মৃণালকান্তি দাস: বছর ২২ আগে উত্তর নিউ ইয়র্কের একটি ছোট লিবারেল আর্টস কলেজে স্নাতক পড়তে যাওয়ার সময় ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়েছিল কলকাতার ছেলে সোমদীপ সেনের। তখন আমেরিকার নেতৃত্বে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ তুঙ্গে। সোমদীপের নিউ ইয়র্ক পৌঁছানোর কয়েক মাস আগেই মার্কিন সেনাবাহিনী ইরাক আক্রমণ করেছিল। ক্যাম্পাসে ‘অশুভ অক্ষশক্তি’-র বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ক্লাসে মার্কিন বিদেশনীতির সমালোচনার অভাব, বিমানবন্দরে ‘এলোমেলো’ নিরাপত্তা তল্লাশি বা মিডিয়ায় ইসলামভীতি ও বর্ণবিদ্বেষ— সব মিলিয়ে সোমদীপ দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন, ভারতীয়দের কাউকেই ‘মুক্তির দেশে’ স্বাগত জানানো হয় না। সম্প্রতি সংবাদসংস্থা আল–জাজিরায় নিজের সেই যন্ত্রণার কথা লিখেছেন ডেনমার্কের রস্কিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।
এর পরের বছরগুলিতেও আমেরিকায় পড়তে যাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের অবস্থার উন্নতি হয়নি। অনেক আমেরিকানের চোখে তাঁরা অবাঞ্ছিত বিদেশি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই অনিশ্চয়তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বর্তমানে মার্কিন প্রশাসন শুধু অসহিষ্ণুই নয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্পষ্টতই বিপজ্জনক। ট্রাম্প বিদেশি শিক্ষার্থীদের জীবনকে আগের চেয়েও কঠিন করে তুলেছেন। তিনি মনে করেন, মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি নাকি ‘মার্ক্সবাদী ও চরম বামপন্থী’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ক্যাম্পাসে প্যালেস্তাইন সমর্থকদের তিনি ঘৃণা করেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, পুনর্নির্বাচিত হলে প্যালেস্তাইন বিক্ষোভে জড়িত ‘উগ্র, মার্কিনবিরোধী, ইহুদিবিদ্বেষী বিদেশি’ শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিল করবেন। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন ইজরায়েলের প্রতি একচেটিয়া সমর্থন জানালেও, মার্কিন জনগণ বা সে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি মোটেও তা সমর্থন করে না। বরং সেখানে আছে বিরুদ্ধস্বর।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্যালেস্তাইন সমর্থক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের টার্গেট করতে শুরু করেন। এর উদাহরণ— কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক মাহমুদ খলিল। প্যালেস্তাইন বিক্ষোভের সময় শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের মধ্যে মধ্যস্থতা করা খলিল গ্রিনকার্ডধারী হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে ডিপোর্ট করার চেষ্টা করছে। তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ, তিনি ‘হামাস-সমর্থক’। ২০২৪ সালের মার্চে নিউ ইয়র্কের বাড়ি থেকে তাঁর গর্ভবতী স্ত্রীর সামনেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং লুইজিয়ানার একটি ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখা হয়। অন্য একটি ঘটনায় টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী ও তুর্কি নাগরিক রুমেইসা ওজতুর্ককে বোস্টনে মাস্ক পরা পুলিস তুলে নিয়ে যায়। তাঁকে ওই একই ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। তাঁর অপরাধ? ইজরায়েল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের দাবি করে স্থানীয় একটি কাগজে কলাম লিখেছিলেন।
মার্কিন বিদেশসচিব রুবিও বলেছিলেন, ‘বিদেশি পড়ুয়ারা কী করছেন, সে দিকে আমরা প্রতিদিন কড়া নজর রাখি। তিনশোরও বেশি এই ধরনের পাগল রয়েছেন। আমি তাঁদের ভিসা কেড়ে নেব। প্রতিটা দেশেরই ঠিক করার অধিকার আছে যে, কে সেই দেশে থাকবেন, কে নয়।’ এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করে, ট্রাম্পের আমলে আমেরিকায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য মার্কিন ক্যাম্পাসগুলি এখন আর স্বপ্নের গন্তব্য নয়। বরং ভয় ও অনিশ্চয়তার জায়গা। রুবিও-র ওই ঘোষণার পর আমেরিকায় বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা আতঙ্কিত। অনিশ্চয়তায় ভুগছেন বহু ভারতীয়ও।
