা ফুরোচ্ছে। অনগ্রসরদের মাথায় তুলতে যাওয়ায় বেজায় চটে রয়েছে উচ্চবর্ণ। এবং অবশ্যই তেজস্বী যাদব সাধারণ জনতার মধ্যে একটা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে ফেলেছেন। অবস্থা যে সুবিধার নয়, সেটা বুঝেছে বিজেপিও। তাই কাজ চলছে জোরকদমে। নতুন ভোটার লিস্টে নির্বাচন করাতে পারাটাই যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সেরা চাল। বিরোধীরা দাবি করছে, প্রকৃত ভোটার বাদ যাচ্ছে। বহিরাগত ঢোকানো হচ্ছে। আর সেটাও কেন্দ্র বেছে বেছে... যে সব জায়গায় বিজেপি বিরোধীরা শক্তিশালী, সেখানেই। কিন্তু ওই দাবি পর্যন্তই। গলা না চড়ালে এখন হলুদ ট্যাক্সি পর্যন্ত গন্তব্যে যেতে চায় না! আর এ তো সরকার। তাও বিজেপির। সময় এখনও আছে। আমাদের জাতীয় স্তরের বিরোধী নেতা এবং তাঁদের সভাসদরা এবার একটু ময়দানে নামুন। আওয়াজ তুলতে হবেই... যাতে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রত্যেকটা আর্তি পৌঁছে যায় শাসকের অন্দরমহলে। এখনও যদি না পারেন? তাহলে আশ্রমে গিয়ে খোল-করতাল বাজানো প্র্যাকটিস করুন। ওটাই আপনাদের ভবিষ্যৎ।