Bartaman Logo
২৮ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

সেরা উপহার

মিমি সায়ন্তিকার জন্মদিনের জন্য সেরা উপহার খুঁজছে। বাবার পরামর্শে কী উপহার পাবে সে? বিস্তারিত জানুন।

সেরা উপহার
  • ২৮ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রদীপ আচার্য: দাদু প্রমথেশবাবুই শেষতক মিমির মুশকিল আসান হলেন। মিমি জানত, তার দাদুই এ ব্যাপারে একটা ওয়াইজ সাজেশন দেবেন। দিলেনও তাই। তবে দাদুর কথা শুনে প্রথমে অবাকই হয়েছিল মিমি। ওর মনে হয়েছে, যাহ, তা-ও আবার হয় নাকি? কিন্তু দাদুর যুক্তির কাছে হার মানতেই হল। চোখও খুলে গেল তার। তাই তো! দাদু যা বললেন, তা তো সে কখনো ভেবেই দেখেনি! মিমি মনে 

Advertisement

মনে বলে, ‘দাদু, তোমাকে স্যালুট, তোমাকে স্যালুট।’ 
সায়ন্তিকার জন্মদিনে কী উপহার দেওয়া যায়, ভেবে পাচ্ছিল না মিমি। ওদের এখন ক্লাস এইট। তাই টেডিবেয়ার গোছের কিছু আর দেওয়া যায় না। সেসব নিয়ে আমোদ আহ্লাদ করে খেলে বেড়ানোর বয়স আর নেই ওদের। দু’বছর পরেই মাধ্যমিক দেবে। মিমির মা শুভ্রাই বলেছেন, ‘টেডিবেয়ার না দিস, ওই সিরিজেরই কান ঝোলা কুকুর, বাঘ এসব কিছু দে না। একেবারে জীবন্ত মনে হয়। ঘরে শো-পিসের মতো সাজিয়ে তো রাখতে পারবে।’ কিন্তু, তা মিমির মনঃপুত হয়নি। ক্লাসের রেজাল্টের মতোই সব ব্যাপারে একটা চমক দিতে চায় সে। 
মিমির বাবা হিমাদ্রি ওর কোনো কিছুকেই সিরিয়াসলি নেন না। মিমিকে ভাবেন, সে এখনও বুঝি সেই ছোট্ট কোলের মেয়েটিই আছে। বাবার কথা শুনলে তাই মনে হয়। শুধু আজগুবি সব কথা বলবে। সব জেনেও সেই বাবার কাছেই গিয়ে মিমি গলা ধরে ঝুলে পড়ল। বলল, ‘বল না বাবা, সায়ন্তিকার জন্মদিনে কী গিফট দেওয়া যায়।’ শুনে তার বাবা যেন ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসলি নিলেন বলে মনে হল। বললেন, ‘সত্যিই তো কী গিফট দেওয়া যায়? কী দেওয়া যায়? এ তো খুবই চিন্তার বিষয়। বন্ধুর বার্থডে পার্টি বলে কথা। হেঁজিপেঁজির মতো কিছু একটা নিয়ে গিয়ে হাজির হলাম, তা তো হয় না। কী বলিস?’
‘তাই তো বলছি।’
‘সুতরাং এমন একটা গিফট দিতে হবে যা দেখে সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। সবাই একবাক্যে বলবে, বাহবা বাহবা বেশ।’ বাবার কথা শুনে মিমি খুবই উৎসাহ পেল। সে ভাবল, বাবা তো তার মনের কথাই বলছেন। তাহলে বাবা নিশ্চয়ই এমন একটা গিফটের কথা বলবেন, যা একেবারেই এক্সট্রাঅর্ডিনারি। হিমাদ্রি বললেন, ‘দেখ মিমি, এইসব গিফটের ব্যাপারে সবচেয়ে বড়ো অসুবিধে 
কী জানিস?’
‘কী বাবা?’
‘বড়ো অসুবিধে হল, প্রেজেন্টেশনটা কমন হয়ে যাওয়া। ধর তুই যা দিলি, একই আইটেম আরও একজন দিল। তখন অটোমেটিক্যালি তোমার গিফটা ফালতু হয়ে গেল। তোমার চেয়ে সেটা দামি হলে, ইন বিটুইন টু, কম্পারিজমে তুই হয়তো মার খেয়ে গেলি। সেটা কিন্তু খুবই পেইনফুল হবে। সুতরাং এমন একটা নতুন কিছু দিতে হবে, যা কিনা আনপ্যারালাল, আনপুটডাউনেবল, সামথিং ইউনিক, সামথিং অ্যামিউজিং, সামথিং এক্সক্লুসিভ। দ্যাটিজ ওনলি ইওর ব্রেন চাইল্ড। অন্য কারও মাথাতেই আসবে না। সবাই 