অধ্যাপক সোমদীপ জানাচ্ছেন, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির পোস্ট-ডক্টরাল স্কলার ও ভারতীয় নাগরিক বাদার খান সুরি এখন টেক্সাসের একটি আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) ডিটেনশন সেন্টারে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দিন গুনছেন। তাঁকেও আমেরিকা থেকে বহিষ্কারের চেষ্টা চলছে। অথচ সুরি কোনও প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনেও অংশ নেননি। তাঁর অপরাধ, তিনি গাজার হামাস সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা আহমেদ ইউসুফের জামাই। তবে ইউসুফ এক দশকের বেশি সময় আগে হামাসের রাজনৈতিক শাখার পদ ছেড়েছেন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের হামলাকে ‘একটি ভয়াবহ ভুল’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কর্নেল ইউনিভার্সিটির পিএইচডি প্রার্থী মোমোদু তালের ঘটনার কথাই ধরুন। তিনি ব্রিটেন ও গাম্বিয়ার দ্বৈত নাগরিক এবং প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। আর এই অপরাধেই মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থেকে তিনি লুকিয়ে পড়েন এবং দুই সপ্তাহের বেশি সময় আত্মগোপনে থাকার পর শেষ পর্যন্ত আমেরিকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একই অবস্থা হয়েছিল ভারতীয় শিক্ষার্থী রঞ্জনি শ্রীনিবাসনের। এই সব ঘটনা কেবল হিমশৈলের চূড়া। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে এমন হাজার খানেক বিদেশি ছাত্রের ভিসা বাতিল করেছে। কারণ, তাঁরা প্যালেস্তাইনপন্থী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইজরায়েল বিরোধী পোস্ট করেছিলেন।
১০ এপ্রিল পর্যন্ত আমেরিকার ১০০টির বেশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। প্রতিদিন। ট্রাম্পের প্রশাসন যে পড়ুয়াদের নিশানা করেছে, তাঁদের ৫০ শতাংশই ভারতীয়। শুধু ভিসা বাতিলই নয়। ওই ৩২৭ জন পড়ুয়াকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ তকমা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে তাঁরা আর কখনও আমেরিকায় যেতে পারবেন না। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এখন বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খতিয়ে দেখছে এবং যাঁরা প্যালেস্তাইন সংহতিমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন বা ‘ইহুদিবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডে’ অংশ নিয়েছেন, তাঁদের ভিসা ও গ্রিনকার্ড বাতিল করছে।
আমেরিকার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এই চাপের সামনে মাথানত করছে। তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে তাদের শিক্ষার্থীদের বিপদের মুখে ফেলে দিচ্ছে, যাতে অন্তত ফেডারেল ফান্ডিং বন্ধ না হয়। উদাহরণ— কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি। প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ‘নিষ্ক্রিয়তা’র অভিযোগ তুলে ট্রাম্প প্রশাসন যখন ৪০০ মিলিয়ন ডলার ফেডারেল তহবিল আটকে দেয়, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত নতিস্বীকার করে। অথচ, তাদের নিজস্ব তহবিল প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এরপরও তারা ক্যাম্পাসে আন্দোলন ঠেকাতে নীতি পরিবর্তন করে, নিরাপত্তা জোরদার করে এবং প্যালেস্তাইন সংহতি ক্যাম্প বা প্রতিবাদ যেন আর না হয়, সেই মতো কড়া ব্যবস্থা নেয়। