Bartaman Logo
২৮ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ডিম! অভিমান-ভালোবাসা-প্রতিবাদ

রোমে ডিম নিক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিবাদের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এটি সমাজের অসন্তোষের এক বিশেষ ভাষা। বিস্তারিত পড়ুন।

ডিম! অভিমান-ভালোবাসা-প্রতিবাদ
  • ২৮ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
•যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও আগের রোমান সাম্রাজ্য। একদিকে রোম নগরীর চূড়ান্ত বৈভব। সারা নগরী জুড়ে শ্বেতমর্মর প্রাসাদ, মন্দির, কলোসিয়াম, প্রেক্ষাগৃহ, অভিজাত ব্যক্তিবর্গদের জন্য সীমাহীন বিলাসব্যসন ও আমোদপ্রমোদের ব্যবস্থা। আর তারই আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার—দাস ব্যবসা, হিংস্র পশুর সঙ্গে কলোসিয়ামে গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই, গরিব মানুষদের উপর অভিজাত আর পুরোহিতদের শোষণ। সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষ আর পুরোহিতরাই রাজার পরামর্শদাতা, তাঁরাই আসলে প্রকৃতপক্ষে দেশ শাসন করেন। যাবতীয় ক্ষমতা আর সুখভোগের অধিকারীও তাঁরাই। তাঁরা শুভ্রবসন পরা সেনেটর। জনগণের মনে, বিশেষত গরিব মানুষের মনে সেনেটরদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, কিন্তু মহাশক্তিধর রোমান সাম্রাজ্য বা তার পরিচালক সেনেটরদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ করা বা অস্ত্র ধারণ করার ক্ষমতা বা সাহস কোনোটাই নাগরিকদের নেই। তবে কেউ কেউ কখনো কখনো হঠাৎই সাহসী হয়ে ওঠে। শ্বেতপাথরে মোড়া, বিশাল স্তম্ভ আর প্রশস্ত সিঁড়ি সমৃদ্ধ সেনেট গৃহ। সেখানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন সেনেটররা। তাঁদের পায়ের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা জনসাধারণের উদ্দেশে। সেই বক্তৃতার মূল কথা হল, রাজার গুণকীর্তন করা ও এই শাসন ব্যবস্থায় নাগরিকরা কত সুখে আছেন, সেকথা তাঁদের বোঝানো। এক আলোকোজ্জ্বল সকালে সেনেট ভবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছিলেন শুভ্রবসন পরিহিত এক সেনেটর। সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে তা শুনছিলেন নাগরিকরা। সেনেটর তখন তাঁর গতে বাঁধা ভাষণে বলছেন, ‘এই নগরীর জনসাধারণ রাজা ও সেনেটরদের শাসন ব্যবস্থায় কী অপরিসীম সুখভোগ করে চলেছে...!’ ঠিক সেই সময় এক ব্যক্তি আর মিথ্যাচার সহ্য না করতে পেরে সঙ্গে থাকা একটা ডিম ছুড়ে মারেন সেনেটরকে নিশানা করে। নির্ভুল লক্ষ্যভেদ। মুহূর্তের মধ্যে সেনেটরের শ্বেতশুভ্র পোশাক ভরে গেল ডিমের লালচে হলুদ কুসুমে। নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল তাঁর অভিজাত-গরিমা। হ্যাঁ, এ ধরনের ঘটনাই বলা আছে প্রাচীন গল্প কাহিনির পাতায়। কেউ কেউ আবার বলেন, রোমে নয়, গ্রিসেই প্রথম ডিম ছুড়ে প্রতিবাদ করেছিলেন আম জনতা। