Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

সেতু-বন্ধন

২০ মার্চ, ১৮৭৪। হুগলি নদীতে প্রথম পন্টুন ব্রিজ উদ্বোধনের আগেই শহরে আছড়ে পড়েছিল সাইক্লোন। তারও প্রায় ৭০ বছর পর, এক ফেব্রুয়ারি মাসে উদ্বোধন হয় আজকের হাওড়া ব্রিজের। দু’বারের সেই সেতু-বন্ধনের ইতিহাস আজ বর্তমানে।

সেতু-বন্ধন
  • ১৫ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

২০ মার্চ, ১৮৭৪। হুগলি নদীতে প্রথম পন্টুন ব্রিজ উদ্বোধনের আগেই শহরে আছড়ে পড়েছিল সাইক্লোন। তারও প্রায় ৭০ বছর পর, এক ফেব্রুয়ারি মাসে উদ্বোধন হয় আজকের হাওড়া ব্রিজের। দু’বারের সেই সেতু-বন্ধনের ইতিহাস আজ বর্তমানে।

Advertisement

অনিরুদ্ধ সরকার: ব্রিটিশ আমলে হাওড়া ব্রিজ নির্মিত হয়েছিল দু’বার। প্রথমটির পরিকল্পনা হয়েছিল ১৯ বছর ধরে। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে তা চলেছিল প্রায় ৩০ বছর। হাওড়া ব্রিজ ৭১ ফুট চওড়া। সঙ্গে দু’পাশে ১৫ ফুটের ফুটপাত। ১৯৪৭ সালে হাওড়া ব্রিজে গাড়ি চলত দিনে ৩৫ হাজার। এখন চলে প্রায় ৩ লক্ষ। সঙ্গে প্রায় ৭ লক্ষ পথচারী। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ট্রামও চলেছে। দেখতে দেখতে হাওড়া ব্রিজ ৮৩ বছরে পা দিয়েও অবিচল। হাজারো ঝড়ঝাপটা, রাজনীতি, যুদ্ধ সামলে আজও দণ্ডায়মান, মাথা উঁচু করে। 
১৮৫৪ সাল। হাওড়া স্টেশন থেকে শুরু হল যাত্রীবাহী রেল চলাচল। যোগাযোগ ব্যবস্থায় এল বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যের দৌলতে কলকাতা তখন পরিচিত নাম। ব্যবসায়িক কারণে কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি চাইছিল ইংরেজরা। হুগলি নদীর পূর্ব তীরে কলকাতা এবং পশ্চিমে হাওড়া। এই দুই শহরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে কারণে একটি স্থায়ী ব্রিজের প্রয়োজন অনুভব করে ব্রিটিশরা। প্রস্তাব পেশ হতেই সমস্যা দেখা দিল। সেতুপথে যানবাহন চলাচল করলে জাহাজ চলবে কীভাবে? 
 একদল অভিজ্ঞ ব্রিটিশ আধিকারিক তখন প্রস্তাবে দিলেন, এমন একটি ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে, যার উপর দিয়ে মানুষ এবং গাড়িঘোড়া চলতে পারবে। আবার ব্রিজের নীচে জাহাজ ও স্টিমার চলবে। ব্রিজের জন্য অর্থ বরাদ্দ হল। ‘বেঙ্গল হেরাল্ড’ পত্রিকা লিখছে, ‘হুগলি নদীর উপরি পুল করণে গবর্ণমেন্ট মনস্থ করিয়াছেন ঐ পুল নির্ম্মাণ করণার্থ ব্যয় ১২০০০০০ টাকা নির্দ্ধার্য্য হইয়াছে।’
ব্রিটিশরা ১৮৫৫ সালে একটি সেতুর পরিকল্পনা করল। এর জন্য তৈরি হল কমিটি। আর এই কমিটি সেতু নিয়ে চর্চা শুরু করতে করতেই তা বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ। দেশজুড়ে বিদ্রোহের আগুন তখন ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রিজ নির্মাণের চেয়ে বিদ্রোহ দমন তখন বেশি জরুরি হয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে সিপাহি বিদ্রোহ থামল ঠিকই কিন্তু ‘হাওড়া ব্রিজ নির্মাণে’র প্রস্তাবটি ঠান্ডা ঘরে চলে গেল। সে যুগেও এরকম হত। প্রজেক্ট পাশ, অর্থ বরাদ্দের পরেও সেই প্রজেক্ট ঠান্ডা ঘরে চলে যেত। ব্রিজ নির্মাণের সেই প্রথম প্রস্তাব ঠান্ডা ঘর থেকে বের হল প্রায় আট বছর পর। ফাইলে তখন ধুলো জমেছে। ধুলো ঝেড়ে ব্রিটিশরা আবার উদ্যোগ নিল, ব্রিজ একটা বানাতেই হবে!
বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর মিটিং ডাকলেন। আর তাতে সিদ্ধান্ত হল, সরকার এই ব্রিজ নির্মাণের পুরো দায়িত্ব নেবে না। প্রশ্ন উঠল, তাহলে কীভাবে হবে ব্রিজ নির্মাণ? লাটসাহেব বললেন, হাওড়া ব্রিজ নির্মাণের জন্য একটি ট্রাস্ট গঠন করতে হবে। সেই ‘হাওড়া ব্রিজ ট্রাস্ট’ এই ব্রিজ নির্মাণ করবে। ১৮৭১ সালে ট্রাস্ট গঠিত হল। আর সেই ট্রাস্ট দায়িত্ব নিল একটি ভাসমান সেতু নির্মাণের, ‘পন্টুন ব্রিজ’। ফরাসি শব্দ ‘পন্টুন’ বা ‘পন্টন’-এর অর্থ, সমতল বিশিষ্ট নৌকা বা ‘ভাসমান ডক’। এই পন্টুন ব্রিজের ব্যবহার যুদ্ধের সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেনাবাহিনী দ্রুত নদী পারাপারের জন্য অস্থায়ী পন্টুন ব্রিজ ব্যবহার করত। 
১৮৭১ সালের আইন পাশ হওয়ার পর ডাক পড়ল স্যর ব্রাডফোর্ড লেসলির। তিনি ছিলেন সেযুগের এক নামজাদা ইঞ্জিনিয়ার। ব্রিটিশদের বিশেষ আস্থাভাজন। তিনি একটি পন্টুন ব্রিজের পরিকল্পনা করলেন ও ইংল্যান্ড ফিরে গেলেন। সেখানে গিয়ে ভাসমান সেতুর জন্য ডেক এবং ভাসমান সমতল ‘নৌকা’ বানানোর কাজ শুরু করালেন। লেসলির তত্ত্বাবধানে জোরকদমে সেই কাজ চলতে লাগল। তারপর সেই মাল জাহাজে করে এসে পৌঁছাল কলকাতা বন্দরে। তারপর ডেকগুলি জুড়ে তৈরি হল প্রথম হাওড়া ব্রিজ। লেসলি দিন-রাত এক করে নিজে দাঁড়িয়ে নির্মাণ করালেন প্রথম হাওড়া ব্রিজ। যা ‘হাওড়া পন্টুন ব্রিজ’ নামে পরিচিত ছিল। এই পন্টুন ব্রিজের মাঝের অংশে ২০০ ফুট খোলার ব্যবস্থা রাখলেন লেসলি সাহেব।
প্রথম হাওড়া ব্রিজটি উদ্বোধনের আগেই শহরে আছড়ে পড়ল সাইক্লোন। দিনটা ছিল ১৮৭৪ সালের ২০ মার্চ। শহর তছনছ। ক্ষতি হল নির্মীয়মাণ সেতুরও। সাইক্লোনে তিনটি পন্টুন ডুবে গেল। ব্রিজের ২০০ ফুট ধ্বংস হয়ে গেল। লেসলি সাহেবের উদ্যোগে শুরু হল মেরামতির কাজ। এরপর এগোরিয়া নামে একটি জাহাজ এই সেতুতে ধাক্কা মারে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্মীয়মাণ হাওড়া ব্রিজ। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও হাজারো প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ১৮৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর প্রথম যান চলাচল শুরু হয় হাওড়া পন্টুন ব্রিজে। উদ্বোধনের এই দিনটি আরও একটি কারণে ঐতিহাসিক। এই দিনেই ‘কলকাতা বন্দর আইন’ পাশ হয়। 
১৮৫৫ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন যা পরিকল্পনা করেছিল, তা রূপায়িত হতে সময় লেগেছিল ১৯ বছর। এবার একটা মজার তথ্য দেওয়া যাক। এই ব্রিজে সেযুগে বসেছিল টোল ট্যাক্স। ১৮৭১ সালে বাংলার ছোটোলাট যখন ‘হাওড়া ব্রিজ অ্যাক্ট’ তৈরি করেছিলেন, তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই সেতু পার হতে টোল দিতে হবে। তিনি বলেন, টোলের টাকায় হবে সেতু রক্ষণাবেক্ষণ। আরও একটি বিষয়, কোন সময় ব্রিজ খোলা থাকবে, সেই খবর রাখতে হত মানুষকে। পরে বেতারে ব্রিজ খোলা ও বন্ধের সময় ঘোষিত হত।
