মৃণালকান্তি দাস: কার্টে ব্লঁশ! নিরাপত্তার জন্য যা প্রয়োজন, তাই করো...। এটাই ছিল মহারাষ্ট্র সরকারের একমাত্র বার্তা। বলেছিলেন, মুম্বই পুলিশ কমিশনার ডি শিবানন্দন। নব্বই দশকে তিনিই ছিলেন মুম্বই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ত্রাস। মুম্বই পুলিশ কমিশনার হিসেবে হাসান গাফুরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন ২০০৯-এর জুন মাসে।
শিবানন্দনের কথায়, আসলে ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বইয়ের বুকে ঘটে যাওয়া ২৬/১১ সন্ত্রাসবাদী হামলার পরই মহারাষ্ট্র সরকার প্রবল চাপের মুখে পড়ে যায়। গোটা দেশের সামনে উন্মোচিত হয় প্রশাসনের অদক্ষতা, দুর্বল প্রতিক্রিয়া এবং প্রস্তুতির ঘাটতি। পুলিশ বাহিনীর প্রযুক্তিগত আপডেট এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর আগ্রহ আচমকাই বেড়ে যায়। হামলার এক মাসের মধ্যেই মহারাষ্ট্র বিধানসভা ১২৬ কোটি টাকার বিশেষ বাজেট অনুমোদন করে। এই অর্থে কেনা হয় অত্যাধুনিক অস্ত্র, সাঁজোয়া যান, দ্রুতগামী স্পিডবোট, উভচর যান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নাইট ভিশন ডিভাইস, এমনকি নতুন ধরনের ইউনিফর্মও। সেই মুহূর্তে সরকারের মনোভাব ছিল: যা দরকার, তাই করো। যত চাও, তত নাও।
২৬/১১-এর বিভীষিকার পর ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে ছিল এক ধাক্কায় জেগে ওঠার মতো। মহারাষ্ট্রের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জয়ন্ত পাতিল নিজেই অকপটে স্বীকার করেছিলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ছিল ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া’, বিশেষ করে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মুম্বই পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া। রাজনীতিবিদরা কোনওভাবেই চাইছিলেন না, তাঁদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হোক। বরং তাঁরা চেয়েছিলেন সেই সংকটে নিজেদের ‘রক্ষক’ হিসেবে তুলে ধরতে। তৎকালীন মুম্বই পুলিশ কমিশনার শিবানন্দন নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি যদি হোম সেক্রেটারি, হোম মিনিস্টার বা চিফ মিনিস্টারের কাছে একটা প্রেজেন্টেশন নিয়ে গিয়ে বোঝাতে পারেন, তাহলেই সেটা অনুমোদিত হয়ে যেত— এক মিনিটেই!’ এই বাস্তবতা যখন ধীরে ধীরে রূপ নিতে শুরু করে, তখন দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির কাছে তা হয়ে ওঠে এক সুবর্ণ সুযোগ। নিরাপত্তা পণ্য সরবরাহকারী ও লবিস্টরা ঝাঁপিয়ে পড়ে এই নতুন বাজার ধরতে। যার ফায়দা তোলে ইজরায়েল। তাদের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি প্রযুক্তি, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ভারতীয় বাজারে দ্রুত ঢুকে পড়ে।
ইজরায়েল এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন ইনস্টিটিউট-এর গাই জুরির কথায়, ২৬/১১-এর পর তাঁদের ভারতে প্রভাব বৃদ্ধির কর্মসূচি অনেক বেশি গতি পায়। মহারাষ্ট্র সরকারকে তাঁরাই প্রথম প্রস্তাব দেন— তাঁদের প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে। এমনকি ২০০৯ সালের জুলাই মাসে মহারাষ্ট্রের সরকারি প্রতিনিধি দলের তেল আভিভ সফরও তাঁরাই আয়োজিত করে। ‘এই উদ্যোগ ইজরায়েলের তরফ থেকেই শুরু হয়েছিল, মহারাষ্ট্র সরকারের নয়।’ তবে ইজরায়েল শুধু একা নয়। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আরও অনেকেই। মুম্বইয়ের কর্পোরেট লবি গ্রুপ ‘বম্বে ফার্স্ট’ ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি হোয়াইট পেপার প্রকাশ করে। যেখানে আহ্বান জানানো হয় ‘আধুনিক অস্ত্রচালনায় প্রশিক্ষিত সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার’ এবং হেলিকপ্টার, স্পিডবোট, দ্রুতগামী গাড়ি ইত্যাদির পর্যাপ্ত মজুতের। একইসঙ্গে তারা এমন একাধিক বিদেশি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মুম্বই সফরের আয়োজন করে, যাঁরা ৯/১১ (আমেরিকা) বা ৭/৭ (লন্ডন) হামলা নিয়ে কাজ করেছিলেন। মহারাষ্ট্র সরকারের এক শীর্ষ অফিসার বলেছিলেন, ২৬/১১-এর পর হঠাৎ করে একের পর এক বিদেশি প্রতিনিধি দল ভারতে আসতে শুরু করে। ‘ইজরায়েল, জার্মানি, কানাডা, লন্ডন থেকে বিশেষজ্ঞরা এসে বলতে থাকেন: এটা কর, ওটা কেন, এটা নাও, আমরা এটা দিতে পারি, ওটা দিতে পারি।’ ২৬/১১ তদন্ত কমিশনের প্রধান তথা প্রাক্তন উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা অফিসার ভাপ্পালা বালচন্দ্রন লক্ষ্য করেছিলেন, বিদেশি সংস্থাগুলির লবিস্টরা তখন প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে এসে একটাই যুক্তি দিচ্ছে, ‘আমাদের জিনিস ওদের চেয়েও ভালো’। যেন একটা বিপণি উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল— সন্ত্রাসের ছায়ায় তখন ব্যবসায়িক উল্লাস!
