হর্সলে হিলস। একেবারে অফবিট একটা জায়গা। সেখানে কুয়াশা ঘেরা নির্জন পথে কেবল কানে আসে পাখির কলতান। বেঙ্গালুরুতে অফিসের কাজ শেষ হলে দেখি হাতে দু’দিনের মতো সময় আছে। মাত্র দু’দিনে দূরে কোথাও যাওয়া যাবে না। তখন সহকর্মী গণপতি রেড্ডি পরামর্শ দিল, চল গাড়ি নিয়ে ঘুরে আসি হর্সলে পাহাড়ে। একরাত থেকে ফিরব শহরে। গণপতি তেলুগু ছোকরা, এদিকের পথঘাট সব চেনা। সেটা ছিল ইংরেজ আমল। ডব্লু ডি হর্সলে সাহেব ছিলেন অন্ধ্রপ্রদেশের এক আঞ্চলিক কালেক্টর। প্রচণ্ড গরমে সাহেবরা হাঁসফাঁস করতেন। পালাতে চাইতেন শীতল কোনও জায়গায়। এমনই এক কাঠফাটা গরমের দিনে হর্সলে সাহেব ঘোড়ার পিঠে চড়ে হাজির হন পূর্বঘাট পর্বতমালার এক অচেনা পাহাড়ের মাথায়। ঘোড়াটাকে একটা লেকের কাছে জল খেতে ছেড়ে নিজে বসেন প্রকাণ্ড এক গাছের ছায়ায় ঠান্ডা হতে। খানিকক্ষণ বসতেই সারা শরীর যেন শীতল হয়ে এল। আরামে চোখ বুজে এল তাঁর। সারাক্ষণ দারুণ হাওয়া। জায়গাটা ভারি পছন্দ হয় হর্সলে সাহেবের। ঠিক করেন, এখানে বানাবেন সামার ক্যাম্প। সেটা ছিল ১৮৫৭ সাল। দেশে শুরু হয়েছে সিপাহি বিদ্রোহ। শহর থেকে নিরাপদ নির্জন স্থানে ইংরেজদের আত্মগোপনেরও একটা আস্তানার দরকার ছিল। এক ঢিলে দুই পাখি। রেকর্ড সময়ের মধ্যে হর্সলে সাহেব জায়গাটিকে গড়ে তুললেন একটা শৈলশহর হিসাবে।
হর্সলে হিলস বা হর্সলেকোন্ডা বা ইয়েনুগুল্লা মাল্লাম্মা কোন্ডা হল অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তুর জেলার পূর্বঘাট পাহাড়ে অবস্থিত শৈলশহর। আগে পাহাড়ের স্থানীয় নাম ছিল ইয়েনুগুল্লা মাল্লামা কোন্ডা। একসময় সেখানে প্রচুর বুনো হাতি থাকত। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে মাল্লাম্মা নামে এক মহিলা সন্ন্যাসী পাহাড়ের চূড়ায় থাকতেন এবং হাতিদের খাওয়াতেন। তেলুগু ভাষায় হাতিকে বলা হয় ইয়েনুগুলু। সেই থেকে পাহাড়ের নাম হল ইয়েনুগুল্লা মাল্লাম্মা কোন্ডা। হর্সলে সাহেব এখানে বসতি করার পর জায়গার নামকরণ করা হয় হর্সলে হিলস বা হর্সলেকোন্ডা। যা এখন হিল স্টেশন এবং আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বেঙ্গালুরু থেকে ঘণ্টা তিনের পথ। দূরত্ব হিসাবে ১৪০ কিলোমিটার মতো। বেশ খানিকটা যেতে, দূর থেকে দেখা গেল অনুচ্চ পূর্বঘাট পর্বতমালার কিছু অংশ। আরও খানিকটা পথ যাওয়ার পর দেখি সমতল ভূমির উপরেই বড় তোরণ আর তার মাথার উপর লেখা ওয়েলকাম টু হর্সলে হিলস। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতম অংশের উচ্চতা ৪,৩১২ ফিট। মসৃণ পিচের রাস্তার উপর চেকপোস্ট।
সামনের রাস্তা গড়িয়েছে গাছে ঘেরা পাহাড়ি পথে শ্রান্ত পথিককে অভ্যর্থনা জানাতে।