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তা সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রাচীন ইউরোপে। এই ডিম নিক্ষেপ বা ‘এগিং’ সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে অন্তত দু’হাজার বছর আগে। ডিম নিক্ষেপের মোটামুটি প্রামাণ্য যে তথ্য মেলে, তা ৬৩ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। ঐতিহাসিক-গবেষকদের মতে, সেই সময় রোমান শাসক ভেসপাসিয়ানকে প্রজারা ডিম ছুড়ে মেরেছিল তাঁর জনবিরোধী শাসন ব্যবস্থার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে। তবে ডিম নিক্ষেপ প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠল কেন? প্রাচীন ইউরোপেও ডিম অতি সহজলভ্য বস্তু ছিল। ডিমের আঘাত মানুষের দেহে তেমন কোনো ক্ষতি করে না, যা করে তা হল আঘাতপ্রাপ্ত মানুষটির সম্মানের ক্ষতি। অনেকের মতে, এগিং হল একটি অহিংস প্রতিবাদ। সেই কারণে প্রাচীনকাল থেকেই ডিম নিক্ষেপ হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ভাষা, ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা, অসন্তোষের ভাষা, বিদ্রুপের ভাষা। শুধু শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই নয়, ঘৃণিত ব্যক্তিদের নিশানা করেও ডিম ছোড়া হত। মধ্যযুগে চার্চের অবমাননা বা সামাজিক অপরাধের জন্য এক ধরনের শাস্তির বিধান ছিল। অপরাধীদের কাঠের খাঁচায় বন্দি করে প্রকাশ্য রাজপথের পাশে এনে রাখা হত। আর জনসাধারণ সেই বন্দিকে পচা ডিম ছুড়ে মারত। ক্ষেত্রবিশেষে শারীরিক আঘাতের চাইতে ডিম্বাঘাত অনেক বেশি মারাত্মক। বিশেষত যাঁকে ডিম ছোড়া হয়েছে, তিনি যদি সামাজিক প্রতিপত্তিশালী মানুষ হয়ে থাকেন, তাহলে তো কথাই নেই। কারণ তাঁর গড়ে তোলা সামাজিক সম্মান ডিম্বাঘাতে মুহূর্তের সঙ্গেই ভূ-লুণ্ঠিত হয়।
ডিম নিক্ষেপের উৎপত্তিস্থল রোম বা গ্রিস হলেও প্রতিবাদ বা বিদ্রুপের অস্ত্র হিসাবে তার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় মধ্যযুগের ইংল্যান্ডেও। বিশেষত সে সময় নাট্যমঞ্চে, কনসার্ট পার্টির অভিনেতা-গায়ক-বাদ্যকাররা ডিম আক্রমণের ভয়ে বেশ ভয়ে ভয়ে থাকতেন। তাঁদের প্রদর্শনীর কোনো খামতি হলেই দর্শকাসন থেকে ধেয়ে আসত পচা ডিম। নাট্যশালার রঙ্গমঞ্চ থেকে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ সর্বত্রই ডিম্বাঘাতের প্রচলন বৃদ্ধি পায়। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ডিম গড়াতে গড়াতে সামাজিক প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসাবে উপস্থিত হয় আধুনিক পৃথিবীতে, ইউরোপীয় প্রতিবাদ সংস্কৃতির হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। যা আজও বর্তমান।
আমাদের দেশ বা মহাদেশে ডিম ছুড়ে মারার ব্যাপারটাও পশ্চিম সংস্কৃতি থেকেই এসেছে। এই প্রথার বয়সও খুব একটা বেশি নয়। প্রাচীন রোম বা গ্রিসে যখন ডিম ছুড়ে কোনো ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করা হত, ঠিক সেই সময় আমাদের দেশেও অহিংসভাবে লাঞ্ছনা বা অবমাননা করার বা শাস্তিদানের পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। তা হল মুখে ভুসো কালি লেপে দেওয়া, গায়ে গোবর বা থুতু দেওয়া। ষোড়শ মহাজনপদের ইতিহাসে, কাহিনিতে এমন বেশ কিছু ঘটনার উল্লেখ আছে। তবে আমাদের দেশের প্রাচীন কাহিনিতে ডিম ছোড়ার উল্লেখ মেলে না। তবে তা ডিমের