


সন্তানকে জীবনের ওঠাপড়ার সঙ্গে তাল মেলাতে দিন। সে নিজেই নিজের জীবনের ভালো মন্দের বিচার করুক। সন্তানকে মানুষ করার সময় কিছু গোল্ডেন রুল মেনে চলতে হয় মা বাবাকে। পরামর্শ দিলেন পেরেন্টিং কনসালটেন্ট শুভশ্রী রায় ভট্টাচার্য।
আমরা সকলেই বয়সের সঙ্গে পরিণত হই। আমাদের চিন্তাভাবনা বদলায়, দৃষ্টিভঙ্গি পালটে যায়। মানসিক পরিণতি, এর সঙ্গেই আসে ব্রেনের ‘হায়ার অর্ডার ফাংশনিং’ বা পরিণতমনষ্ক ভাবনা। আর সেই ভাবনার সঙ্গেই জড়িত রয়েছে আমাদের বুদ্ধির বিকাশ, আচরণের ভারসাম্য ইত্যাদি। এগুলো সবই নির্ভর করে শিশুর লালন পালনের উপর,’ বললেন পেরেন্টিং কনসালটেন্ট শুভশ্রী রায় ভট্টাচার্য। বাচ্চাকে বাস্তব চিন্তায় বড়ো করা নিয়ে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। বললেন, বাচ্চার প্রাথমিক ‘কেয়ার গিভার’ যেহেতু আমাদের সমাজে মা, তাই মায়ের বিশেষ সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাচ্চাকে কীভাবে বড়ো করা হচ্ছে তার উপর শিশুর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর করে।
কয়েকটি নিয়ম
প্রথমত অতিরিক্ত প্রোটেকটিভ হয়ে পড়বেন না। সন্তানকে নিজের মতো বড়ো হতে দিন। তাকে আঘাত পেতে দিন, সেই আঘাত থেকেই সে জীবনের পাঠ পাবে। দ্বিতীয়ত তার প্রতি সহমর্মিতা দেখান। আপনার ব্যবহারে তাকে বুঝিয়ে দিন যে আপনি তার সঙ্গে আছেন। তার সমস্যায় ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন না। তাকেই মোকাবেলা করতে দিন। কিন্তু সে দুঃখ পেলে, ভেঙে পড়লে তার আশ্রয় হয়ে পাশে থাকুন। তৃতীয়ত তার প্রতি অযথা কঠোর হবেন না। আবার অতিরিক্ত নরম হতে গিয়ে তার সঙ্গে বন্ধুর মতোও মিশবেন না। আদরে শাসনে বড়ো করে তুলুন আপনার সন্তানকে।
অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝান
মায়ের উচিত সন্তানকে জ্ঞান না দিয়ে বরং উদাহরণ দিয়ে বোঝানো। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই আমরা সকলেই। সেগুলোকেই উদাহরণের মতো করে সন্তানকে জীবনের পাঠ দেওয়া উচিত। সেই পাঠগুলোই আপনার সন্তানকে বাস্তব চেনাতে শেখাবে।
ক্ষেত্র অনুযায়ী কয়েকটি বাস্তব চিন্তার কথা জানালেন শুভশ্রী।
বন্ধু বরাবর থাকে না। এটা কঠিন সত্য। কিন্তু আপনার সন্তানকে তা বোঝাবেন কীভাবে? আপনার সন্তান শৈশব থেকেই বন্ধু তৈরি করবে। তারা একে অপরের সঙ্গে খেলাধুলো করে, মারপিট করে বড়ো হবে। আপনি দূর থেকে তার প্রতি নজর রাখুন। এরপর ধরুন আপনার সন্তানের সঙ্গে তার কোনো বন্ধুর বিচ্ছেদ হল তখন সে যদি ভেঙে পড়ে, তার পাশে থাকুন। তাকে বোঝান, এটাই জীবন। এখানে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এর মাধ্যমেই এগিয়ে যেতে হবে। দুঃখ পেলে বা ভেঙে পড়লে চলবে না। আর এই যে জীবনের পাঠ আপনি দিলেন, সেটাও নৈর্ব্যক্তিকভাবে দিতে হবে। সন্তানের জীবনে অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়বেন না। বন্ধুত্ব ভেঙে যেতে পারে, বন্ধুর কাছ থেকে আঘাত আসতে পারে, জীবনের চলার পথে বন্ধু তাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে— এইসবই বাস্তব। এর ফলে ভেঙে পড়লে চলবে না। বরং মেনে নিয়ে নিজের মতো করে জীবনটা গড়ে নিতে হবে।
জীবনের গতিপথ সব ক্ষেত্রে সমান হয় না। তাই বলে হার মানলে চলবে না। সুখের দিনে যেমন আনন্দ করেছ, দুঃখও তেমনই সহজভাবে মেনে নিতে হবে। এই পাঠ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জানালেন শুভশ্রী। তাঁর কথায়, ‘জীবন যে ভালোয় মন্দে মেশানো তা সন্তানকে তার শৈশবেই বুঝিয়ে দিতে হবে। ধরুন আপনার সন্তান স্কুলে কোনো প্রতিযোগিতায় প্রথম হল, তার সঙ্গে আনন্দ করুন। আবার একই সঙ্গে তাকে বলে দিন, প্রতিবারই যে প্রতিযোগিতায় সে প্রথম হবে তা নয়, তাই বলে প্রতিযোগিতা থেকে মুখ ফেরালে চলবে না। বরং ফলাফল হাসি মুখে মেনে নিতে হবে। অথবা আপনার সন্তান কোনো জিনিস চেয়ে জেদ করছে। তাকে বলতে হবে, যখন যা চাইবে তখনই তা পাওয়া যায় না, এটাই জীবন। তাই বলে রেগে গেলে বা দুঃখ পেলে চলবে না। বরং না পাওয়াটাকেও হাসি মুখে মেনে নিতে হবে। অনেক মা বাবা সন্তানের খারাপটা নিজেরাই সহ্য করতে পারেন না বলে উলটে তাকেই দোষারোপ করতে থাকেন। সে বোকা, নির্বোধ বলেই তার কিছু হবে না, ইত্যাদি বলেন। এগুলো কিন্তু সন্তানের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