২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর— যে তারিখটি মুম্বই শহরের ইতিহাসে চিরস্থায়ীভাবে ছাপ ফেলে যায়, শুধু রক্তপাত বা ভয়াবহতার কারণে নয়, বরং এই হামলার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মূল কাঠামোতেও গভীর ছায়া ফেলেছিল। বিশেষত মহারাষ্ট্রে। এই হামলা শুধুমাত্র একটি সন্ত্রাসবাদী চক্রান্ত ছিল না, বরং তা এক বৈপ্লবিক পুনর্গঠনের জন্ম দেয়। যা ‘পুলিশের আধুনিকীকরণ’ নামে একটি রাজনৈতিক ও চাক্ষুষ আশ্বাসের মোড়কে পরিবেশিত হয় গোটা ভারতবাসীর সামনে। প্রশাসনের কাছে আমআদমি শুধু শুনতে চেয়েছিল, ‘আপনারা এখন নিরাপদ। আমাদের আছে কোল্ট। আছে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন। আছে এমপি-৯। আমরা এখন প্রস্তুত পরবর্তী ২৬/১১ সামাল দিতে।’
মুম্বই পুলিশ তখন ব্যয়বহুল বিদেশি অস্ত্রের বিশাল তালিকা তৈরি করেছিল: Colt M4 4.46mm কারবাইন, MP5 ও MP9 ট্যাকটিকাল মেশিন পিস্তল, 9mm Smith & Wesson পিস্তল, Barrett M82/M107.5 অ্যান্টি-ম্যাটেরিয়েল স্নাইপার রাইফেল এবং গ্রেনেড লঞ্চার। পাশাপাশি, গাড়ি নির্মাতা সংস্থা মহিন্দ্রার ডিজাইনে তৈরি বিশেষ মরুভূমি-ক্যামোফ্লেজ রঙের Marksman বুলেটপ্রুফ জিপ মুম্বই পুলিশের জন্য সংযোজিত হয়। উপকূলবর্তী নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে কিনে নেওয়া হয় ৩৬টি স্পিডবোট। ঘোষণা হয় হেলিকপ্টার কেনার পরিকল্পনা। একইসঙ্গে ঘোষণা করা হয়, ৬ হাজার নতুন সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে মুম্বই শহরকে নজরদারির আওতায় আনার এবং একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ তৈরি করার কথা।
ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অজয় সাহানি বলেছিলেন, এটা শুধু প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ ছিল না, ছিল মনস্তাত্ত্বিক পুনর্গঠনও। নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে যে ভয় ও সন্দেহ জন্মেছিল, তাকে প্রশমিত করতে ‘র্যাম্বো মডেল’ কার্যত রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ নেয়। মুম্বই শহরে সন্ত্রাসবাদী হামলার তাৎক্ষণিক মোকাবিলায় তৈরি হয় ‘ফোর্স ওয়ান’ নামে একটি নতুন কমান্ডো ইউনিট। নতুন ইউনিফর্ম, নতুন
অস্ত্র এবং আক্রমণ-প্রতিরোধের কৌশলে প্রশিক্ষিত এই বাহিনীকে দেখানো হয় ভবিষ্যতের ঢাল
হিসেবে। কেন্দ্রীয় সরকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি
গার্ড (এনএসজি)-র একটি হাব স্থাপন করে
মুম্বইয়ের কাছে।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরেই মহারাষ্ট্রের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জয়ন্ত পাতিল ঘোষণা করেন, মুম্বই পুলিশের সদস্যদের পাঠানো হবে শিকাগোসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে। সেখানে গিয়ে তারা আধুনিক শহুরে নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার পাঠ নেবে। ‘ফোর্স ওয়ান’-এর মতো নতুন ইউনিট গঠনের ক্ষেত্রে এই আন্তর্জাতিক অনুকরণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বাহিনীর তুলনা করা হয় আমেরিকার সোয়াত, ইজরায়েলের ইয়ামাম এবং অস্ট্রেলিয়ার স্টার ফোর্সের সঙ্গে। পরবর্তী মাস ও বছরগুলিতে এই আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের কিছু বাস্তব রূপও দেখা যায়। