নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: একেবারে অজ গাঁ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে গরিবের ঘরবাড়ি। তার মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বিশাল অট্টালিকা। সামনে দাঁড়িয়ে নামিদামি বিদেশি গাড়ি। অথচ, কিছু বছর আগেও এই বাড়ির কর্তার দিন গুজরান হতো দিনমজুরির কাজ করে। আচমকাই তিনি হয়ে ওঠেন যেন ‘রূপকথার নায়ক’। নুন আনতে পান্তা ফুরোনো সংসারে অঢেল প্রাচুর্য। কিন্তু কেন? গ্রামবাসীরা বলছেন, হেরোইনের ব্যবসা। নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ ও পলাশীপাড়া এলাকায় এমন বহু পরিবার হেরোইন কারবার থেকে অঢেল টাকা কামিয়েছে। তাতেই আজ বিলাসবহুল জীবনযাপন তাদের। বৈধ আয়ের উৎস ছাড়াই গড়ে তুলেছে প্রাসাদোপম বাড়ি। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিপুল অঙ্কের টাকা।
এবার সেই বেআইনি সাম্রাজ্য ধ্বংসে তৎপর হয়েছে পুলিস ও গোয়েন্দা দপ্তর। পুলিসের নজর পড়েছে, মাদক মামলায় ইতিমধ্যেই ধরা পড়া একাধিক বিত্তশালী হেরোইন কারবারিদের উপর। শুরু হয়েছে তাদের অবৈধ সম্পত্তি চিহ্নিত করে তা ফ্রিজ করার প্রক্রিয়া। আর সেটা হলে মাদক মামলায় অভিযুক্তরা জামিনে মুক্তি পেলেও অবৈধ আয়ে তৈরি সাম্রাজ্য ভোগ করতে পারবে না।
কৃষ্ণনগর পুলিস জেলার এসপি অমরনাথ কে বলেন, ‘বেশ কিছু মাদক মামলা আমাদের নজরে এসেছে। যেখানে অভিযুক্ত কারবারি ও তাদের পরিবারের আর্থিক লেনদেন ও সম্পত্তির উৎস নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই সেগুলি ফ্রিজ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’
সম্প্রতি কালীগঞ্জ থানার একটি হেরোইন মামলায় ধৃত পেয়ারা চাষি তথা মাদক কারবারি আব্বাস মণ্ডল ও তার পরিবারের প্রায় দু’ কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি ফ্রিজ করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে এক কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন এবং প্রায় ৮০ লক্ষ টাকার জমি। মাদক মামলা থেকে প্রাপ্ত বেআইনি আয় ও সম্পত্তি চিহ্নিত করে তা বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ এক দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, সাতটি মাদক মামলায় ধৃত দশজন হেরোইন কারবারি ও তার পরিবারের অবৈধ সম্পত্তি ফ্রিজ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার মধ্যে কালীগঞ্জ ও পলাশীপাড়ায় থানার তিনটি করে এবং তেহট্ট থানার একটি মাদক মামলা রয়েছে।
গত বছর মার্চ মাস নাগাদ পলাশীপাড়া থানার পুলিস আরিজুল শেখ ও তার ছেলে ইউসুফ শেখ নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তদন্তে তাঁদেরও বিপুল সম্পত্তির হদিশ মিলেছিল। এরম বহু কারবারি তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকায়। অনেক সময় দেখা যায়, কারবারিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে কিংবা তার বাড়ির লোকজন সম্পত্তি বিক্রি করে মাদক ব্যবসা চালাতে থাকে।
পলাশীপাড়া থানার নলদহ এলাকা হেরোইন ব্যবসার আঁতুরঘর। সেই ব্যবসার জাল ছড়িয়েছে কালীগঞ্জ থানার হাট গোবিন্দপুর এলাকাতেও। বিগত দেড় বছরে পুলিসি সক্রিয়তায় ২২টি মাদক মামলায় ৪১ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। বাজেয়াপ্ত হয়েছে ১৬ কেজি ৬৩ গ্রাম হেরোইন এবং ১১৯ কেজি কাঁচামাল। কৃষ্ণনগর পুলিস জেলার অতিরিক্ত পুলিস সুপার (গ্রামীণ) উত্তম ঘোষ বলেন, ‘আদালতে মাদক মামলা যদিও খারিজ হয়, তাহলেও আর্থিক তদন্তের এই মামলা সহজে খারিজ হবে না। অবৈধ সম্পত্তি ফ্রিজ করা হলে তা আর বিক্রি করাও যাবে না।’