অপ্রতুলতার কারণে নয়। আসলে প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয়রা খাদ্যকণার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। খাদ্যদ্রব্যকে প্রাচীন ভারতে ঈশ্বরের অমূল্য দান হিসাবেই দেখা হত। তা চালের কণা হোক বা কোনো ধরনের খাদ্যদ্রব্য। ডিম যেহেতু এক ধরনের খাদ্যদ্রব্য, তাই প্রাচীন ভারতবাসী তা ছুড়ে প্রতিবাদ জানাতেন না। তবে সারা পৃথিবীর মতো আজকের ভারতবর্ষেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডিম ছোড়া সাধারণ জনতা অথবা রাজনৈতিক কর্মীদের অহিংস প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পৃথিবীতে ডিম ছোড়ার বেশ কিছু ঘটনা বিভিন্ন সময় জনমানসে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এমনকি এখনও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা শোরগোল ফেলে দেয়। আধুনিক পৃথিবীতে বা হাল আমলের পৃথিবীতে যাদের দিকে ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছে সেই তালিকা বেশ চমকপ্রদ। যাঁরা ডিম্বাঘাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে যেমন আছেন বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতারা, ঠিক তেমনই আছেন সারা পৃথিবীকে মাতিয়ে রাখা খেলোয়াড়, চলচ্চিত্র অভিনেতা থেকে শুরু করে বিনোদন জগতের নক্ষত্ররাও। এই তো মাত্র বছর পাঁচেক আগে ডিম নিক্ষেপের এক ঘটনা হইচই ফেলে দিয়েছিল সারা পৃথিবীতে। হলিউডের বিখ্যাত অ্যাকশন নায়ক আর্নল্ড সোয়ার্জেনেগার। কোনান দ্য বারবারিয়ান, পিডেটর, কমান্ডো, দ্য টার্মিনেটরের মতো আইকনিক ছবিতে অভিনয় করে তিনি মাতিয়ে দিয়েছেন সারা পৃথিবীর চলচ্চিত্র প্রেমীদের। তিনি একজন বডি বিল্ডারও বটে। তাঁর খাদ্য তালিকাতেও অবশ্যম্ভাবীভাবে থাকত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ডিম। কিন্তু তাঁকে যে অন্যভাবে ডিম খেতে হবে তা তিনি ধারণা করেননি। হলিউড কাঁপানো অভিনেতা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন সোয়ার্জেনেগার ২০০৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার লং বিচে একটি নির্বাচনি কার্যক্রমের অংশ হিসাবে স্থানীয় ছাত্রদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। সভাস্থানে তিনি যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছেন তখন তাঁর কাধের ওপর উড়ে এসে ফাটল একটা ডিম। কাজটি করেছিল একজন ছাত্র। তার পিছনে কারণ ছিল এ ঘটনার কয়েকদিন আগে এক রাজনৈতিক বিতর্ক সভাতে যোগ দিতে অস্বীকার করেছিলেন হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ। আর সে কারণেই ছাত্রর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর প্রতি ডিম নিক্ষেপের মাধ্যমে।