ইতিহাস বলছে, সে সময় পন্টুন ব্রিজ তৈরি করতে লেসলির সংস্থাকে দিতে হয়েছিল ২২ লক্ষ টাকা। কিন্তু সেতু যতদিন ছিল, তা থেকে সর্বমোট টোল আদায় হয়েছিল ৩৫ লক্ষ টাকার মতো। মোদ্দা কথা, এই সেতু থেকে বিপুল লাভ করেছিল ব্রিটিশ সরকার। পরিসংখ্যান বলছে, সেযুগে হাওড়া ব্রিজ থেকে প্রতি বছর লক্ষাধিক টাকা আয় করত ব্রিটিশ সরকার।
এই পন্টুন বা ভাসমান সেতু ঘিরে কয়েক বছরের মধ্যে একাধিক সমস্যা দেখা দিল। যার মধ্যে অন্যতম জাহাজ বা স্টিমার যাতায়াতের ব্যবস্থা করা। জাহাজ পার হলে চাবি ঘুরিয়ে ব্রিজের মাঝের অংশ খুলে দিতে হত। ফলে বন্ধ থাকত গাড়ি চলাচল। এদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য যানবাহনের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ব্রিটিশরা নিয়ম করেছিল, দিনের বেলায় সেতু খোলা ও রাতে বন্ধ থাকবে। সেই সময় নদীপথে জাহাজ চলাচল করবে। কিন্তু সবসময় সেটা সম্ভব ছিল না। অনেক সময় দিনের বেলাতেও গুরুত্বপূর্ণ জাহাজকে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। একটি পরিসংখ্যান বলছে, ১৯০৭ সালে হাওড়া ব্রিজের মাঝ দিয়ে তিন হাজারেরও বেশি জাহাজ-স্টিমার ও লঞ্চ চলাচল করেছিল। 
পন্টুন ব্রিজ চওড়ায় ছিল ৪৮ ফুট। কিন্তু বাস্তবে গাড়ি চলাচলের জন্য ৪৩ ফুটের বেশি ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। এদিকে হাওড়া ও কলকাতার গণপরিবহণে তখন গোরুর গাড়ির দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। সঙ্গে ছিল পথচারীদের ভিড়। ব্রিজ বন্ধ থাকলে ট্রেন ধরতে যাওয়া যাত্রীরা পড়তেন বিপদে। এসব মিলিয়ে এই পন্টুন ব্রিজ ঘিরে সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৯০৫ সালে বড়োলাট নতুন একটি হাওড়া ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব দিলেন। ডাক পড়ল লেসলি সাহেবের। তৈরি হল কমিটি। বন্দরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার জন স্কট, পূর্ব রেলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার আর এস হাইট এবং কলকাতা পুরসভার চিফ ইঞ্জিনিয়ার ম্যাককেব সেই কমিটির সদস্য হলেন। চিন্তাভাবনা শুরু হল। পুরানো হাওড়া ব্রিজ অর্থাৎ পন্টুন ব্রিজটি ভেঙে দেওয়ার কথা উঠল। পুরানো ব্রিজ ভাঙার পক্ষে ছিলেন না লেসলি। তিনি মনে মনে চাইছিলেন তাঁর সৃষ্টি ইতিহাসে অমর হয়ে থাকুক। 
এদিকে কমিটি পন্টুন ব্রিজ ভেঙে একটি ক্যান্টিলিভার সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। লেসলি সাহেব তখন কমিটিকে বলেন—‘এ যাবৎ পৃথিবীতে তিনটি মাত্র ক্যান্টিলিভার সেতু বানানো হয়েছে। দু’টি জার্মানিতে ও একটি যুক্তরাষ্ট্রে। এই প্রযুক্তিতে তৈরি কানাডার কিউবেক ব্রিজ ভেঙে পড়েছে। নতুন প্রযুক্তি নিয়ে ভারতে এই মুহূর্তে পরীক্ষা করা ব্যয়সাপেক্ষ। ভারতে এই সেতু তৈরির উপযুক্ত পরিকাঠামো নেই।’ 
