তন্ময় মল্লিক: ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’— এই অমোঘ সত্যটা কাব্যের ছন্দে আমাদের মনে গেঁথে দিয়ে গিয়েছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এটা শুধু মানবজীবনেই নয়, সর্বত্র প্রযোজ্য। প্রতিহিংসার রাজনীতির ক্ষেত্রেও। দু’বছর আগে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি শস্য থেকে তুষ আলাদা করে কাজ শুরুর পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখনই স্পষ্ট হয়েছিল, মনরেগা নিয়ে বিজেপির প্রতিহিংসার রাজনীতির ‘এক্সপায়ারি ডেট’ অতিক্রান্ত। কিন্তু বাংলাকে শায়েস্তার নেশায় বুঁদ বিজেপি নেতৃত্ব সেটা ভুলে গিয়েছে। তাই এবার আর পরামর্শ নয়, সরাসরি নির্দেশ। ১ আগস্ট থেকেই বাংলায় শুরু করতে হবে ১০০ দিনের কাজ। আদালতের ঘাড়ধাক্কায় বিজেপির সংবিত ফিরবে, এমনটাই কাম্য। এরপরেও যদি দিল্লির সরকার কাজ শুরু না করে? বলতে বাধা নেই, ভেন্টিলেশনে থাকা বঙ্গ বিজেপির কোমায় যাওয়া সময়ের অপেক্ষামাত্র।
একুশের ভোটে বিজেপি গোহারা হওয়ার পর বাংলায় ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। অভিযোগ, বাংলায় মনরেগা প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে। অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ১৫টি জেলায় ঘুরেছে কেন্দ্রীয় টিম। পাশাপাশি রাজ্যের টিমও বিভিন্ন জেলায় গিয়ে দুর্নীতির সুলুকসন্ধান করেছে। সব মিলিয়ে অনিয়ম ধরা পড়েছে ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকার। এই ঘটনায় অভিযুক্ত পঞ্চায়েত প্রধান থেকে দপ্তরের অনেক কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। আদায় হয়েছে আত্মসাতের টাকা। তার পরিমাণ ২ কোটি ৪০ লক্ষ।
গোটা দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাতেই বন্ধ রয়েছে ১০০ দিনের কাজ। তাতে মনে হতে পারে, এই প্রকল্পে দুর্নীতি কেবল বাংলাতেই হয়েছে। কিন্তু বাস্তবটা হল, বাংলার চেয়েও অনেক বেশি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বিজেপি শাসিত বেশকিছু রাজ্যে। কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্ট বলছে, তামিলনাড়ুতে ৬০ কোটি ৭৭ লক্ষ, উত্তরপ্রদেশে ৪৮ কোটি ৮৮ লক্ষ, মহারাষ্ট্রে ১৫ কোটি ২ লক্ষ ও বিহারে ১৭ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকা এই প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে। আর গুজরাতের কথা না বলাই ভালো। ৭১ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে গুজরাতের এক মন্ত্রীর দুই পুত্র। তাও কোনও রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ বন্ধ হয়নি। এই তথ্য বাংলার দুর্নীতিকে লঘু করে দেখানোর উদ্দেশ্যে নয়। কিন্তু তুলনা টানলে বোঝা যায়, প্রতিহিংসার রাজনীতির অভিযোগের বাস্তবতা আছে, নাকি সবটাই মিথ্যে।
গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ টাকা আত্মসাৎ করা চরম অন্যায় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দোষীদের কঠিন শাস্তিই প্রাপ্য। কিন্তু তারজন্য গোটা প্রকল্পটা বন্ধ করে দেওয়া কি ঠিক? উত্তরে বিজেপি নেতারা কটাক্ষ ছুড়ে দিয়ে বলতেন, রাজ্যের প্রতি অবিচার হলে আদালতে যাচ্ছে না কেন? রাজ্য সরকার ও রাজ্যের শাসক দল প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে গিয়েছে। তবে, বিহিত চাইতে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল খেতমজুর সমিতি। ২০২৩ সালে অনুরাধা তলোয়ারদের করা মামলার শুনানির সময় হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম বলেছিলেন, ‘যদি দুর্নীতি হয়ে থাকে, পদক্ষেপ নিন। শস্য থেকে তুষ ঝেড়ে ফেলুন। টাকা আটকে রেখে এভাবে যোগ্যদের বঞ্চিত করা যায় না।’
অনেকে বলছেন, তখন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তারা বঙ্গ বিজেপির কথায় না নেচে হাইকোর্টের পরামর্শ শুনলে আজকের এই দিনটা তাঁদের দেখতে হতো না। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ যে নির্দেশ দিয়েছে তা মোদি সরকারের মাথা হেঁট হওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিচারপতিরা ১ আগস্ট থেকে বাংলায় ১০০ দিনের কাজ শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি এও জানিয়ে দিয়েছেন, ‘মহাত্মা গান্ধী জাতীয় কর্মনিশ্চয়তা আইনে কোথাও বলা নেই, অনিয়ম হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকবে।’
এই কথার অর্থ, বাংলায় ১০০ দিনের কাজ তিন বছর বন্ধ রাখাটা ‘বেআইনি’। এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি হল, যাঁরা গরিব মানুষের কাজ বছরের পর বছর বেআইনিভাবে বন্ধ করে রাখলেন, তাঁদের কি কোনও শাস্তিই হবে না? কেন তিন বছরের টাকা জবকার্ডধারীদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি দেওয়া হবে না? এই প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যেত যদি কাজ দিতে না পারলে সুদ সহ মজুরি দেওয়ার নিদান আইনে না থাকত। কাজের গ্যারেন্টি আছে বলেই এই প্রকল্পের সঙ্গে ‘কর্মনিশ্চয়তা’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।