সবাই একরকম হয় না। তাই বলে অন্য ধরনের মানুষের সঙ্গেও মিশতে হবে। সকলের মধ্যেই ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই থাকে। ভালোটাকে নিয়ে খারাপটাকে ফেলে দেওয়া যায় না, এই ধরনের কিছু বাস্তব পাঠও সন্তানকে হাসি মুখে শেখান। তার জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই তাকে এই পাঠ দিন। যেমন ভালো ছাত্রর পাশে বসা, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার পাশাপাশি কম মেধাবী ছাত্রকেও সাহায্য করা উচিত, সেই পাঠ দিন। এছাড়াও আত্মীয়, বন্ধু বা গুরুজনদের ক্ষেত্রেও কেউ একটু নরম প্রকৃতির হয়, কেউ বা কঠোর। তাই বলে নরম জনের সঙ্গে মিশলাম আর কঠোরজনকে এড়িয়ে গেলাম এটা করলে চলবে না। ভিন্ন রুচির লোকেদের সঙ্গে ওঠা বসা করা, তাদের সঙ্গে নিজের জীবন ভাগ করে নেওয়ার পাঠ বাচ্চার বয়ঃসন্ধির সময় থেকেই তাকে দিতে শুরু করুন। সে বুঝুক, এই পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের মানুষ রয়েছে। কাউকে ভালো লাগবে, কাউকে খারাপ। কিন্তু ভালো লোকদের গ্রহণ করে খারাপদের বর্জন করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে ভালোর পাশাপাশি খারাপটাকেও জীবনের অঙ্গ হিসেবেই মেনে নিতে হবে। কিন্তু কার সঙ্গে কেমনভাবে মিশব, সেটা সম্পূর্ণ নিজের বুদ্ধি ও বিবেচনা দিয়ে বিচার করতে হবে।
জীবনের পথে এগতে হলে মানুষ চেনা জরুরি। এই পাঠ অবশ্য সন্তানের একটা বয়সের আগে তাকে দেওয়া সম্ভব নয়। তার কারণ মানসিক পরিণতির একটা স্তরে না পৌঁছলে মানুষ চেনার পাঠ কেবলই শুকনো জ্ঞান বই তো নয়। ফলে মানুষের ভালো বা মন্দ বিচার সন্তানকে নিজেকেই করতে হবে। সে ঠেকে শিখবে, এড়িয়ে যাবে, অথবা কখনো একটু ভেঙেও পড়বে হয়তো। সেক্ষেত্রে তার পাশে থাকুন। কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব গড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ হস্তক্ষেপ করবেন না। জীবন তাকে সর্বক্ষণই বিভিন্ন পাঠ দিতে দিতে বড়ো করবে। সেই পাঠগুলো যাতে আপনার সন্তান চোখ কান খোলা রেখে নিতে পারে সে দিকে খেয়াল রাখুন। নিজে থেকে তার জীবনের পাঠগুলো তাকে শিখিয়ে দেবেন না।
আত্মনির্ভর করুন
আজকাল অনেক পরিবারেই একমাত্র সন্তানকে শুধু মা নন, ঠাকুরমা, দিদিমাও অতিরিক্ত আদরে মানুষ করেন। তাকে বড়োই হতে দেন না। দেখা যায় বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও বাড়ির গুরুজনরা তাকে বাচ্চাই ভাবতে থাকেন। জীবনের ছোটোখাটো ঝড়-ঝামেলার আঁচ যাতে সন্তানের গায়ে না লাগে সে বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে পড়েন তাঁরা। ফলে বাচ্চা পরিণতমনস্ক হতে পারে না। বাড়ির বড়োরা বোঝেন না, এতে কিন্তু সন্তানের ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি। কারণ বাস্তবটা না চিনে একটা অলীক দুনিয়ায়, মা-ঠাকুরমার স্নেহের জালে বড়ো হতে হতে হঠাৎ কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে টাল সামলাতে পারে না সে। আর তখনই মানসিক বিপর্যয় ধেয়ে আসে তার দিকে। তার চয়ে বরং ছোটো থেকেই বাচ্চাকে জীবনের কঠিন দিকগুলোর
সঙ্গে পরিচিত হতে দিন। আপনি পিছনে তার ভরসা হয়ে থাকুন, ঢাল হয়ে তাকে আগলে রাখবেন না।
কমলিনী চক্রবর্তী