Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

দুই মুসলিমকে বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছিলেন, আজও সম্প্রীতির কথা শোনায় নফর কুণ্ডুর স্মৃতিস্তম্ভ

বিভেদ, বিভাজন এখানে এসে থমকে দাঁড়ায়। ধর্ম দেখে খুন করার মতো অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই জায়গায় এলে কিছুটা হয়ত মুখরক্ষা হল।

দুই মুসলিমকে বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছিলেন, আজও সম্প্রীতির কথা শোনায় নফর কুণ্ডুর স্মৃতিস্তম্ভ
  • ১৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বিভেদ, বিভাজন এখানে এসে থমকে দাঁড়ায়। ধর্ম দেখে খুন করার মতো অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই জায়গায় এলে কিছুটা হয়ত মুখরক্ষা হল। দক্ষিণ কলকাতার চক্রবেড়িয়া রোডের উপর দাঁড়িয়ে শতাব্দী প্রাচীন একটি ফলক। সাদা পাথরের উপর বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা, ‘ম্যানহোলে পড়ে গিয়েছিলেন দুই মুসলমান কুলি (শ্রমজীবী)। তাঁদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন নফর কুণ্ডু।’ সেই নফরের স্মৃতিতেই বসানো হয়েছিল ফলকটি। লেখা রয়েছে, ‘নফর কুণ্ডু এন্টালি রামকৃষ্ণ মিশনের সদস্য।’ 

Advertisement

তখন নফরের ২৬ বছর বয়স। ১৯০৭ সালের ১২ মে চক্রবেড়িয়া রোড ধরে হেঁটে আসছিলেন। রোদ ভরা দুপুর। কানে আচমকা চিত্কারের শব্দ ভেসে আসে। তা লক্ষ্য করে ছুট দেন। তিনি ছোট থেকে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শে দীক্ষিত। অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া অভ্যাস। ‘কী হয়েছে, কী হয়েছে?’ বলতে বলতে জটলার মধ্যে ঢুকে পড়েন। জানা যায়, দু’জন কুলি ম্যানহোলের ভিতর পড়ে গিয়েছিলেন। এখনও আটকে। আগুপিছু কিছু ভাবলেন না নফর। ম্যানহোলে নামতে শুরু করলেন। জটলা থেকে সাবধান করলেন অনেকে। ম্যানহোলের ভিতরে ঢুকলে মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কার কথাও ভেসে এল। নফর শুনলেন না। মৃত্যুপথযাত্রী দু’জন মানুষকে বাঁচাতেই হবে। ঝাঁপালেন ম্যানহোলে। অসীমসাহস দেখিয়ে প্রাণও বাঁচালেন দুই কুলির। তবে নিজে বাঁচতে পারলেন না। জলে-কাদায় টানা যুদ্ধ চালিয়ে প্রাণ হারালেন। দুই মুসলমান কুলির প্রাণ বাঁচাতে জীবন দিলেন রামকৃষ্ণ মিশনের সদস্য নফর। অনেক পরে তাঁর নিথর দেহটি বের করে আনা হয়। তারপর শেষকৃত্য। নফরের নশ্বর দেহ বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু নফর গেলেন থেকে। দুই মৃতপ্রায় মুসলমান কুলির কৃতজ্ঞতায়, সাধারণ মানুষের মনে বেঁচে রইলেন। তিনি এখনও বেঁচে... মানুষের মনে, ফলকের বয়ানে।
সেই ১৯০৭ সালে আধা গ্রাম কলকাতায় নফরের জন্য ক্রাউড ফান্ডিং হয়। তাঁর বীরগাথা খোদাই করতে ভারতীয়, ইউরোপীয় এবং স্থানীয় মানুষ টাকা দিয়ে মনুমেন্ট তৈরি করেন চক্রবেড়িয়া রোডে। সে স্মৃতিসৌধ এখনও চোখে পড়বে। নফর জন্মেছিলেন ১৮৮১ সালের ২২ মার্চ। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শ আত্মস্থ করেছিলেন। এবং নিজে জীবন দিয়ে তা প্রয়োগ করে গেলেন। ফলকে ইংরেজিতে লেখা, ‘নফরের জীবনের ব্রত ছিল জাতি নির্বিশেষে মানুষের ভালো করা।’ স্মৃতিস্তম্ভটি স্থানীয় একটি ক্লাবের উঠোনে বিভেদ, বিভাজনের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মনুমেন্টটি হেরিটেজ তকমাও পেয়েছে। তবে এখন কোথাও নফরের কোনও ছবি পাওয়া যায় না। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