Bartaman Logo
২৮ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

বলের ইতিহাস

২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ট্রিয়োন্ডা প্রযুক্তির নতুন যুগের সূচনা করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও নকশায় ফুটবলের ইতিহাস বদলে যাচ্ছে। বিস্তারিত পড়ুন।

বলের ইতিহাস
  • ২৮ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

২০২৬ বিশ্বকাপের বল

Advertisement

শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়: জমে উঠেছে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল। মেসি, এমবাপে, হালান্ডরা গোলের পর গোল করে গোল্ডেন বলের প্রতিযোগিতাকে আরও জমিয়ে তুলেছেন। মেসি, এমবাপের মধ্যে অবশ্য আরও একটা লড়াই হচ্ছে, সেটা হল শেষ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে সবথেকে বেশি গোল করার নজিরের পাশে কার নাম লেখা হবে, তা নিয়ে। ইতিমধ্যে দু’জনেই টপকে গিয়েছেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজ আর ব্রাজিলের রোনাল্ডো নাজারিওকে। তা এত যে লড়াই হচ্ছে, বিশ্বকাপে এত গোল হচ্ছে, ম্যাচগুলো খেলা হচ্ছে কোন বলে তোমরা কি জানো ছোট্ট বন্ধুরা?    
এবারের বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বলের নাম ‘ট্রিয়োন্ডা’। এবারও অ্যাডিডাস তৈরি করেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের অফিশিয়াল ম্যাচ বল। স্পেনীয় শব্দ ‘ওন্ডা’ মানে ঢেউ, আর ‘ট্রাই’ মানে তিন। বলটির নকশা এবং রঙে তিনটি দেশের সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কানাডার লাল, মেক্সিকোর সবুজ ও আমেরিকার নীল রঙের ছোঁয়া রয়েছে। সেই সঙ্গে বলের গায়ে রয়েছে কানাডার ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর ঈগল এবং আমেরিকার তারা চিহ্ন। ট্রফির প্রতি সম্মান জানাতে এতে সোনালি রঙের কারুকার্যও করা হয়েছে।
বলটির সবচেয়ে বড়ো বিশেষত্ব হল এর গঠন। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বল মাত্র চারটি প্যানেল জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ট্রিয়োন্ডার ওপর ঢেউয়ের মতো প্যানেলের নকশাগুলো একটি কেন্দ্রীয় ত্রিভুজে গিয়ে মিশেছে। থার্মাল বন্ডেড টেকনোলজির মাধ্যমে তাপ দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে প্যানেলগুলি। তাই ট্রিয়োন্ডার গায়ে কোনো সেলাই নেই। প্যানেলগুলো এমনভাবে জোড়া লাগানো হয়েছে, যাতে বাতাসে বলের গতিকে একদম নিখুঁত ও স্থিতিশীল রাখে। এর ফলে বলটি বাতাসে অস্বাভাবিকভাবে দিক পরিবর্তন করে না। যেটা সমস্যা হয়েছিল ২০১০ বিশ্বকাপের বল ‘জাবুলানি’কে নিয়ে। বলের চামড়ার ওপর বিশেষ ধরনের সূক্ষ্ম লোগো খোদাই করা আছে। আয়োজক তিনটি দেশের আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে ট্রিয়োন্ডাকে তৈরি করা হয়েছে। ‘ফিফা কোয়ালিটি প্রো’ সার্টিফিকেশন পেয়েছে এই বল। এটা যেকোনো আবহাওয়াতেই ফুটবলারদের ড্রিবলিং করতে কিংবা গোলকিপারদের সহজে বল লুফে নিতে সাহায্য করছে। এটি এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে বৃষ্টির জলেও কোনো পরিবর্তন না হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতেই বলের ওজন একই থাকবে।
প্রযুক্তির দিক থেকেও ট্রিয়োন্ডা দারুণ আধুনিক। কানেক্টেড বল প্রযুক্তির জন্য বলের ভেতরে একটি উন্নত মোশন সেন্সর চিপ বসানো আছে। এই চিপটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার সিগন্যাল পাঠাতে পারে। অফসাইড, হ্যান্ডবল বা বল গোললাইন পার হয়েছে কি না, সেই সিদ্ধান্তগুলো রেফারিরা খুব দ্রুত নির্ভুলভাবে নিতে পারছেন। বলের ভিতরের চিপটিকে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে, যাতে সেটি ঠিকমতো কাজ করে। একবার পুরো চার্জ দিলে টানা ৬ ঘণ্টা কাজ করতে পারে চিপটি। বিশ্বকাপ ফুটবলকে আরও গতিময় ও নিখুঁত করছে ট্রিয়োন্ডা।