ডিমের কুসুম স্নাত হবার তালিকায় রয়েছে আরও এক বিশ্বখ্যাত প্রয়াত ব্যক্তির নাম। সোয়ার্জেনেগারের থেকেও তাঁর পরিচিতি সারা বিশ্বে আরও বেশি ছিল বা আছে। সেই ব্যক্তি ফুটবলের রাজপুত্র দিয়েগো মারাদোনা। জীবিত অবস্থায় ফুটবল জগতের এই মহাতারকাকেও দু-দুবার ডিম লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৭ সালে। ডোপিং-এর ব্যান কাটিয়ে মারাদোনা ফিরে এসেছিলেন বোকা জুনিয়র্স ক্লাবে। ইতিপূর্বে তিনি বেশ কয়েকবার উক্ত ক্লাব ছেড়ে চলে যান আবার ফিরেও আসেন। তাঁর এই বারবার ক্লাব ছেড়ে চলে যাওয়া আর ফিরে আসা মেনে নিতে পারেননি ক্লাব সমর্থকরা। তাই তিনি প্র্যাকটিসের জন্য মাঠে নামলে গ্যালারি থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় পচা ডিমের বৃষ্টি। আর মারাদোনাকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয়বার ডিম নিক্ষেপের ঘটনাটি ঘটে ২০০২ ফুটবল বিশ্বকাপের আগে। এক সাংবাদিকের কাছে তিনি মন্তব্য করেছিলেন— আর্জেন্তিনা বিশ্বকাপে যে দল পাঠাচ্ছে তার খেলোয়াড়দের পারফরমেন্স খারাপ। তাঁর এই মন্তব্যের জন্য একদল আর্জেন্তেনীয় ফুটবলপ্রেমী মারাদোনার ওপর ডিম নিক্ষেপ করে। যারা ডিম নিক্ষেপ করেছিল তাদের মধ্যে মারাদোনা ভক্তরাও ছিল। তবে তারা জাতীয় দলের মনোবল ভেঙে যেতে পারে এমন কোনো বক্তব্য ফুটবলের রাজপুত্র বা যুবরাজের থেকে প্রত্যাশা করেনি। এ ঘটনার পর অবশ্য মারাদোনা সহাস্যে সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন— ‘আমার ওপর ডিম ছোড়া দেখে বুঝতে পারি আমার ফ্যানেদের কাছে আমি এখনও কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’
শুধু রাগে নয়, ভালোবাসার ব্যক্তি বা দলের প্রতি কোনো কারণে ব্যথিত বা অভিমানেও ডিম্বাঘাত করে মানুষ। যাতে যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের প্রতি ডিম নিক্ষেপ করা হচ্ছে তিনি আহত না হন আবার প্রতিবাদও জানানো যায়। যেমন জন লেননের পৃথিবী বিখ্যাত গানের দল, যারা বিশ্বের সংগীত ঘরানাকে এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছিল, যাদের পারফরমেন্স দেখে অনেকে আবেগমথিত হয়ে, ভালোবাসায় সত্যিই অজ্ঞান হয়ে যেত, সেই পৃথিবী খ্যাত বিটলস কেও লাইভ শো চলাকালে কয়েকবার ডিম্বাঘাতের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। আর সেই ডিম ছোড়ার কাজটা করেছিল ‘দ্য বিটলস’ অন্তপ্রাণ সমর্থকরাই। কারণ, বিটলস দলের একটি গানের লিরিক্স পছন্দ হয়নি দর্শক সমর্থকদের। বিটলস দল অবশ্য তাদের ভালোবাসায় ফ্যানেদের অভিমানের কারণ বুঝতে পারে ষাটের দশকের সেই ডিম নিক্ষেপের ঘটনাতে এবং তাদের গান থেকে সেই লিরিক্সটি তুলে নেয়। সোয়ার্জেনেগার, মারাদোনা বা বিটলস এ঩দের ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনাকে এক অর্থে ভালোবাসা মিশ্রিত অভিমানের প্রকাশ বলা যেতে পারে। ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষের ব্যাপারটা এসব ক্ষেত্রে তেমন একটা ছিল না বলেই মনে হয়। কারণ উল্লেখিত তিন ব্যক্তি লেনন, মারাদোনা ও সোয়ের্জেনেগার ঘটনাগুলিকে কেউ মজার ছলে গ্রহণ করেছিলেন, কেউ বা ডিম নিক্ষেপকারীর অভিমানকে যুক্তিসঙ্গত বলে মেনে নিয়েছিলেন।