ভাববে, সত্যিই তো! এটা তো সত্যিই 
সেরা উপহার!’
‘ও বাবা, ইউ আর গ্রেট। আমিও ঠিক এরকমই একটা কিছু দিতে চাই, যা দেখে সবাই চমকে যাবে। আমি অনেক পয়েন্ট পেয়ে যাব। কিন্তু, সেটা কী? সেটা 
তো বলবে!’
‘বলছি, বলছি। আমার মাথায় সেরকমই একটা ভাবনা এসে ঘুরপাক খাচ্ছে।’ মিমি খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। বলে, ‘বল না বাবা, বল না সেটা কী?’ হিমাদ্রি খানিক চুপ করে রইলেন। তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ল। বাবার এই মুডটা মিমির খুব চেনা। ওর বাবা যখন খুব গভীরভাবে কিছু ভাবেন, তখন বাবাকে এরকমই সিরিয়াস দেখায়। হিমাদ্রি শেষতক মুখ খুললেন। বললেন, ‘ধর, রাজভবন থেকে যদি কাঠা দুয়েক জমি প্রেজেন্ট করা যায়, কেমন হয়?’ মিমি বলল, ‘ধ্যাত! তোমার সেই একই মশকরা।’ সে বুঝল, তার বাবা তাকে সেই তিন বছরের মিমিই ভাবেন এখনও। ওর বাবা সেই ছোট্টবেলায় প্রেজেন্টেশন নিয়ে এরকমই কৌতুক করতেন। মিমির মনে পড়ে, ও তখন খুব ছোটো। ওর বাবা একবার বলেছিলেন, ‘না না পেন্সিল বক্স, টিফিন বক্স টক্স দিস না। তারচেয়ে বরং গড়ের মাঠ থেকে কয়েক কাঠা জমি দিয়ে দে।’ তখন মিমি ভাবত, বাবাই বুঝি গড়ের মাঠের মালিক। কিন্তু এত বছরেও হিমাদ্রি এতটুকুও বদলাননি। মিমি বলল, ‘আমি আর কক্ষনো তোমার কাছে কোনো সাজেশন নিতে আসব না।’ হিমাদ্রি বললেন, ‘এলি কেন? তোর ফেভারিট দাদু দি গ্রেট, তিনিই তো আছেন!’ মিমি বলল, ‘ল’ ইয়ার মশাই, তুমিই তো বলেছ, কেস আগে লোয়ার কোর্টে যায়, সেখান থেকে হাইকোর্ট, তারপরে সুপ্রিম কোর্ট। দাদু আমার সুপ্রিম কোর্ট। তাই আগে লোয়ার কোর্ট মায়ের কাছে গিয়েছিলাম। মা 
পাঠাল হাইকোর্টে। হাইকোর্ট যখন 
কেসটা গোলালো, মানে শীর্ষ আদালতে রেফার করল, তখন তো সুপ্রিম কোর্টে যেতে হবেই।’
কিন্তু দাদু তো বাড়িতেই নেই। আজ রোববার। দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে এল, তবু দাদুর দেখা নেই। মা বললেন, ‘সকালের জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে গিয়েছে। কী নাকি একটা জরুরি মিটিং আছে বলল।’ 
ঠা ঠা দুপুরের রোদ মাথায় করে দাদু প্রমথেশবাবু ফিরলেন।
মিমি বলল, ‘দাদু, তোমার সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে। মা, বাবা দু’জনেই ফেল। তুমি আমার সুপ্রিম কোর্ট। তাই মামলাটা আমি তোমার সিঙ্গল বেঞ্চে তুলতে চাই।’ মিমির দাদু উকিল, বাবা উকিল। তাই উকিল বাড়ির মেয়ে ওই সব সিঙ্গল বেঞ্চ, ডিভিশন বেঞ্চ টার্মগুলো বেশ রপ্ত করে নিয়েছে। প্রমথেশবাবু বললেন, ‘ঠিক আছে আজ সন্ধেবেলা বেঞ্চ বসবে। এখন আগে আমি স্নান-খাওয়া করে একটু বিছানায় গড়িয়ে নিই। খুব ধকল গিয়েছে।’
অভিরূপ স্যারের কোচিং থেকে ফিরেই সোজা দাদুর ঘরে হানা দিল মিমি। ঝুপ করে দাদুর বিছানায় বসে পড়ল। বলল, ‘দাদু, এখন কি কোর্ট বসবে? শুনানি হবে?’ প্রমথেশবাবু বললেন, ‘অফকোর্স হবে। কিন্তু তোমার পক্ষে ল’ইয়ার কে?’ 