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয় ইজরায়েল সফরে। যেখানে তারা ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে। এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন মুম্বই পুলিশ কমিশনার ডি শিবানন্দন, সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব চন্দ্রা আইয়ার এবং একঝাঁক উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার। এই সফরের মাধ্যমে শুরু হয় ভারতীয় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোয় ইজরায়েলি অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ, যা পরবর্তী দশকে আরও গভীর হয়েছে। প্রশিক্ষণের কৌশল, গোয়েন্দা ব্যবস্থার বিকাশ, টার্গেটেড রেড এবং প্রি-এমপটিভ নিউট্রালাইজেশন—এই সব দিকেই ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী নীতিতে ইজরায়েলি নিরাপত্তা দর্শনের ছাপ পড়তে থাকে। লক্ষ্য একটাই: ‘বিশ্বের সেরা বাহিনীগুলির মতো’ ভাবমূর্তি গড়ে তোলা। ইজরায়েলি ইউনিট ইয়ামামের মতো শক্তিশালী, সোয়াতের মতো দ্রুত এবং স্টার ফোর্সের মতো সুশৃঙ্খল বাহিনী তৈরি করাই হয়ে ওঠে এক জাতীয় স্পৃহা।
কিন্তু এত কিছুর পরও আমরা কি নিরাপদ? এরই মধ্যে দেশের সরকার বদলে গিয়েছে। কংগ্রেসকে কার্যত ধুলোয় মিশিয়ে ক্ষমতায় এখন বিজেপি। এ দেশের নাগরিকদের বলা হয়েছে, সেই ২০১৪ সাল থেকে দেশ নিরাপদ হাতে রয়েছে। অথচ, বাস্তবে একটার পর একটা সন্ত্রাসবাদী হামলা, শত শত শহিদের রক্তে ভিজেছে দেশের মাটি। মোদি জমানায় পাঠানকোট, উরি, পুলওয়ামা এবং পাহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে। সবই জম্মু-কাশ্মীরে। তবে এই প্রথম বিস্ফোরণ এবং মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছে দেশের রাজধানী। কীভাবে লালকেল্লার মতো ‘হাই সিকিওরিটি জোন’ ও জনবহুল এলাকায় এই ঘটনা ঘটল? শেষ কবে এমন ঘটেছে? নিরাপত্তায় গলদে দায়ী কে? আমআদমি টের পেয়েছে, বহু বাগ্বিস্তার সত্ত্বেও সন্ত্রাসের ছায়া একইভাবে বিরাজমান। সরকারের যুদ্ধং দেহি ভাব প্রকট করলেই নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা যে নিশ্চিত হয় না, তা আবার প্রমাণিত।
আজ দুনিয়ায় অস্ত্র, নিরাপত্তা প্রযুক্তি আমদানিকারী দেশগুলির তালিকার উপরের সারিতে রয়েছে ভারত। তবুও সন্ত্রাসবাদকে আটকানো যাচ্ছে না কেন? দেশের শাসকরা রাজনৈতিক বয়ানকে জাতীয় বয়ান করে তোলার কাজটিতে সিদ্ধহস্ত। পাহেলগাঁওয়ের স্মৃতি এখনও মানুষ ভোলেননি। সেই ঘটনার পর মোদি সরকার জানিয়েছিল, এবার থেকে যে কোনও সন্ত্রাসবাদী হানাকে ‘যুদ্ধ’ বা ‘অ্যাক্ট অব ওয়ার’ বলে বিবেচিত হবে। যুদ্ধের জন্য একটি প্রতিপক্ষ প্রয়োজন হয়, লাল কেল্লার বিস্ফোরণের পর সেই প্রতিপক্ষটি এখনও পর্যন্ত খাড়া করা যায়নি বা হয়নি। কেন? প্রশ্ন উঠেছে, কাশ্মীর থেকে ফরিদাবাদ হয়ে দিল্লি পর্যন্ত যে সন্ত্রাসবাদীদের গোষ্ঠীর সন্ধান মিলেছে, তারা কি দেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা বা ‘হোমগ্রোন’ সন্ত্রাসবাদী? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কোথায় সেই শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থা? আর কতবার ‘দেশ নিরাপদ’ বলার নাটক চলবে? ইতিহাস সাক্ষী— অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে বিজেপি সরকারের জমানায়!
গোটা দেশ ‘নিরাপদ’ হাতে রয়েছে— এটাই যদি সত্য হয়, এরপরেও ৩০০ কেজি বারুদ নিয়ে খোদ রাজধানীতে কি করে একটা গাড়ি ঢুকে পড়ল? কেন ভোটের মরশুমেই বারবার সন্ত্রাসবাদীরা হামলা চালায়? কিন্তু আপনি যদি ‘দেশপ্রেমী’ হয়ে থাকেন, এরকম প্রশ্ন তুলবেন না! আপনি যদি দেশপ্রেমী হয়ে থাকেন, তাহলে সোচ্চারে বলতে থাকুন, ‘এর জন্য দায়ী অতীতের কংগ্রেস জমানা!’