কিন্তু ডিম্বাঘাত প্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সমাজের অন্য ব্যক্তিদের তুলনায় এগিয়ে আছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। আর তাঁদের দিকে ডিম নিক্ষেপ করার পিছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যে ব্যাপারটা কাজ করে তা হল তাদের ক্ষেত্রে ডিম নিক্ষেপকারীদের মনের মধ্যে জমে থাকা ঘৃণা বা সামাজিকভাবে তাঁকে অপদস্থ করে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা। প্রাচীন রোম বা গ্রিস, অধুনা ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আমাদের দেশ। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর ডিম নিক্ষেপের পিছনে এ ভাবনাই কাজ করে এসেছে। আর এ তালিকা এত দীর্ঘ যে তা নিয়ে কয়েক খণ্ড বই অবশ্যই রচনা করা সম্ভব।
আধুনিক পৃথিবীতে এ ধরনের কয়েকটা ঘটনার কথা বলি। এক্ষেত্রে অবশ্য আমাদের দেশের তুলনায় আজও এগিয়ে আছে ইউরোপ-আমেরিকা। ১৯০৮ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডান্ডি শহরে ‘ফ্রি ট্রেড পলিস্টি’র সমর্থনে বক্তৃতা দিতে গেছিলেন। সেই সময় তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা তাঁকে পচা ডিম আর টম্যাটো ছুড়ে মারে। দক্ষ রাজনীতিবিদ চার্চিল অবশ্য সুকৌশলে সামাল দেন। রুমাল দিয়ে গায়ের ডিমের কুসুম মুঝতে মুছতে তাঁর রাজনৈতিক বক্তৃতা চালিয়ে যান ও সমাপ্ত করেন। যাতে তাঁর প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল তাঁকে জনগণের সামনে দুর্বল প্রতিপন্ন না করতে পারে সে জন্য।
দ্বিতীয় ঘটনাটিও ওই ইংল্যান্ডেরই। ডিম নিক্ষেপ সেখানকার পলিটিক্যাল ট্র্যাডিশনে রূপান্তরিত। ১৯৮০-র দশকে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, আয়রন লেডি বলে পরিচিত মার্গারেট থ্যাচারের ওপর একদল খনি শ্রমিক ডিম নিক্ষেপ করেছিল তাদের বেতন বন্ধ হয়ে যাবার ক্ষোভে।
নিজেদের বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী রাষ্ট্র বলে দাবি করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই বা এ ব্যাপারে পিছিয়ে থাকবে কেন? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ২০০৫ সালে কানাডা সফরের সময় ইরাক যুদ্ধ সম্পর্কিত বক্তৃতা করা অবস্থায় ডিম্বাঘাতে আক্রান্ত হন। তিনিও চার্চিলের মতনই ঘটনার গুরুত্ব লঘু করার জন্য বলেছিলেন— ‘এটা হল গণতন্ত্র।’
তৃতীয় যে ঘটনার কথা বলব, সম্ভবত এই একটা ঘটনার ক্ষেত্রে যাঁর ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছিল তিনি নন, যারা ডিম নিক্ষেপ করেছিল তারাই নিন্দিত হয়েছিল সারা পৃথিবীতে। যাঁর ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছিল তিনি হলেন বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের প্রবাদপ্রতীম নেতা, সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র নেলসন ম্যান্ডেলা। ১৯৯০ সালে বর্ণবৈষম্যবাদ বিরোধী এক র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করার সময় কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ তাঁকে ডিম ছুড়ে মারে।
