নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: সেনা-পুলিস ও আধাসেনার বহুল ব্যবহৃত পয়েন্ট ৩৮ বোরের গুলি অস্ত্র ব্যবসায়ীর ভাণ্ডারে! এক বা দুই রাউণ্ড নয়, প্রায় ৪০ রাউণ্ড! রহড়ার রিজেন্ট পার্ক থেকে অস্ত্র কারবারি মধুসূদন মুখোপাধ্যায় ওরফে লিটনের থেকে উদ্ধার হওয়া গুলি খতিয়ে দেখার সময় চাঞ্চল্যকর এই তথ্য উঠে এসেছে। তবে প্রশিক্ষণ পর্বে পুলিস কর্মীরাই এই বোরের গুলি বেশি ব্যবহার করছেন, এমন নজির রয়েছে। তদন্তপর্বে এর থেকে স্পষ্ট, রাজ্য পুলিসের একাংশের সঙ্গে শুধু ‘সোর্স’ হিসেবে এই অস্ত্র ব্যবসায়ীর যোগ ছিল এমনটা নয়, তাদের সৌজন্যেই এ দেশে ‘প্রোহিবিটেড বোর’ (পিবি) বলে চিহ্নিত গুলিও জুটিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিস মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার কাণ্ডের তদন্তকারীরা এখন ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ খোঁজার কাজ শুরু করেছেন। তদন্তে জানা গিয়েছে, শুধু এই রাজ্য নয়, মধুসূদন ওড়িশাতেও অস্ত্র সরবরাহ করতেন। ফলে সেনা-পুলিসে বহুল ব্যবহৃত পয়েন্ট ৩৮ বোরের গুলি ভিন রাজ্যের দুষ্কৃতীদের হাতে গিয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও জোরদার হয়েছে। পুলিস কমিশনার মুরলীধর শর্মা বলেন, আমরা এই বিষয়ে তদন্ত করছি। ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, লিটনের জেরা পর্ব যত এগচ্ছে, ততই নতুন নতুন রহস্যের উন্মোচন হচ্ছে। তবে সব থেকে চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, পয়েন্ট ৩৮ বোরের গুলি। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় হাজার রাউন্ড কার্তুজের মধ্যে রয়েছে এহেন ৪০টি গুলি। এছাড়াও এই বোরের গুলির খোলও মিলেছে। এই বোরের গুলি খোলা বাজারে পাওয়া অমিল। তাহলে লিটনের কাছে এল কীভাবে? পুলিসের একাংশের ধারণা, বারাকপুর সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিস প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে গুলি চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সে সব জায়গা থেকেই অর্থের বিনিময়ে ঘুরপথে তা চলে এসেছে লিটনের কাছে। এমনকী, সেখানকার ব্যবহৃত খালি কার্তুজ ও গুলির খোলও তিনি পেতেন। এছাড়া অন্য কোনওভাবে ‘পিবি’ ক্যাটাগরির গুলি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। কোন পুলিস প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে লিটনের কাছে ঘুরপথে এসে পৌঁছছে পয়েন্ট ৩৮ বোরের গুলি, কাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, এসব তথ্যও জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। ইতিমধ্যে বুধবার তাঁকে রাজ্য পুলিসের এসটিএফ দিনভর জেরা করেছে। তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি এই রাজ্যের পাশাপাশি বিহারের এক কুখ্যাত গ্যাংস্টারের সাঙ্গপাঙ্গ এবং ওড়িশায় আগ্নেয়াস্ত্রের বেআইনি কারবারিদের কাছে বরাত অনুযায়ী বন্দুক ও কার্তুজ পাঠাতেন। এই পর্বে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক অস্ত্র কারবারির নামও পুলিস পেয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বারাকপুর মহকুমা এলাকাতে লিটন ঢালাওভাবে আগ্নেয়াস্ত্র মুড়ি বিক্রি করেননি। তাতে দ্রুত পুলিসের নজরে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সাত বছর খড়দহ থানায় গাড়ি চালানোর সুবাদে তিনি পুলিসের নজরদারি ও তদন্তের অভিমুখ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে লিটন মেপে পা ফেলতেন। তাই দুই দশকের বেশি সময় ধরে রমরমিয়ে অস্ত্র কারবার চালালেও, পুলিস তাঁর টিকি ছুঁতে পারেনি। উল্টে পুলিসের সোর্স হওয়ার পুরনো অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন স্তরে ‘প্রসাদী’ পৌঁছে দেশি-বিদেশি বন্দুক, পিস্তল ও রিভলভার এবং কার্তুজ-গুলি জোগাড় করে বিক্রি করতেন। ফাইল চিত্র