লেসলি নতুন একটি ক্যান্টিলিভার সেতুর জায়গায় ভাসমান সেতুকে পাকাপোক্ত করে বানানোর পক্ষে মত দিলেন। লেসলির যুক্তিপূর্ণ মতের পক্ষে ছিলেন পোর্ট কমিশনার। আধিকারিকরাও লেসলির পক্ষ নিয়ে বললেন, হাওড়া ও কলকাতার মধ্যে যানবাহন চলাচলের চেয়ে জলপথে জাহাজ চলাচল অনেক বেশি জরুরি। হঠাৎ করে ভাসমান পন্টুন ব্রিজ ভাঙা ঠিক হবে না।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, এই ব্রিজ নির্মাণ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে প্রায় ২০ বছর ধরে। এই পর্বে ‘নতুন হাওড়া ব্রিজ’ নির্মাণ প্রকল্প বিশ বাঁও জলে চলে যায়। হঠাৎ ১৯১০ সালে হাওড়া ব্রিজ কমিটি ফের জেগে ওঠে। ১৯১১ সালে নতুন হাওড়া সেতু নির্মাণের জন্য দেশ-বিদেশের সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে নকশা আহ্বান করা হয়। সঙ্গে মোটা টাকার পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। ১৯১২ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের ন’টি সংস্থা ১৮টি নকশা জমা দেয়। দুঃখের বিষয়, এই নকশাগুলির সবকটিই ছিল ‘ভাসকুল মডেলে’র নকশা। অর্থাৎ সেই পন্টুন ব্রিজ, ভাসমান সেতুর ব্রিজের নকশা।
এইসব পরিকল্পনা চলতে চলতেই শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। বিশ্ব দু’ভাগে বিভক্ত। নতুন সমস্ত পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজে স্থগিতাদেশ পড়ল। একসময় যুদ্ধ শেষ হলেও বিশ্বযুদ্ধের জন্য ইংল্যান্ডের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। যার জেরে নতুন কোনো নির্মাণকাজ থেকে ইংরেজরা সরে আসে। ১৯২১ সাল নাগাদ আবার আলোচনায় আসে হাওড়া ব্রিজ। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে স্পষ্ট, হাওড়া ব্রিজ নির্মাণ ঘিরে পোর্ট কমিশনার আর রেলওয়ে চিফ ইঞ্জিনিয়ারের দ্বন্দ্বের কথা। একজন পন্টুন ব্রিজ চান তো অন্য জন চান ক্যান্টিলিভার সেতু। হাজারো তর্ক-বিতর্কের অবসান না হওয়ায় শেষে ব্রিটিশ প্রশাসন বিষয়টি লন্ডনে পাঠান প্রস্তাব আকারে। হাওড়া ব্রিজ নির্মাণের জন্য লন্ডনে বিশেষ অধিবেশনে বসে। আর তারপরই ডাক পড়ে স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের। তিনি তখন মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানির অন্যতম মালিক। দেশজোড়া তাঁর নাম।
এই রাজেন মুখোপাধ্যায় আর লেসলি সাহেবের মধ্যে অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। সুসম্পর্ক বললে ভুল হয়। বলা উচিত, লেসলি সাহেব ছিলেন তাঁর গুরুস্থানীয়। একসময় প্রেসিডেন্সি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র রাজেন মুখোপাধ্যায়কে অর্থাভাবে পড়াশোনা ছাড়তে হয়। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং যাঁর ধ্যানজ্ঞান, তিনি কি তা ছাড়তে পারেন! কলকাতার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বাড়ি ঘর বিভিন্ন নির্মাণ দেখতেন। একদিন হঠাৎ দেখলেন এক ইংরেজ সাহেব একটি সাঁকোর সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি নির্মাণ পরিকল্পনাটি কিছুতেই মিস্ত্রিদের বোঝাতে পারছেন না। তখন রাজেন মুখোপাধ্যায় এগিয়ে গিয়ে সাহেবের বলা বিষয়টি সহজ করে মিস্ত্রিদের বুঝিয়ে দেন। এই সাহেব আর কেউ নন, লেসলি স্বয়ং। কলকাতা কর্পোরেশনের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার। লেসলির দৌলতে প্রতিষ্ঠা পান রাজেন মুখোপাধ্যায়। 