 

উৎপল অধিকারী: ফুটবল খেলার নীরব নায়ক ফুটবল নিজেই। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্যবহৃত প্রতিটি অফিসিয়াল বল শুধু একটি ক্রীড়া সরঞ্জাম নয়— বরং প্রযুক্তি, নকশা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল। বলের ওজন, সেলাই, প্যানেলের সংখ্যা, উপাদান, এমনকি বাতাসে তার গতিপথ— সবকিছু বদলে দিয়েছে এই খেলার ধরন। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের চামড়ার বল থেকে ২০২৬ সালের উচ্চপ্রযুক্তির স্মার্ট বল— এই যাত্রা ফুটবলের বিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি।

চামড়ার বলের যুগ: ১৯৩০-১৯৬৬
 ১৯৩০: উরুগুয়ে বিশ্বকাপ
প্রথম বিশ্বকাপে কোনো একক অফিসিয়াল বল ছিল না। ফাইনালে দুই দলের মতবিরোধ মেটাতে প্রথমার্ধে আর্জেন্তিনার এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল ব্যবহার করা হয়। এগুলি ছিল মোটা চামড়ার তৈরি। এর বাইরের দিকে ফিতার মতো বন্ধনী থাকত। বৃষ্টিতে ভিজে বল ভারী হয়ে যেত, ফলে হেড করা খেলোয়াড়দের জন্য কষ্টকর ছিল। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ইতালি ও ফ্রান্স বিশ্বকাপেও চামড়ার বল ব্যবহৃত হয়। ধীরে ধীরে বাইরের সেলাই উন্নত হলেও জল শোষণের সমস্যা রয়ে যায়। পরে ১৯৫০ সালে লেসবিহীন গোলাকার নকশা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। বলের ভারসাম্য কিছুটা বাড়লেও এখনও প্রাকৃতিক চামড়াই প্রধান উপাদান। ১৯৫৪, ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে বল আরও গোলাকার ও টেকসই হয়। তবে আবহাওয়ার প্রভাবে ওজন পরিবর্তনের সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে ব্যবহৃত চ্যালেঞ্জ ফোর স্টার বল ছিল চামড়ার যুগের অন্যতম সেরা উদাহরণ। কিন্তু এটিই ছিল বিশ্বকাপে প্রাকৃতিক চামড়ার বলের শেষ অধ্যায়ের সূচনা।

