শ্রীনগর: জঙ্গিদের গুলিবৃষ্টির সামনে ততক্ষণে প্রাণ চলে গিয়েছে ২৬ জনের। ঘটনার আকস্মিকতায় দিশেহারা বাকি পর্যটকরা। কোনওমতে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতেই ব্যস্ত সকলে। এই পরিস্থিতিতে ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ের বৈসরণ ভ্যালিতে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই বাকি পর্যটকদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান তাঁরা। এই বাসিন্দাদের মধ্যে বেশিরভাগই বৈসরণে পর্যটকদের ঘোড়ায় চাপিয়ে রোজগার করেন। অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে, জঙ্গিদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের যোগ রয়েছে। পাল্টা অনেকেই বলছেন, ওই রকম পরিস্থিতিতে ঘোড়াওয়ালারা যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই ঘটনায় মানবতাকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা যেন সাধারণ কাশ্মীরিদের দিক থেকে মুখ না ফিরিয়ে নেন।
এর মধ্যে প্রথমেই নাম আসছে সাজ্জাদ আহমেদ ভাটের কথা। জঙ্গিদের বাধা দিতে গিয়ে ওইদিন প্রাণ যায় সাজ্জাদের তুতো ভাই সৈয়দ আদিল হুসেন শাহের। কিন্তু সেই শোক বুকে চেপেই আহত একজনকে পিঠে চাপিয়ে পাথুরে রাস্তা দিয়ে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান সাজ্জাদ। সেই ছবি ইতিমধ্যেই ভাইরাল। পরে তিনি বলেছেন, ‘নিজের জীবনের কথা ভাবিনি। আমার কাছে পর্যটকরাও পরিবারের অংশ। তাই তাঁদের উদ্ধার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ওইদিন আমরা আহতদের জন্য জলের ব্যবস্থা করি। ঘোড়ায় চাপিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ওই দিনটাকে প্রতি বছর কালো দিন হিসেবেই মনে রাখব।’ আর এক ঘোড়াওয়ালা আব্দুল মজিদ জানান, একজন সাজ্জাদ ভাইরাল হয়েছেন। কিন্তু কয়েক হাজার সাজ্জাদ তাঁদের জীবন বাজি রেখে অন্যদের বাঁচিয়েছেন।
ঘোড়াওয়ালাদের সংগঠনের সভাপতি রইস আহমেদ এখনও আতঙ্ক থেকে বেরোতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন বৈসরণে পৌঁছাই দেখি একটা মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। মনে হয়েছিল, ওইদিনই আমার শেষ দিন। একজন মহিলা এসে তাঁর স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আকুতি করছিলেন। কোনওমতে তাঁকে শান্ত করি। সারা ভ্যালিজুড়ে দেহ পড়েছিল।’ রইস জানান, যে তৃণভূমিতে হামলা চালানো হয়, সেটির চারদিকে বেড়া দেওয়া। সেখানে শুধু পর্যটকরাই ঢুকতে পারেন। যদি ঘোড়াওয়ালাদের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হত, তাহলে আরও সৈয়দ আদিল পর্যটকদের বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। নিসার আহমেদ এখনও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাঁর মধ্যেই বলেন, ‘হামলার আগে আমরা সবাই খুব খুশি ছিলাম। অনেক পর্যটক আমার বাড়িতেও ঘুরে গিয়েছে। আমাদের সঙ্গে পরিচিতিই বেড়েছে। কিন্তু জঙ্গিদের জন্য পর্যটক আর আমাদের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। সকলকে অনুরোধ করব, কাশ্মীরে আসুন আমাদের আতিথেয়তা দেখে যান।’ পহেলগাঁওতে রেস্তোরাঁ রয়েছে নরেন্দ্র সিংয়ের। তাঁর কথায়, ‘আমরা ভগবানকে মেনে চলি। ভগবানকে সেবা করার মতোই আমরা পর্যটকদের সেবা করি। আমার মানসিক অবস্থা এখনও স্বাভাবিক হয়নি। আমরা আলাদা ধর্মের হতে পারি, কিন্তু আমরা একসঙ্গে রয়েছি।’