নতুন হাওড়া ব্রিজ নির্মাণের সময় রাজেন মুখোপাধ্যায়কে ডেকে পাঠালেন লেসলি সাহেব। তিনি তখন বৃদ্ধ। বললেন, রাজেন যেন পন্টুন ব্রিজের পক্ষে মত দেন। গুরুস্থানীয় লেসলির কথা শুনে দ্বিধায় পড়ে যান রাজেন মুখোপাধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত মুখার্জি কমিটির কমিটির অন্য দুই সদস্য কলকাতা বন্দরের চেয়ারম্যান ক্লিমেন্ট হিন্ডলে ও চিফ ইঞ্জিনিয়ার জে ম্যাগ্লাসান ছিলেন ক্যান্টিলিভার ব্রিজের পক্ষে। এই দুই ইংরেজ বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার বেসিল মটকে ডেকে তাঁর পরামর্শও নিয়ে ফেলেছেন। তিনি ‘সিঙ্গল স্প্যান আর্চড ব্রিজ’-এর প্রস্তাব দিয়েছেন। ১৯২২ সালে এই প্রস্তাবেই সিলমোহর পড়ে। রাজেন মুখোপাধ্যায় রাখতে পারলেন না গুরুর কথা। দুঃখের সঙ্গে জানালেন, ব্রিজ ভাঙতে হবে।
১৯২৬ সালে পাশ হল ‘দ্য নিউ হাওড়া ব্রিজ অ্যাক্ট’। দেশে এই প্রথম সেতু নির্মাণ হচ্ছিল আইন পাশ করে। বিষয়টি ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৩০ সাল নাগাদ হঠাৎ কাজের গতি কমে যায়। সেবছর ১৫ মার্চ বাংলার গভর্নর বৈঠক ডাকেন ও কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাওড়া ব্রিজের নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে।
এরপর ব্রিজ নির্মাণের জন্য গ্লোবাল টেন্ডার ডাকা হয়। একটি জার্মান কোম্পানি সবচেয়ে উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য টেন্ডার জমা দেয়। কিন্তু সেসময় ব্রিটেন ও জার্মানির মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো ছিল না। যে কারণে অর্ডারটি দেওয়া হয় একটি ব্রিটিশ কোম্পানিকে। M/s. Cleveland Bridge & Engineering Company। এদিকে সংবাদপত্রে দাবি ওঠে, এই কাজের বরাত কেন এককভাবে ব্রিটিশ কোম্পানি পাবে? ভারতীয় কোম্পানিকেও এর অর্ডার দিতে হবে। স্লোগান ওঠে মেক ইন ইন্ডিয়ার। এরপর তিনটি আলাদা কোম্পানি Braithwaite, Burn & Jessop একসঙ্গে জুড়ে গঠিত হয় BBJ Company। হাওড়া ব্রিজ নির্মাণের জন্যই এই কোম্পানি গঠিত হয়। ১৯৩৬ সালে ব্রিজের কাজ শুরু হয়। ১৯৩৯ সালে বিশ্বযুদ্ধর কারণে ব্রিজের কাজের গতি অনেকটাই কমে যায়। 