 আধুনিক যুগের সূচনা
১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে টেলস্টার নামে বল প্রথমবারের মতো অ্যাডিডাস সরবরাহ করে। টেলস্টারের সাদা-কালো ৩২ প্যানেলের নকশা টেলিভিশনে বলকে স্পষ্ট দেখানোর জন্য তৈরি হয়েছিল। ১২টি কালো পেন্টাগন ও ২০টি সাদা হেক্সাগনের এই নকশাই পরবর্তী কয়েক দশক ধরে ‘আদর্শ ফুটবল’ এর প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালে টেলস্টার ডারলাস্ট হল পূর্বসূরির উন্নত সংস্করণ। বিশেষ আবরণ ব্যবহার করে জল প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো হয়। এর ফলে বলের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্তিনা বিশ্বকাপের ট্যাঙ্গো বল তার নান্দনিক নকশার জন্য বিখ্যাত। ২০টি ত্রিভুজাকার অলংকরণ এমনভাবে সাজানো ছিল যে, দূর থেকে ১২টি বৃত্তের মতো দেখাত। এই নকশা বহু বছর ধরে বিশ্বকাপ বলের পরিচয় হয়ে ছিল।
১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে ব্যবহৃত ট্যাঙ্গো এস্পানিয়া বলটির বাইরের স্তরে পলিউরেথেন ব্যবহার করা হয়। ফলে জল শোষণ অনেক কমে যায়। এটি ছিল সিন্থেটিক উপাদানের দিকে বড়ো পদক্ষেপ। এরপর ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে অ্যাজটেকা নামের যে বল ব্যবহৃত হয়, তা ছিল সম্পূর্ণ সিন্থেটিক উপাদানে তৈরি প্রথম বিশ্বকাপ বল। বর্ষা বা আর্দ্র আবহাওয়াতেও এর কর্মক্ষমতা প্রায় অপরিবর্তিত থাকত। পরে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ হয়।
১৯৯০ সালে ইট্রুস্কো ইউনিকো হল ইতালির প্রাচীন এট্রাস্কান সভ্যতা থেকে অনুপ্রাণিত এক নকশা। ভেতরে ফোমের স্তর যুক্ত হওয়ায় বল নরম অনুভূত হলেও নিয়ন্ত্রণে সুবিধা দিত। ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোয়েস্ট্রা মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত বিশেষ বল। বিশেষ পলিথিন ফোম ব্যবহারের কারণে বল দ্রুতগতি সম্পন্ন হয়ে ওঠে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবার বিশ্বকাপের বলে বহু রঙের ব্যবহার দেখা যায়। নীল, সাদা ও লাল রং ফরাসি জাতীয় পতাকার প্রতীক বহন করে। এটি ট্রাইকোলর বল নামে পরিচিত ছিল।

 নতুন সহস্রাব্দে বিপ্লব
২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ আয়োজিত বিশ্বকাপের বলটি ঐতিহ্যবাহী কালো-সাদা নকশা ভেঙে সোনালি ও সবুজ অলংকরণে সাজানো হয়। ফেভারনোভা বলটির এরোডাইনামিক বৈশিষ্ট্য খেলোয়াড়দের নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপের বল ছিল টিমজিয়েস্ট। জার্মানিতে ব্যবহৃত এই বলে মাত্র ১৪টি প্যানেল ছিল, যা তাপের মাধ্যমে জোড়া লাগানো হয়। ফলে গোলাকারভাব বৃদ্ধি পায় এবং শটের নির্ভুলতা উন্নত হয়। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকার ‘জাবুলানি’ বলটি সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত বিশ্বকাপ বল। মাত্র ৮টি প্যানেলযুক্ত এই বল বাতাসে অপ্রত্যাশিতভাবে দিক পরিবর্তন করত বলে বহু গোলরক্ষক ও খেলোয়াড় অভিযোগ করেছিলেন। তবে দূরপাল্লার শটে এটি অসাধারণ গতি দিত। জাবুলানির সমালোচনার পর ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ব্যবহৃত ব্রাজুকা দীর্ঘ পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়। ৬টি সিমেট্রিক্যাল প্যানেলবিশিষ্ট এই বল স্থিতিশীলতা, নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য খেলোয়াড়দের ব্যাপক প্রশংসা পায়।

 টেলস্টার ১৮
রাশিয়া বিশ্বকাপে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক টেলস্টারের আধুনিক রূপ ফিরিয়ে আনা হয়। এতে এনএফসি চিপ যুক্ত ছিল, যার মাধ্যমে স্মার্টফোনের সাহায্যে ব্যবহারকারীরা বিশেষ তথ্য ও অভিজ্ঞতা পেতে পারতেন।

 আল রিহলা
কাতার বিশ্বকাপের বল ‘আল রিহলা’র অর্থ হল ‘যাত্রা’। অত্যন্ত দ্রুতগতির বল। ভেতরে ইনার্টিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (আইএমইউ) সেন্সর ব্যবহৃত হয়। যা প্রতি সেকেন্ডে বহুবার বলের অবস্থান রেকর্ড করে ‘ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি’ ব্যবস্থাকে সহায়তা করে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