ইউক্যালিপটাস ও অন্যান্য গাছে ঢাকা পিচের পথ চলেছে পাহাড়ের মাথার দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেলাম গলিবান্ডা বা উইন্ডি রক। বাংলায় বলা যেতে পারে বাতাসিয়া পাহাড়ের চুড়োয়। এখান থেকে হর্সলে হিলের সবথেকে ভালো ভিউ পাওয়া যায়। পুরো চত্বরটাই কঠিন পাথুরে। এখানেই রয়েছে অঞ্চলের সব হোটেল। সরকারি বিশ্রামাগারটিও এখানেই। বাতাসিয়া পাহাড় থেকে যত দূর চোখ যায় উঁচু-নিচু সবুজ কার্পেট বিছানো পাহাড়ের সারি। দূরের পাহাড়গুলি যেন মনে হয় নীল মেঘে ঢাকা রয়েছে।
উইন্ডি রক নাম হওয়ার কারণ, এখানে প্রায় সারাক্ষণই ঝড়ের মতো হাওয়া বয়। পৌঁছাতে বেলা হয়েছিল বলে ভোরের কুয়াশা ঢাকা পথ দেখতে পাইনি। সেটা দেখলাম পরদিন ভোরে। অসংখ্য পাখির ডাক সেই হালকা কুয়াশা ঘেরা নির্জন পাহাড়ি পথে ভোরের ভৈরবী তান রচনা করেছিল। পাহাড়ে খানিকটা ট্রেক করে হুইসপার উইন্ড ভিউ পয়েন্টে
যেতে পারলে ভ্রমণ সার্থক মনে হবে। যেখানে পাহাড়ি বাতাস কানের কাছে ফিসফিসিয়ে গল্প বলে চলে সারাদিন।
পাহাড়ের উপরেই রয়েছে একটি ছোট চিড়িয়াখানা। হরিণ, এমু পাখি, ময়ূর, কুমির, সারসের সঙ্গে বাড়তি পাওনা ওয়াচ টাওয়ার। যেখান থেকে পুরো এলাকার সুন্দর প্রাকৃতিক রূপ দেখা যায়। হর্সলে সাহেব এখানে বসতি করার পর প্রচুর ইউক্যালিপটাস গাছ লাগিয়েছিলেন। তাঁর বাড়ির সামনে রোপণ করা ১৬০ বছরের বেশি পুরনো গাছটাকে দেখে নিতে পারেন। নাম তার কল্যাণী।
হর্সলে পাহাড়ের অন্যতম আকর্ষণ গঙ্গোত্রী লেক। নামে লেক হলেও আসলে তা বর্ষার জলে পুষ্ট জলাশয়। শীতে শুকিয়ে যায়। লেকের চারপাশে এখনও বন্য আদিমতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। চলার পথে দেখে নেওয়া যেতেই পারে পথের ধারের কফি গাছের বাগান। এখানেই রয়েছে এলাকার আবিষ্কর্তা ডব্লু ডি হর্সলে সাহেবের ছেলের সমাধি। তিনিও ছিলেন এখানকার কালেক্টর। হর্সলে হিল থেকে দেখার জন্য খুব ভালো দু’টি ভিউ পয়েন্ট আছে। দুটোই অবশ্য পাশাপাশি। একটা সুইসাইড স্পট ভিউ পয়েন্ট আর অন্যটি ইন্ডিয়া ম্যাপ ভিউ পয়েন্ট। ছাউনি ও রেলিং ঘেরা ভিউ পয়েন্ট থেকে পুরো এলাকার একটা দারুণ ছবি পাওয়া যায়। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে ইন্ডিয়া ম্যাপ ভিউ পয়েন্ট থেকে মদনপল্লি পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। কপালে থাকলে চলার পথে দেখা পেতেই পারেন হরিণ বা সম্বরের। বুনো বাঁদর তো হামেশাই দৃশ্যমান হয় রাস্তার দু’ধারে। এখানে প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। পাখিদের ছবি তোলার আদর্শ স্থান।
অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্নাটক সীমান্তের এই পাহাড় অন্ধ্রপ্রদেশের উটি বলেও পরিচিত। এখানকার সারা বছরের তাপমাত্রা মোটামুটি ৩০ ডিগ্রির নীচে থাকে। উটির তুলনায় এখানে ভ্রমণের খরচ অনেকটাই কম। তবে হর্সলে হিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানে কোনও এটিএম নেই। মোবাইলের টাওয়ারও কমজোরি, ফলে নগদ সঙ্গে রাখাই ভালো।