২১৫০ ফুট দৈর্ঘের এই ব্রিজে একটিও নাটবল্টু নেই। পুরোটাই রিভেটিং। যে কারণে এই ব্রিজ নির্মাণ ছিল বেশ ঝুঁকির কাজ। নির্মাণ চলাকালীন ব্রিজের প্লিন্থের একটা বড়ো অংশ পড়ে যায়। তার ফলে আশপাশের বিরাট এলাকা জুড়ে ভূকম্পন অনুভূত হয়। কম্পনের জেরে গঙ্গাপাড়ের একটা মন্দিরও ভেঙে পড়ে। ইতিহাস বলছে, কলকাতা শহরের ভূকম্পন পরিমাপ যন্ত্রে এই কম্পন ধরা পড়েছিল।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, হাওড়া ব্রিজ তৈরিতে ২৬ হাজার ৫০০ টন ইস্পাত লেগেছিল। যার ২৩ হাজার ৫০০ টন সরবরাহ করেছিল টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি লিমিটেড। প্রাথমিকভাবে ইস্পাতের বরাত দেওয়া হয়েছিল একটি ব্রিটিশ কোম্পানিকে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ব্রিটিশ সরকার ৩ হাজার টনের পর বাকি স্টিল পাঠাতে অস্বীকার করে। তখন টাটা স্টিল বাকি ২৩ হাজার ৫০০ টন স্টিল সাপ্লাই করে। এখানেও একটা কাহিনি রয়েছে। টাটা স্টিল চাইতেই যে ব্রিটিশরা তাদের বরাত দিয়েছিল এমনটা ভাবার কারণ নেই। এখনকার শিল্পপতিদের মতো সরকার ঘনিষ্ঠ হলেই সুযোগ পাবেন এমনটা নয়। ব্রিটিশরা টাটার গুণগত মান পরীক্ষা করতে চাইলে টাটা কর্তৃপক্ষ জানায়, মেঘনা নদীর উপর যে রেলসেতু নির্মিত হয়েছে, তা তাদের ইস্পাত দিয়েই তৈরি। টাটা নির্মিত সেই সেতুর ইস্পাত পরীক্ষা করে ব্রিটিশরা খুশি হয়ে টাটা গোষ্ঠীকে বরাত দিয়েছিল। টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি হাওড়া ব্রিজের জন্য একটি বিশেষ ধরনের ইস্পাত তৈরি করেছিল। যার নাম টিসক্রম। এই ‘টিসক্রম’ নামের ধাতুসংকর তৈরি হয়েছিল শুধুমাত্র এই সেতুর জন্য। প্রিস্ট্রেসড বা ব্রিজে লাগানোর পরে যা বেঁকে যাবে না, এমন ধাতুসংকর। কানাডা ও স্কটল্যান্ডের পরে এটিই ছিল বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম সাসপেনশনটাইপ ব্যালান্সড ব্রিজ। 
১৯৩৭ সালে ব্রিজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে। দেশজুড়ে চলছে স্বাধীনতা আন্দোলন। এরই মাঝে ১৯৪৩ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে ‘হাওড়া ব্রিজ’ জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। আজকাল যেভাবে সেতু উদ্বোধন হয়, এই সেতু মোটেও সেইভাবে উদ্বোধন হয়নি। এই সেতু উদ্বোধন করে একটি যাত্রীবিহীন ট্রাম। তাও আবার রাতের অন্ধকারে। কারণ, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ব্রিজে কালো রং করা নেই। হামলার আশঙ্কায় বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল। আরও একটি বিষয়, ব্রিজের কোনো ছবি যাতে শত্রুপক্ষের হাতে না যায়, সেই ব্যাপারেও চরম সতর্ক ছিল ব্রিটিশরা। ব্রিজের ছবি তোলা নিষিদ্ধ ছিল দীর্ঘদিন। জাপানি বিমানের ভয়ে রাতে আলো জ্বালানো হত না ব্রিজ ও ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায়। এভাবেই বন্দর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকা হাওড়া ব্রিজকে রক্ষা করেছিল ব্রিটিশরা। 
হাওড়া ব্রিজ শুধু একটি ব্রিজ নয়। বাংলা ও বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক। যে সারা বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে জানান দেয়, সে ছিল-আছে-থাকবে।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