Bartaman Logo
২০ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বাস্থ্যে বদল এখনও অধরা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সুমনা সরকারের হাসপাতাল পরিদর্শনে ধরা পড়ল অব্যবস্থা। স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন এখনও অধরা। বিস্তারিত পড়ুন।

স্বাস্থ্যে বদল এখনও অধরা
  • ২০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বাস্থ্যদপ্তরকে এখনো তাড়া করে ফিরছে একটি ঘটনা। সেটি আর জি কর। নিজের হাসপাতালের ভিতরে ধর্ষণের শিকার, এমনকি খুন পর্যন্ত হয়েছিলেন এক ডাক্তারি পড়ুয়া তরুণী। ওই মর্মান্তিক ঘটনার (৯ আগস্ট, ২০২৪) দু-বছর পূর্তি আসন্ন। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে পূর্বতন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অন্যতম বড়ো ইস্যু ছিল এই কাণ্ড। মৃত তরুণীর মাকে পানিহাটি কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। ভোটপ্রচারে মোদি-শাহরা এই ঘটনার পুরো দায় চাপিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর। তাঁদের অভিযোগ ছিল, মা-মাটি-মানুষের জমানায় সবচেয়ে বঞ্চিত-বিপন্ন মা (পড়ুন, নারী) ও মানুষ! কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষকর্তারা এই দাবিও করেছিলেন যে, তাঁরা সরকার গড়তে পারলে বাংলায় নারীসহ সমস্ত মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে। এবারের ভোটে বিজেপি জিতেছে। বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ‘অভয়া’র মা। মোদি-শাহের পার্টি সরকারেরও আসীন এখন। কিন্তু তাঁদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার কী হল? এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না—গাঝাড়া দিতে উঠতেই হচ্ছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার বাহাদুরকে।

Advertisement

ডাক্তারি পড়ুয়া সেজে হঠাৎ কল্যাণীর হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার। তাঁর গত ১৬ তারিখের এই অভিযানে যথারীতি ধরা পড়েছে হাসপাতালের অস্বাস্থ্যকর চিত্র। অর্থাৎ শুভেন্দু অধিকারীর জমানায়ও বদল অধরা! হাসপাতালে অব্যবস্থার বিবিধ অভিযোগ পাচ্ছিলেন মন্ত্রী। সমাধানের রাস্তা খুঁজতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেই আলোচনা করেন তিনি। ব্যবস্থাগ্রহণের আগে তিনি নিজে ওই হাসপাতালে ‘সারপ্রাইজ ভিজিটে’ যেতে চান। তাঁর এই ইচ্ছার কথা মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় অনুমতিও নিয়ে নেন সুমনা। বুধবার গভীর রাতে মুখে সার্জিকাল মাস্ক পরে জেএনএম হাসপাতালে পৌঁছে যান তিনি। মাস্কের আড়ালের মানুষটিকে প্রথমে কেউই চিনতে পারেননি। সেই সুযোগে হাসপাতাল চত্বরের নানা বিষয়ে নজর করেন মন্ত্রী। তাঁর পরিচয় অবশ্য বেশিক্ষণ গোপন ছিল না। মন্ত্রীকে চিনতে পেরেই ডাক্তার, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা সতর্ক হয়ে যান। মন্ত্রী দেখেন যে, তখন জরুরি বিভাগে কোনো সিনিয়র ডাক্তার নেই! তাঁর নজরে আসে আরও একাধিক অব্যবস্থা। রোগীর পরিবার থেকে অভিযোগ শোনেন। সেসব নিয়ে মন্ত্রী কথা বলেন উপস্থিত জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে। ইমার্জেন্সির পর হাসপাতালের আরও একাধিক ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন তিনি। বিভিন্ন স্থানের অপরিচ্ছন্নতা এবং যত্রতত্র কুকুর-বিড়াল ঘুরে বেড়ানো দেখে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কর্তৃপক্ষের জবাবও তলব করেছেন সুমনা সরকার। মন্ত্রী আগেই অভিযোগ পেয়েছিলেন অধিকাংশ রাতে ১০টার পর কোনো সিনিয়র ডাক্তার থাকেন না। বেশি রাতে চিকিৎসকের সব কাজ করেন জুনিয়ররাই। এই অভিযোগের সত্যাসত্য যাচাই করতে এসেই নানা অব্যবস্থা তাঁর নজরে পড়ে। ক্ষুব্ধ মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিটি জায়গায় নোংরা। এমন কোনো বিভাগ নেই, যা নোংরা নয়। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ব্যাপার। হাসপাতালের দুর্দশা দেখে খারাপই লাগছে। বলেছেন, সমস্যাগুলি স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কে তিনি জানাবেন। এমনকি মুখ্যমন্ত্রীরও গোচরে আনবেন এসব। হস্টেলগুলি নিয়েও অভিযোগ পেয়েছিলেন সুমনা। হস্টেল দেখে মন্ত্রী রীতিমতো বিমর্ষ। কোনো নিরাপত্তারক্ষী নেই। বস্তুত ‘পুরো ওপেন টু অল’! 
মন্ত্রী এও জানান, ভিতরে গিয়ে পড়ুয়াদের সতর্কও করে আসেন তিনি। তাঁর কথায় ধরা পড়ে, আর একটি আর জি কাণ্ড রাজ্যবাসী দেখতে চায় না। এদিকে, নজরে এসেছে—চূড়ান্ত অপরিচ্ছন্ন খোদ আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ইনডোর থেকে হস্টেল, আউটডোর থেকে ট্রমা সেন্টার—হাসপাতালের সর্বত্র অপরিচ্ছন্ন। আর জি কর সাফাইয়ের জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সুমনার অভিযোগ, পূর্বতন সরকারের মদতেই হস্টেলগুলিতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কিছু অভিযোগ তোলা কিংবা হুমকি হুংকার ছাড়াই যথেষ্ট নয়। সমস্যাগুলি যথেষ্ট পুরানো। অর্থাৎ সেগুলি ইতিমধ্যেই চিহ্নিত হয়ে আছে। তাই ব্যবস্থাগ্রহণে বিলম্ব হলে নতুন সরকারের সদিচ্ছাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। মনে হবে যে, সবটাই লোক দেখানো কারবার। হস্টেলসহ হাসপাতালের সর্বত্র প্রতিটি প্রবেশ, প্রস্থানের রেকর্ড রাখা জরুরি। সেটি এখনই নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো পড়ুয়া বা বহিরাগত ব্যক্তির অস্বাভাবিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া চাই। বিশেষ করে দালালরাজ নির্মূল হওয়াটা রাজ্যবাসীর কয়েকদশকের চাহিদা। কারণ হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, বিনামূল্যের পরিষেবা যে গরিব মানুষের কাছে ঠিকমতো পৌঁছায় না তার বড়ো বাধা দালালরাজ। রোগী থেকে পড়ুয়া, ডাক্তার, নার্স, অন্য স্বাস্থ্যকর্মী প্রভৃতি সকলের সর্বক্ষণের নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। কর্মক্ষেত্র কর্মীদের কাছেই নিরাপদ না-হলে তাঁরা সেরা পারফর্ম্যান্স মেলে ধরবেন কোন জাদুতে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