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা বিষয়ক স্টাডিজ বিভাগকে পাঁচ বছরের জন্য ‘অ্যাকাডেমিক রিসিভারশিপ’-এর আওতায় আনতে হবে। সাধারণভাবে এই ব্যবস্থা তখনই নেওয়া হয়, যখন কোনও বিভাগ বা প্রোগ্রাম ব্যর্থ হয়ে পড়ে এবং তাকে ‘ঠিক পথে’ ফিরিয়ে আনতে হয়। ট্রাম্পের দাবি মেনে বিভাগটির উপর নজরদারি চালাতে একজন নতুন প্রশাসক নিয়োগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিও একই রকম চাপের মুখে। রাষ্ট্রশক্তির হাতের পুতুল হতে রাজি হয়নি এই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান সমস্ত শর্ত মেনে নিলেও হার্ভার্ড তাতে পুরোপুরি সম্মত হয়নি। কর্তৃপক্ষ জানান, ইহুদি বিদ্বেষ রুখতে তাঁরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, কারা পড়াবেন, কী কী পড়ানো হবে— এমন নানা খুঁটিনাটি বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনভাবেই পরিচালনা করবে। সেখানে তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনকে নাক গলাতে দেবেন না। এরপরেই নেমে আসে খাঁড়ার ঘা। একের পর এক মূল্য চোকাতে হচ্ছে হার্ভার্ডের মতো আমেরিকার প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি আর্থিক অনুদান বন্ধের কথা আগেই ঘোষণা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শর্ত না মানলে বিদেশি পড়ুয়া ভর্তি বন্ধেরও হুমকি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তার ফলও ফলতে শুরু করেছে। কয়েকজন বিজ্ঞানী, গবেষককে ইতিমধ্যে গবেষণা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আরও বেশ কিছু গবেষণা ও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে।
নিজস্ব সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এত দিন যে বিশেষ করছাড় পেত, তা বন্ধ করা হতে পারে। আমেরিকায় জনস্বার্থে কাজ করা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ওই করছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘জনস্বার্থে কাজ করলে তবেই ট্যাক্স এক্সেম্পট স্টেটাস মেলে। হার্ভার্ডে যেভাবে জঙ্গি অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনৈতিক কার্যকলাপ চলছে, তাতে হার্ভার্ডকে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কর দিতে হবে। আসলে হার্ভার্ড বামপন্থীদের আখড়া। পঠনপাঠনের জন্যও ভালো নয়।’ এই সংঘাত সম্ভবত আমেরিকান সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে নতুনভাবে খাপ খাওয়াতে বাধ্য করবে। অ্যাকাডেমিক জগতের অধিকাংশই মনে করছেন, বহু বছরের কঠোর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এক কাঠামো আজ ভেঙে পড়ছে। অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা হারিয়ে গিয়েছে।
আমেরিকার অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলি যেভাবে ট্রাম্পের দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, তাতে স্পষ্ট— এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশের জায়গা থাকবে না, বরং এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি হয়ে উঠবে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। যেখানে একটি পণ্যের (কলেজ ডিগ্রি) বিনিময়ে একজন ক্রেতাকে (পড়ুয়া) ডলার গুনতে হবে। এই কারণেই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের রক্ষার দায়িত্ব তাঁরা আর নেবেন না। আমেরিকায় এখন প্রতিটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে মেনে নিতে হবে, তাঁরা যেকোনও সময় (শুধু একটি প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার জন্য, কোনও একটি নিবন্ধ লেখার জন্য অথবা এমন মতপ্রকাশের জন্য, যা হোয়াইট হাউস বা তার মিত্রদের অসন্তুষ্ট করবে) গ্রেপ্তার কিংবা বহিষ্কৃত হতে পারেন।
সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলি ট্রাম্পের একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থাকে ট্রাম্প নতুন ধারণায় গড়তে চাইছেন। পাশ্চাত্য সভ্যতার গোঁড়া, একবগ্গা ধারণার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন করে তৈরি করতে চাইছেন শিক্ষা ব্যবস্থাকে। সরে আসতে চাইছেন বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিকরণ-এর মতো আন্তর্জাতিক শিক্ষানীতির ধারণা থেকে।
হীরকের অত্যাচারী রাজা বলেছিলেন, ‘ওরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে!’ আমেরিকা কি তবে সেই হীরক রাজার পাল্লায় পড়েছে?