বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ১০ বছরে বাঙালির গড় আয়ু বেড়েছে ২.৬ বছর অর্থাৎ আড়াই বছরের বেশি। দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। সেখানে দেখা যাচ্ছে, দেশের সার্বিক গড় আয়ুর তুলনায় এগিয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গ। ২০২৩ সাল শেষে দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৭০.৩ বছর। সেখানে বাঙালির গড় আয়ু পৌঁছেছে ৭২.৫ বছরে।
জীবনযাত্রা, বংশানুক্রমিক ইতিহাস সহ নানা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ের উপর যেমন সাধারণ মানুষের আয়ু নির্ভর করে, তেমনই তা অনেকটাই নির্ভরশীল আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উপর। গোটা দেশের বাস্তব আর্থসামাজিক পরিস্থিতি কী, তার উপর দেশের আর্থিক নীতি নির্ধারণের বিষয়টিও অনেকটা নির্ভর করে। তারই হিসেব কষতে দেশের মানুষের বিগত বেশ কয়েক বছরের গড় আয়ুর পরিসংখ্যান সামনে এনেছে রিজার্ভ ব্যাংক। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গবাসীর গড় আয়ু ছিল ৬৯.৯ বছর।
এ রাজ্যে সাধারণত পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের গড় আয়ু বেশি হয়। ওই বছর মহিলাদের গড় আয়ু ছিল ৭১.৬ বছর। পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৬৮.৫ বছর। সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সাল শেষে রাজ্যবাসীর গড় আয়ু পোঁছেছে ৭২.৫ বছরে। এক্ষেত্রেও পুরুষদের তুলনায় এগিয়ে মহিলারা। বাংলার মহিলাদের গড় বয়স পোঁছেছে ৭৪ বছরে। পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৭১.১ বছর।
গড় আয়ুর ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে কেরল। সেই রাজ্যের বাসিন্দাদের গড় বয়স ৭৫.১ বছর। সবচেয়ে পিছিয়ে আছে ছত্তিশগড়, যেখানে গড় বয়স ৬৪.৬ বছর। দেশের বাসিন্দাদের গড় আয়ু অর্থাৎ ৭০.৩ বছর বা তারও নীচে রয়েছে যেসব রাজ্যের বাসিন্দারা, সেই তালিকায় আছে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানা, বিহার, অসম। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের নীচে আছে উত্তরাখণ্ড, তেলেঙ্গানা, রাজস্থান, পাঞ্জাব, ওড়িশা, কর্ণাটক, গুজরাত, অন্ধ্রপ্রদেশ। দেশের সিংহভাগ রাজ্যের তুলনায় বাংলার বাসিন্দাদের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণ কী? বিশেষজ্ঞদের কথায়, এর একাধিক কারণ আছে। তারমধ্যে অন্যতম হল সার্বিক আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি। একদিকে যেমন শিশু মৃত্যু ও প্রসূতি মৃত্যুর হার কমেছে, তেমনই সংক্রমণ সংক্রান্ত মৃত্যুর হারও আগের তুলনায় কম। সার্বিকভাবে রাজ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে বলেও পরিস্থিতি ভালো হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। একদিকে যেমন সরকারি হাসপাতালগুলিতে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, তেমনিই রাজ্যের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের আওতায় বেসরকারি হাসপাতালে উন্নত পরিষেবার সুযোগ পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এর পাশাপাশি রাজ্যবাসীর হাতে নগদ টাকার জোগান বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং রোজগার বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন বেঁচে থাকার সীমারেখা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। অপুষ্টির মাত্রা কম হওয়া, পানীয় জলের সরবরাহ বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধিও এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাঁদের মতে, এই পরিস্থিতি আরও ভালো হতে পারত। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা, রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া, দূষণের জেরে ফুসফুসের রোগ বৃদ্ধি, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের প্রবণতা বৃদ্ধি প্রভৃতি সমস্যা বাড়ছে। তা কিছুটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে সাধারণ মানুষের সার্বিক আয়ু বৃদ্ধির ক্ষেত্রে।