সংখ্যায় ঘটনার সংখ্যা কম হলেও আমাদের দেশের সাবেক বা বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান বা রাজনীতিবিদরাও ডিম্বাঘাত থেকে মুক্ত হতে পারেননি। সেই নামের তালিকা দিলে আমারও ডিম্বস্নাত হবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একটা ঘটনার কথা বলি, আক্রান্ত ব্যক্তির ‘সেন্স অব হিউমারের জন্য। তিনি হলেন একদা বিহারের মুখ্যমন্ত্রী, প্রাক্তন রেলমন্ত্রী আরজেডি সুপ্রিমো লালুপ্রসাদ যাদব। যিনি তাঁর হাস্যরসাত্মক মন্তব্যর জন্য বিখ্যাত। ২০০৪ সালে তিনি রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন ও ভারতীয় রেলের আয় বৃদ্ধির জন্য রেল ভাড়া বৃদ্ধি করেন। ওই বছরই পাটনা শহরে তিনি রেল ভাড়া বৃদ্ধির কারণে পাটনাতে ডিম্বস্নাত হন। বলা হয়ে থাকে তাঁর নিজ দলের সমর্থকরাই নাকি এ কাণ্ড ঘটিয়ে ছিল। যাইহোক এ ঘটনার পর লালুপ্রসাদ তাঁর স্বভাব সুলভ ঢং-এ মন্তব্য করেছিলেন— ‘ভালোই হয়েছে। কারণ, ডিমের মধ্যে প্রোটিন আছে।’
এবার আসি একটি কূট প্রসঙ্গে। ডিম্বাঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সবাই জন লেনন বা মারাদোনা হন না। আর অনেক সময় ডিম্বাঘাতের ফলে শরীরে তেমন আঘাত লাগে না ঠিকই তবে সেই ব্যক্তি মানসিক আঘাত প্রাপ্ত হন তাঁর সামাজিক সম্মানহানির কারণে। ডিম ছোড়া কি আইন সিদ্ধ প্রতিবাদ? এ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম আমার পরিচিত আইনজীবীর কাছে। তিনি যা জানালেন মোটামুটি তা হল সাবেক ইন্ডিয়ান পেনাল কোড বা বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় ডিম নিক্ষেপ সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট ধারার কথা উল্লেখ না থাকলেও আদালত যদি মনে করেন ডিম নিক্ষেপের ফলে সরকারি কাজে বাধা দান হয়েছে অথবা আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক আঘাত লেগেছে বা তাঁর সামাজিক সম্মানহানি হয়েছে তবে সংশ্লিষ্ট ধারা অনুসারে যে ব্যক্তি ডিম নিক্ষেপ করেছে আদালত তাঁর শাস্তি বিধান করতে পারেন। যাতে জরিমানা বা জেল দুটোই হতে পারে। এই শাস্তির ব্যাপারটা আদালতের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তির ওপর ডিম ছোড়া হল সে ব্যক্তি ঘটনাটিকে তুখোড় রাজনীতিবিদদের মতো হেসে উড়িয়ে দেবেন কি না, ঘটনাটিকে ‘গণতন্ত্রর অংশ’ বলবেন নাকি নিজের মর্যাদাহানি বলবেন—এ ব্যাপারটাও একান্তই সেই ব্যক্তির ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। ইংরেজিতে একটা কথা আছে ‘কগনিটিভ রিস্ট্রাকচারিং।’ মনোবিজ্ঞানে এ পদ্ধতিতে বিরুদ্ধ মত বা সমালোচনা বা ঘটনাকে নিজের সপক্ষে ব্যবহার করা হয়। এই ব্যাপারটা যদি কারও জানা থাকে তবে ডিম্বাক্রান্ত হবার পর কেউ বলতেই পারেন, ‘দেখুন আমি কতটা প্রাসঙ্গিক!’ নিজেকে তিনি সোয়ের্জেনেগার কিংবা মারাদোনাও ভাবতে পারেন।
এ লেখা লিখতে লিখতে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন মাথায় এল। কেউ ডিম ছোড়ে, কেউ ডিমের আঘাত প্রাপ্ত হয়, কিন্তু যাদের ডিম নিয়ে এত কাণ্ড ঘটে তাদের অর্থাৎ সেই হাঁস-মুরগিদের এ প্রসঙ্গে বক্তব্য কী? কত অদ্ভুত ব্যাপার নিয়েই তো আজকাল আদালতের দ্বারস্থ হয় মানুষ। সে খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই অবলা পক্ষীকুলের বক্তব্য কেউ কোনোদিন আদালতের সামনে তুলে ধরবেন কি? কলকাতা ও শহরতলির কোথাও কোথাও ডিমের দাম হঠাৎই নাকি বেড়ে গেছে বলে শুনছি।
তথ্যসূত্র: সংবাদমাধ্যম ও অন্তর্জাল।

Advertisement

গ্রাফিক্স : সুদীপ্ত রায়চৌধুরি ও সোমনাথ পাল
সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