সোমবার ঢাকায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ট্রাইবিউনাল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ফাঁসির আদেশ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে প্রথম কোনও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নামে এভাবে শাস্তি ঘোষণা হল। একইসঙ্গে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে। পুলিশের প্রাক্তন আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে দেওয়া হয়েছে পাঁচবছরের কারাদণ্ড। এই রায়ে কেউই বিস্মিত নয়। এই রায় জ্ঞাত এবং অনুমিত ছিল। অনুমান করেছিলেন হাসিনার অনুগামীরা। আর সরকার পক্ষ এটা জানত। কারণ এই বিশেষ আদালত তাদের ইচ্ছাতেই গঠিত এবং সক্রিয় হয়। তাদের নির্দেশমাফিক অতিদ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আদালত। রায় ঘোষিত হয়েছে একটি বিশেষ দিনে। ১৭ নভেম্বর দিনটি ছিল শেখ হাসিনা ওয়াজেদের ৫৮তম বিবাহ বার্ষিকী। সবটাই কাকতালীয় ভাবার কোনও কারণ নেই। এটা একেবারে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে। তীব্র প্রতিহিংসা চরিতার্থ ছাড়া এই অমানবিক মুখ কেউ দেখাতে পারে না। এটা ইউনুস সরকারকে করতেই হয়েছে, দুটি কারণে। তিনি কোনও নির্বাচিত সরকারের প্রধান নন। কোনও নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার এই কাণ্ড অনুমোদন করত না। অনেক টালবাহানার পর, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদের নির্বাচন করা হবে বলে ডঃ ইউনুস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উগ্র মুসলিম মৌলবাদী শক্তির ছত্রছায়ায় বহু আকাঙক্ষার ‘জয়’ মিললেও তিনিই যে প্রধানমন্ত্রী হবেন তার কোনও গ্যারান্টি নেই। কার্যোদ্ধার শেষে তাকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়েও ফেলে দেওয়া হতে পারে।
তাহলে প্রতিশোধগ্রহণ যে অপূর্ণই রয়ে যাবে ডঃ ইউনুসের! কারণ শেখ হাসিনা এই নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদকে পছন্দ করতেন না। প্রধানমন্ত্রীর অপছন্দের কারণ, ইউনুস সাহেবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রধানমন্ত্রীর বিচারে যা ছিল ‘অনৈতিক’। বাংলাদেশে তিনি যে গ্রামীণ ব্যাংকের (মাইক্রো ফিনান্স অর্গানাইজেশন) কর্ণধার সেখানে নাকি গরিব মানুষকে ঋণের ফাঁদে ফেলা হয়। ঋণ মেটাতে অত্যন্ত চড়া হারে সুদ গুনতে হয় ওই সংস্থাকে। প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ ছিল, গরিব মানুষের ‘মসিহা’র আড়ালে ইউনুস সাহেব আসলে একজন নিকৃষ্ট মানের ‘সুদখোর’। ব্যাপারটা সেদেশে আইন আদালত পর্যন্তও গড়ায়। তাতে ইউনুস সাহেবকে বারংবার নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল। তাই তিনি পরিষ্কার বুঝেছিলেন, যেকোনও প্রকারে হাসিনা জমানার অবসান ছাড়া তাঁর ‘রাহুমুক্তি’ নেই। অনেকের অনুমান, বাংলাদেশের যুবসমাজের একাংশ যে ‘বৈষম্য-বিরোধী’ আন্দোলন শুরু করেছিল তাতে ইউনুস সাহেবের ইন্ধন ছিল। তাঁর হয়ে দেশে-বিদেশে সক্রিয় ছিল হাসিনা-বিরোধী এক বিরাট চক্র। ২০২৪-এর জুলাইয়ের তথাকথিত ‘বিপ্লব’ ছিল তারই এক মর্মান্তিক পরিণতি। দেশজুড়ে চরম অরাজকতা সৃষ্টির মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা হয়েছিল। বৈষম্য-বিরোধী আন্দোলনের নামে বাস্তবে এক জল্লাদ বাহিনী দেশজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। তাদের টার্গেট হয়ে উঠেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর যাবতীয় স্মৃতি এবং গুণগ্রাহীরা। দিকে দিকে তারা কায়েম করেছিল হামলা, ভাঙচুর, খুন, ধর্ষণ, লুটপাটের রাজত্ব। মুজিবের শেষচিহ্নটুকুও মুছে ফেলার মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক ভূভাগকে ‘পবিত্র’ করে তোলার ইজারা নিয়েছিল ওই দুর্বৃত্তরা।
এমন এক নৈরাজ্যে গদিচ্যুত রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে প্রাণরক্ষা অসম্ভব ছিল। তাই শেখ হাসিনা বাধ্য হয়েছিলেন কৌশলে দেশত্যাগ করতে। যথার্থ বন্ধু প্রতিবেশী হিসেবে ভারত তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে। শেখ হাসিনা এখনও ভারতেই আশ্রিত। আন্তর্জাতিক ট্রাইবিউনালে হাসিনা এবং তাঁর পার্ষদদের বিরুদ্ধে উসকানি, পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রাখা এবং গণহত্যার নির্দেশ দানের মতো ভয়াবহ অভিযোগ আনা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সরকারের মানবতা-বিরোধী অপরাধের অভিযোগ নাকি প্রমাণিত হয়েছে! স্বভাবতই এই রায় ঘোষণা হতেই হাততালিতে ফেটে পড়ে গোটা এজলাস। অমনি ৩২, ধানমন্ডিতে শুরু হয়ে যায় নয়া তান্ডবের তোড়জোড়। হাজির করা হয় বুলডোজার। যদিও পুলিশ-সেনার বাধায় রণে ভঙ্গ দেয় দুর্বৃত্তরা। রায় ঘোষণার পরপরই নয়াদিল্লির কাছে হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে ঢাকা। দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারেই এই হস্তান্তর সম্পন্ন হোক, চায় ইউনুস সরকার। ভারতও অবশ্য জুতসই পালটা প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। অন্যদিকে, বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন মুজিব-কন্যা। এই রায়কে ‘প্রহসন’ আখ্যাসহ হাসিনার প্রতিক্রিয়া, ‘আমি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছিলাম। এটা তারই বদলা।’ এই ‘প্রতিশোধের রায়’কে সংগতভাবেই প্রত্যাখ্যান করেছে হাসিনার দল আওয়ামি লিগ। বুঝতে বাকি থাকে না, আসল লক্ষ্য ইন্ডিয়া (ভারত)। হাসিনা, আদালত, বেনজির শাস্তি ঘোষণা প্রভৃতি উপলক্ষ মাত্র। পাকিস্তানকে খুশি করতেই এই চাল ইউনুস সরকারের। ভারত জানে, অস্বস্তি কীভাবে কাটিয়ে উঠতে হয় এবং এই পরিস্থিতিতে তার করণীয় কী। আপতত কলকাতাসহ বাংলাকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বাংলাদেশ অশান্ত হলে তার ঢেউ কমবেশি এপার বাংলাতেও চলে আসে।