‘হুজুর, আমি নিজেই সওয়াল 
করতে চাই।’
‘বেশ, বল তোমার কী বলার আছে?’
‘হুজুর, আপনি বলুন... ধ্যাত, এত ফরমাল হতে ভালো লাগে না। ও দাদু, তুমি বল তো সায়ন্তিকার জন্মদিনে কী গিফট দেওয়া যায়। মানে এমন একটা গিফট যা হবে এক্সট্রাঅর্ডিনারি। সবার চোখ পড়বে। সবাই বলবে, না, সত্যিই এটা কিন্তু সত্যিই সেরা উপহার। বল না দাদু, সেই গিফটটা কী হতে পারে?’ প্রমথেশবাবু ধীর গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বই।’
শুনে মিমির চোখ ছানাবড়া হল। সে আকাশ থেকে পড়ল। বলল, ‘বই! ধ্যাত, বই আবার একটা গিফট হয় নাকি?’ প্রমথেশবাবু বললেন, ‘বই-ই তো গিফট রে। কালে কালে সেই গিফট শিফট করে গিয়েছে ওইসব ইমমেটেরিয়াল জিনিসপত্রে। জামা, কাপড়, খেলনার জিনিস, শো-পিস, প্রেশার কুকার, কাপ-প্লেটের সেট, ডিনার সেট এসব কি উপহার? এগুলো সব হল উপকার। মানে আমাকে আর কিনতে হল না। তুমি কিনে আমার উপকার করে দিলে। আমি যথেচ্ছ ব্যবহার করলাম। কে দিয়েছিল, একদিন তাও ভুলে গেলাম। তারপর একদিন তা আর ব্যবহারও করা গেল না। চলে গেল গারবেজে। জঞ্জালের স্তূপে। পুরসভার গাড়ি এসে নিয়ে গেল সে জঞ্জাল। কে কী দিয়েছে, অনেকে আবার তা খতিয়েও দেখে না, দেখলেও মনে রাখে না। তোমারই দেওয়া গিফট দেখিয়ে কেউ হয়তো তোমাকেই বলতেই পারে, এটা আমার পিসিমণি দিয়েছিল। তখন তুমি কি তার সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ করবে? তুমি যে দিয়েছ, সেকি তার গায়ে লেখা আছে? কিন্তু বইয়ের গায়ে লেখা থাকবে সায়ন্তিকার জন্মদিনে প্রীতি উপহার সেবন্তী বসু।’
মিমি আর কোনো কথাই খুঁজে পায় না। সে কী বলবে? তার দাদু তো ঠিকই বলেছেন। প্রমথেশবাবু বললেন, ‘‘তোর বন্ধু তো রবীন্দ্রসংগীত শেখে বলছিলি। ওকে একটা অখণ্ড গীতবিতান উপহার দিয়ে লিখে দে, ‘গাইছ যখন রবি ঠাকুরের গান, হাতের কাছে রেখ গীতবিতান।’ দেখবি সেটাই সেরা উপহার হয়ে যাবে।’ মিমি বলল, ‘বাহ! দাদু, বেশ সুন্দর করে বললে তো!’’
প্রমথেশবাবু বললেন, ‘গিফট মানে তো বই-ই ছিল রে।’ প্রমথেশবাবু এবার বইয়ের আলমারি খুলে তাঁর উপহার পাওয়া, মিমির বাবা হিমাদ্রির পাওয়া সব উপহারের বই খুলে খুলে দেখালেন। সব বইতে কে কবে কী উপলক্ষ্যে দিয়েছেন, তাঁর নাম সন তারিখসহ সব লেখা রয়েছে। কবেকার পাওয়া গিফট এখনও পুরানো স্মৃতি হয়ে রয়ে গিয়েছে আলমারিতে। প্রমথেশবাবু ছোটোদের জন্য ছড়া-কবিতা লেখেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। মুখে মুখে ছড়া বলেন। তাই ইন্সট্যান্ট ছড়া কেটেই তিনি বললেন, ‘যুগের পর যুগ চলে যায়। আলমারিতে বই থেকে যায়।’ মিমি অবাক চোখে সব দেখল। তারপর বলল, ‘দাদু, আমি এই বইগুলো পড়ব।’ প্রমথেশবাবু বললেন, ‘নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই পড়বি। পড়বি, তার কারণ হল, এমন অবাক কে আর করে? দাদুর বই নাতনি পড়ে।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