দুর্নীতি যারা করেছে তারা শাস্তি পাক। কিন্তু গরিব মানুষের স্বার্থে কাজটা চালু হোক। এই দাবিতে রাজ্যজুড়ে আন্দোলন হয়েছে। শুধু তৃণমূল নয়, বামেরাও একই দাবি জানিয়েছে। কিন্তু তাকে মোদি সরকার পাত্তা দেয়নি। উল্টে নানা অজুহাতে অন্য প্রকল্পের টাকা আটকে দিয়েছে। বিজেপির প্রতিহিংসার রাজনীতির জন্য বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, মনরেগার কাজ বন্ধ থাকায় তিন বছর দু’মাসে ১০০ কোটি ৩০ লক্ষ শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে। টাকার অঙ্কে তা ৩৭ হাজার ৯৯৭ কোটি।
২০২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি কেন্দ্রীয় সরকারকে ১০০ দিনের কাজ চালুর পরামর্শ দিয়েছিলেন। এবার কিন্তু নির্দেশ। তবে আদালতের রায় কেন্দ্রীয় সরকার মানবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে ধন্দ। কেন্দ্রীয় সরকার রায় মানতে পারে, নাও পারে। আবার উদাসীন থেকে রাজ্য সরকারকে আদালত অবমাননার মামলা করার পথে ঠেলে দিতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ যাই হোক না কেন, এই রায় বিজেপির কাছে ‘শাঁখের করাত’। নির্দেশ মানলে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার রাজনীতির যে অভিযোগ উঠছিল তা সত্যি বলে রাজ্যের শাসক দল প্রচার করবে। তাতে মুখ পুড়বে বিজেপির। আবার রায় না মানলেও বিপদ। বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। বিজেপির গায়ে পাকাপাকিভাবে লেগে যাবে গরিব বিরোধী তকমা। তাতে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে খেটেখাওয়া সিংহভাগ মানুষই বিজেপি বিরোধী হয়ে যাবে।
এটা অনুমান নয়, বাস্তব। নদীয়ার ধানতলার সাগর বিশ্বাসের কথা তুলে ধরলে হয়তো একটা ধারণা হবে। ১০০ দিনের কাজ চালুর দাবিতে দিল্লি অভিযানের সময় খেতমজুর সাগরবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি সক্রিয় বিজেপি কর্মী। বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপির হয়েই খেটেছিলেন। ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পে রাজ্যকে টাকা না দেওয়ার প্রতিবাদে তৃণমূলের মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন সেই সাগরবাবু। তাঁর কথায়, ‘গরিবের পেটে লাথি মারছে বিজেপি। এর প্রতিবাদ করা দরকার। এখন বুঝতে পারছি, বিজেপির জন্য লড়াই করে খুব ভুল করেছি। ভুল শুধরে নিতে চাই। তাই খাটুনির টাকা আদায়ের জন্য তৃণমূলের মিছিলে গিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়েছি।’
এভাবেই প্রতিহিংসার রাজনীতির খেসারত দিচ্ছে বিজেপি। তারজন্যই একুশের পর এ রাজ্যে যতগুলি উপনির্বাচন হয়েছে প্রতিটিতে বিজেপি হেরেছে। সদ্যসমাপ্ত নদীয়ার কালীগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচন ছিল ভোট মেরুকরণের অ্যাসিড টেস্ট। একে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা, তার উপর বিজেপির নতুন স্লোগান, হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই। ভোট মেরুকরণের আদর্শ পটভূমিতেই হয়েছিল কালীগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচন।
বিজেপি ভেবেছিল, সংখ্যালঘু ভোটে থাবা বসাবে বাম-কংগ্রেস জোট। ‘হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই’ স্লোগানে ধস নামবে তৃণমূলের হিন্দুভোটে। সেই সুযোগে শিকেটা ছিঁড়বে বেড়ালের ভাগ্যেই। কিন্তু হল না। উল্টে বিজেপি এবং বাম-কংগ্রেস জোটের ভোট কমল। বাড়ল তৃণমূলের ভোট। তাতে বাংলা ফের বার্তা দিল, ধর্ম নিয়ে মাতামাতি রাজনীতির কারবারিরা করলেও খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে জীবন-জীবিকাই গুরুত্বপূর্ণ।
আর সেই কাজ বন্ধ করে গরিবের পেটে লাথি মেরে বাংলাকে ‘শিক্ষা’ দিতে চেয়েছে বিজেপি। তাতে এ রাজ্যের প্রচুর ক্ষতি হলেও লাভবান হয়েছে ‘আচ্ছে দিনের’ স্লোগান শুনিয়ে ক্ষমতায় আসা মোদি সরকার। বাংলার গরিব, খেটেখাওয়া মানুষকে বঞ্চিত করা টাকায় ফুলেফেঁপে উঠেছে কেন্দ্রীয় সরকারের কোষাগার। সেই কাজে মদত দিয়েছেন বাংলা থেকে নির্বাচিত বিধায়ক ও সাংসদরা। তবে এসব করেও বাংলাকে জব্দ করা যায়নি। কারণ বাংলায় চালু আছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কর্মশ্রী, বিনা পয়সার রেশন সহ নানা প্রকল্প। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পই বাংলার গরিবগুর্বোর কাছে হয়ে উঠেছে বিজেপির বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ‘সুদর্শন চক্র’। তাই বিজেপির ছোড়া একের পর এক বঞ্চনার মিসাইল ধ্বংস করছে মমতার ‘এস-৪০০’।