আকাশের ময়দানে বাতাসের ভরে,
ছোট, বড়, সাদা, কালো, কত মেঘ চরে।
কচি কচি থোপা থোপা মেঘেদের ছানা
হেসে খেলে ভেসে যায় মেলে কচি ডানা।
কোথা হতে কোথা যায়, কোন্ তালে চলে,
বাতাসের কানে কানে কত কথা বলে।
—মেঘের খেয়াল, সুকুমার রায়
আকাশের ময়দানে বাতাসের ভরে,
ছোট, বড়, সাদা, কালো, কত মেঘ চরে।
কচি কচি থোপা থোপা মেঘেদের ছানা
হেসে খেলে ভেসে যায় মেলে কচি ডানা।
কোথা হতে কোথা যায়, কোন্ তালে চলে,
বাতাসের কানে কানে কত কথা বলে।
—মেঘের খেয়াল, সুকুমার রায়
আকাশের মেঘ নিয়ে কৌতূহল চিরদিনের। শরৎকালে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা কার না দেখতে ভালো লাগে! আর তা নিয়ে একমাত্র কবিরাই তাঁদের কল্পনা অনবদ্য ভাষায় তুলে ধরতে পারেন। বিজ্ঞানীদেরও আগ্রহ কম নয় এই মেঘ নিয়ে। ছোট্ট বন্ধুরা, আমরা সবাই জানি সূর্যের আলোয় পৃথিবী উত্তপ্ত হয়। সূর্যের তাপে সমুদ্র, নদী, হ্রদ, পুকুরের মতো পৃথিবীর জলরাশি থেকে জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। সেই জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলে উঠে যায়। বায়ুমণ্ডলে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমতে থাকে। ফলে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলের ফোঁটা বা বরফের স্ফটিক তৈরি করে। এই জলের ফোঁটা বা বরফের স্ফটিকগুলি একত্রিত হয়ে মেঘ হয়ে ওঠে। তুলোর মতো নরম সাদা, ধূসর-কালো এই মেঘগুলি আকাশে ভাসে। দেখলে মনে হবে, এগুলো বেশ হালকা। কিন্তু বাস্তবে তা মোটেও নয়। গণিতের হিসেবে জেনে নেওয়া যাক— মেঘ কতটা ভারী হতে পারে! বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটা সাধারণ কিউমুলাস বা পুঞ্জ মেঘের ওজন হতে পারে প্রায় ৫০০ টন বা একশোটা পূর্ণবয়স্ক হাতির সমান। কিন্তু তারপরও তো দিব্যি ভেসে থাকে। তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এত ভারী মেঘ আকাশে ভেসে থাকে কীভাবে? পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টানে তা তো মাটিতে পড়ে যাওয়ার কথা।
আসলে এই রহস্যের নেপথ্যে রয়েছে বিভিন্ন কারণ। প্রথম হল— মেঘের কণাগুলির আকার। আমরা জানি, অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলের কণা দিয়ে তৈরি হয় মেঘ। এই ক্ষুদ্র কণা বা ড্রপলেটগুলির গড় আকার মাত্র ২০ মিলিমিটারের মতো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেগুলি চওড়ায় মানুষের চুলের অর্ধেক। আদতে ধূলিকণার মতো এই ড্রপলেটগুলি বাতাসে ভেসে থাকে। আর এই জলকণা একটা বড় অংশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। সমষ্টিগতভাবে মেঘের ওজন অনেক বেশি হলেও ড্রপলেটগুলির ওজন পৃথকভাবে একেবারেই নগণ্য। ফলে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এড়িয়ে মেঘ ভেসে থাকতে পারে।
দ্বিতীয় কারণ হল, বায়ুমণ্ডলের নীচের স্তর থেকে অবিচ্ছিন্নভাবে উষ্ণ বাতাসের প্রবাহ। সহজ কথায় বলতে গেলে, পৃথিবী সংলগ্ন বাতাস তুলনায় বেশি উষ্ণ। এই বাতাস ক্রমাগত উপরের দিকে ওঠে। আর ঠান্ডা বাতাস নীচে নামে। উষ্ণ বাতাসের ধারাবাহিক প্রবাহের বল মেঘকে ভাসিয়ে রাখে।
তৃতীয়ত, মেঘের চারদিকের বাতাসও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মেঘ সংলগ্ন বাতাসের চেয়ে বেশি উষ্ণ থাকে। কারণ, তারা চারপাশের বাতাস থেকে সূর্যের আলো বেশি শোষণ করে। ফলে চারপাশের বাতাস মেঘের চেয়ে ঘন। বাতাসের এই ঘনত্বও মেঘকে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ঠিক যেভাবে জলে তেল ভেসে থাকে।
তবে সব সময় কিন্তু মেঘ ভেসে বেড়াতে পারে না। আশপাশের বাতাস যদি উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন মেঘের আর্দ্রতা বাষ্পীভূত হয়ে যায়। আর মেঘ উধাও হয়ে যায়। আবার কখনও মেঘ খুব বড় ও আর্দ্র হয়ে ওঠে। তখনও মেঘের জলকণাগুলি একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যেতে থাকে। আর জলকণাগুলি ক্রমে এতই বড় হয়, সেগুলি আর ধূলিকণার মতো আচরণ করতে পারে না। জলের ওই ফোঁটাগুলি আর ভেসে থাকতে পারে না। মাধ্যাকর্ষণের টানে সেগুলি নীচে পড়তে থাকে। একেই বলা হয় বৃষ্টি।