Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কত দূরে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ?

পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের কাজ (মনরেগা) বন্ধ হয়েছে ২০২২ সালে। তার আগে পর্যন্ত এই খাতে কেন্দ্রের কাছে বাংলার হকের পাওনা আটকে ছিল ৬,৯১৯ কোটি টাকা। স্বাভাবিক নিয়মে তারপরে বাংলার জন্য লেবার বাজেট বরাদ্দ হলে রাজ্য আরও ৫০,৩৪৪ কোটি টাকা পেত।

কত দূরে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ?
  • ২৭ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের কাজ (মনরেগা) বন্ধ হয়েছে ২০২২ সালে। তার আগে পর্যন্ত এই খাতে কেন্দ্রের কাছে বাংলার হকের পাওনা আটকে ছিল ৬,৯১৯ কোটি টাকা। স্বাভাবিক নিয়মে তারপরে বাংলার জন্য লেবার বাজেট বরাদ্দ হলে রাজ্য আরও ৫০,৩৪৪ কোটি টাকা পেত। কিন্তু রাজ্যকে সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়নি। এই টাকা রাজ্যে আসার মানে, বাংলার গরিব মানুষগুলি হাতে হাতে কাজ পেতেন। মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত এই কর্মনিশ্চয়তা প্রকল্প কংগ্রেস জমানায় চালু করার উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত মহৎ। ভারতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা বৈষম্য ও বেকারত্ব। তার প্রধান বলি গরিব মানুষ। এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি গ্রাম ভারতে। তাই এমন একটি আইন তৈরি করা হয়েছে যে, গ্রামের যেকোনও মানুষ দাবি করামাত্র সরকার তাঁকে বছরে অন্তত ১০০ দিনের কাজ দিতে বাধ্য থাকবে। গত দুই দশকে ভারতে দারিদ্র্য অবশ্যই কিছুটা কমেছে। তার পিছনে মনরেগা প্রকল্প রূপায়ণের কৃতিত্ব যে বিরাট, তাতে সন্দেহ কী? বলা বাহুল্য, মনমোহন সিংয়ের দুটি ইউপিএ জমানাতেই মনরেগা রূপায়ণে বেশ গতি ছিল। জনমুখী প্রকল্পটির বারোটা বাজানো হয়েছে মোদিযুগে। যখন কাজের দিন বৃদ্ধির দাবি জোরালো হচ্ছে, তখনই এই খাতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। তারই মধ্যে চলেছে ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ সরকারগুলির সঙ্গে চরম বঞ্চনার খেলা। অবিজেপি রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে মোদিবাবুদের সবচেয়ে অপছন্দের হল বাংলার মা-মাটি-মানুষের সরকার। কারণ এই সরকারের নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি দিল্লির যেকোনও অনাচারের কট্টর সমালোচক এবং আজন্ম আপসহীন প্রতিবাদী। তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইয়ে বারবার হেরে গিয়ে বস্তুত বাংলার গরিব মানুষকেই কষ্ট দিয়ে চলেছে কেন্দ্র। দুর্নীতির অজুহাত খাড়া করে এখানে মনরেগার কাজ ও টাকা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। তার ফলে লক্ষ লক্ষ কর্মদিবস বানচাল হয়ে গিয়েছে। এই ভয়াবহ গরিব মারা নীতি আর বরদাস্ত করা যায় না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে, আগেই বাংলার মানুষের দাবিতেই সিলমোহর পড়েছে। এবার অন্তত মোদি সরকারের বিবেক জাগ্রত হওয়া দরকার। বাংলায় যাতে অবিলম্বে ১০০ দিনের কাজ শুরু হতে পারে তার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নিক তারা। গতমাসেই এই দাবি জোরদার হয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকার তোয়াক্কা করেনি। তারা যেন কোর্টের আরও তিরস্কার ভর্ৎসনা আর তৃণমূলের রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য অপেক্ষা করছিল। 

Advertisement

রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সংসদীয় প্রতিবাদ চলছেই। ওইসঙ্গে উচ্চ এবং শীর্ষ আদালতের নির্দেশ এল পরপর। অবশেষে নতি স্বীকার করল কেন্দ্র। দীর্ঘ টালবাহানা শেষে পশ্চিমবঙ্গের মনরেগা শুরুর ফাইলে সই করলেন কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান। মঙ্গলবার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বাংলায় ১০০ দিনের কাজ শীঘ্রই শুরু হবে। কিন্তু সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ঠিক কতটা নিকটে, মন্ত্রী মহোদায় এদিনও খোলসা করেননি। ১৮ জুন  কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, ১ আগস্ট বাংলায় মনরেগার কাজ শুরু করতে হবে। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল কেন্দ্র। কিন্তু ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টেও খারিজ হয়েছে কেন্দ্রের আর্জি। রীতিমতো ধমক দিয়েই কেন্দ্রের উদ্দেশে সুপ্রিম বেঞ্চের মন্তব্য ছিল, ‘মামলা কি প্রত্যাহার করবেন, নাকি খারিজ করে দেব?’ সলিসিটর জেনারেলের জবাবের অপেক্ষা না করে, মিনিট খানেকের মধ্যেই মামলাটি খারিজ করা হয়। তারপর হাইকোর্টও ফের জানিয়ে দেয়, এই কাজ আটকে রাখার অধিকার কেন্দ্রের নেই। 
তারপরই বিষয়টি নিয়ে পিএমওর সঙ্গে আলোচনা হয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের। পিএমওর সবুজ সংকেত পেয়েই বিভাগীয় মন্ত্রী ফাইলে সই করেছেন। আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলেই বাংলাকে মনরেগার টাকা দেওয়া বন্ধ করেছিল মোদি সরকার। দোষীদের শাস্তি দেওয়া নিয়ে বাংলার সরকার ও শাসক দল কখনও আপত্তি করেনি। একইসঙ্গে তাদের দাবি ছিল, বাকিদের কাজের সুযোগ যেন কেড়ে নেওয়া না-হয়। তাহলে গরিব মানুষের রুটিরুজিতে টান পড়বে। পিছিয়ে পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতি। সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারের কাছে এমনই আর্জি জানান এমপি 
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কত যে দরবার করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। তারপরও বাংলার সঙ্গে সমানে বঞ্চনা চলেছে। এই নষ্টামি যে পরিকল্পনা মাফিকই হয়েছিল, তাতে আর সংশয় নেই। গণতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং মানবাধিকার একত্রে ধ্বংস হয়েছে। এবার অন্তত কেন্দ্র মানুষের মুখ চেয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাক। সংকীর্ণ রাজনীতি ছেড়ে অবিলম্বে শুরু হোক বাংলায় মনরেগার কাজ। ‘না আঁচালে বিশ্বাস নেই’—এই বদনাম ঘোচাবার সুযোগ নিন মোদিবাবুরা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