‘পিপীলিকার পাখা’ নিয়ে রয়েছে বাংলা প্রবাদ। পাখা গজালে কি সত্যিই পিঁপড়ে মরে যায়? কেন গজায় পিঁপড়ের ডানা? তার কারণ জানালেন স্বরূপ কুলভী।
‘পিপীলিকার পাখা’ নিয়ে রয়েছে বাংলা প্রবাদ। পাখা গজালে কি সত্যিই পিঁপড়ে মরে যায়? কেন গজায় পিঁপড়ের ডানা? তার কারণ জানালেন স্বরূপ কুলভী।
পিঁপড়েদের জগৎ খুবই বিচিত্র। নানান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে আসে, যা চমকে দেয়। বিশ্বজুড়ে ১২ হাজারেরও বেশি প্রজাতির পিঁপড়ে রয়েছে। আমাজন জঙ্গলের বুলেট পিঁপড়ের হুল সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক। এরা দলবদ্ধভাবে থাকে। পিঁপড়ে অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ ও কর্মঠ। মানুষের মতো একটানা ঘুমায় না। এরা সামান্য সময়ের জন্য খানিক জিরিয়ে নেয়। এভাবে অল্প অল্প করে সারা দিনে প্রায় আড়াইশোবার ঘুমোয়। তবে এর মেয়াদ মিনিট খানেক বা তার সামান্য বেশি। যদিও রানি পিঁপড়ের ব্যাপারটাই আলাদা। তারা দিনে ৯ ঘণ্টা মতো ঘুমায়। পিঁপড়েকে মানুষের চেয়ে বেশি সমাজবদ্ধ জীব বলা হয়ে থাকে। এক-একটা কলোনি বা উপনিবেশ গড়ে বসবাস করে পিঁপড়ের দল। প্রতিটি কলোনির মধ্যমণি একটি রানি পিঁপড়ে। গোটা কলোনি গড়ে ওঠে এই রানি পিঁপড়েকে ঘিরেই। আর থাকে কিছু পুরুষ পিঁপড়ে। খাদ্য সংগ্রহ, বাসা তৈরি-রক্ষণাবেক্ষণ, বাচ্চাদের যত্নআত্তি, রানি ও পুরুষ পিঁপড়েদের দেখভাল-এসবের দায়িত্ব কাঁধে নেয় শ্রমিক পিঁপড়েরা। আর থাকে সৈনিক। তারা কলোনির সামরিক বাহিনী। শত্রু এলে নাস্তানাবুদ করাই তাদের কাজ। ফেরোমেন নামে রাসায়নিকের মাধ্যমে পিঁপড়েরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখে। খাবারের খোঁজ পেলে বা বিপদ থাকলে বা অন্য ধরনের বার্তা পৌঁছে দিতে তারা বিভিন্ন ধরনের ফেরোমেন নিঃসরণ করে। এক জায়গা থেকে দূরের কোথাও যেতে পিঁপড়েদের ডানাও গজায়। আমাদের মধ্যে একটি চলতি প্রবাদ রয়েছে, ‘পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে’। কারও ঔদ্ধত্য বা অহংকারকে কটাক্ষ করতে এই প্রবাদ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সত্যিই কি ডানা গজানোর পর পিঁপড়ে আগুনে ঝাঁপ দেয়? বিজ্ঞানীরা কিন্তু তেমন মনে করেন না। তাঁরা বলছেন, পিঁপড়েদের এই পৃথিবীতে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান উপাদানই হল তাদের এই পাখা। এর সাহায্যেই তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। নিজেদের আলাদা আলাদা কলোনি গড়ে তোলে।
রানি পিঁপড়ে একসঙ্গে কয়েকশো ডিম পাড়ে। এর থেকেই জন্ম হয় রানি, সৈনিক, শ্রমিক ও সামান্য কিছু পুরুষ পিঁপড়ের। এবার ডিম ফুটে যেসব বাচ্চার জন্ম হয়, সেগুলির মধ্যে রানি পিঁপড়েও থাকে। কিন্তু একটা ডেরায় তো একাধিক রানি থাকতে পারে না। তাই রানি পিঁপড়ে বড়ো হলে সমস্যা দেখা যায়। ঝগড়া-ঝামেলাও শুরু হয়। এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই কীভাবে মেলে? তখন অন্য রানি পিঁপড়েদের ওই ডেরা ছাড়তে হয়।
এর অর্থ হল নতুন করে বাসা তৈরি করা। কিন্তু পুরানোর পাশেই যদি নতুন একটা কলোনি গড়ে ওঠে, তাহলে তো নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেবে। সবচেয়ে বড়ো বিষয় হল, খাবার। একই জায়গা যদি একাধিক কলোনির খাদ্যশিকারের উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তো বেশ সমস্যা হবে। তাই বেশ খানিকটা দূরে যেতে হয়। যদিও এত ভেবেচিন্তে পিঁপড়েরা ডেরা বদল করে না। এটা বংশানুক্রমিকভাবেই তাদের মধ্যে রয়েছে। ডিএনএ-তে থাকা তথ্যের ইঞ্জিনই এক্ষেত্রে তাদের চালনা করে। সেই মতো নতুন রানি আরও কিছু পিঁপড়েকে সঙ্গে নিয়ে পুরনো কলোনিকে বিদায় জানায়। এবার নতুন কলোনি গড়তে অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হয়। হেঁটে হেঁটে খুব বেশি দূরে যাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে পাখাই হয়ে ওঠে তাদের ভরসা। জন্মের পর একটা নির্দিষ্ট সময়ে পিঁপড়েদের ডানা গজায়। এভাবেই অন্য কোথাও উড়ে গিয়ে কলোনি গড়ে তোলে তারা। ল্যাম্প পোস্টে বা অন্য আলোর উৎসের কাছে পাখাওয়ালা পিঁপড়েদের উদভ্রান্তের মতো ছুটে এসে বসতে দেখা যায়। তারপর সেখানে অনেক পিঁপড়েকে মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এমনটা কেন হয়? আসলে সূর্যের আলো ব্যবহার করেই উড়ে যায় পিঁপড়েরা। তাই সন্ধ্যা নামলে তাদের পথচলায় বিরতি পড়ে। কিন্তু রাতে কোনো কৃত্রিম আলো জ্বললে পিঁপড়েরা দিশা হারিয়ে ফেলে। তারা ওই আলোর দিকে ছুটে যায়। এই ঘটনাই তাদের কাছে মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।