অনির্বাণ রক্ষিত: বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ২০টি বড়ো যুদ্ধ চলছে। তবে ছোটো–বড়ো মিলিয়ে হিসেব করলে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে ৬০টির বেশি রাষ্ট্রভিত্তিক যুদ্ধ এবং ১২০টিরও বেশি সশস্ত্র সংঘাত চলছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি বা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলো ঘটছে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং পূর্ব ইউরোপে। এই তথ্য দেখে মনে হতে পারে, যুদ্ধ হয়তো মানুষের জীবনেরই অংশ। কিন্তু মানুষ কি কখনো যুদ্ধ ছাড়া শান্তিতে বাঁচতে পেরেছিল?
এর উত্তর নির্ভর করে যুদ্ধ বলতে আসলে কী বোঝাচ্ছে এর ওপর। যুদ্ধ বলতে যদি দু’টি দেশের সরকার বা রাষ্ট্রের মধ্যে লড়াইকে বোঝায়, তবে উত্তর হল—হ্যাঁ। মানুষ যুদ্ধ ছাড়াও শান্তিতে ছিল। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ইয়ান মরিস জানান, মানব ইতিহাসের প্রায় ৯৯ শতাংশ সময় কোনো সরকার বা রাষ্ট্রই ছিল না। ফলে তখন রাষ্ট্রীয় যুদ্ধও ছিল না। তবে মানুষে মানুষে মারামারি বা সহিংসতা কিন্তু সব যুগেই ছিল। প্রশ্নটি যদি হয়, মানুষ কি কখনো ঝগড়াবিবাদ বা সহিংসতা ছাড়া বাঁচতে পেরেছে? তবে উত্তর হবে, না।
প্রগৈতিহাসিক যুদ্ধের যুগের ধারণা
মানব ইতিহাসের শুরুতে মানুষ যখন দল বেঁধে খাবার ও শিকারের খোঁজে ঘুরে বেড়াত, তখন যুদ্ধ ছিল খুব বিরল বা একেবারেই ছিল না। চাষবাস শুরু হওয়ার আগে আদিম মানুষের মধ্যে যুদ্ধ খুব কম বা একেবারেই ছিল না। এই ধারণা পাওয়া গেছে মাটির নীচে পাওয়া প্রাচীন মানুষের কঙ্কাল পরীক্ষা করে। বিশ্বজুড়ে প্রাচীন কঙ্কালের হাড় পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা যুদ্ধের আঘাতের চিহ্ন খুঁজেছেন। ধারালো কোনো অস্ত্রের আঘাত বা পিটিয়ে মারার পর গণকবরে পুঁতে রাখার প্রমাণ। তবে খ্রিস্টপূর্ব ৮ হাজার সালের আগের হাড়গোড়ে এ ধরনের বড় কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যায় না। মানুষ যখন এক জায়গায় স্থায়ীভাবে ঘরবাড়ি বানিয়ে থাকা শুরু করল, তখন থেকেই কঙ্কালে আঘাতের চিহ্ন বেশি মিলতে থাকে।
তবে তার মানে এই নয় যে আদিম মানুষের মধ্যে মারামারি একেবারেই ছিল না। কেনিয়ার নাটারুক নামের একটি জায়গায় ১০ হাজার বছর আগের ২৭টি কঙ্কাল পাওয়া গেছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেগুলোকে আঘাত করে মারা হয়েছিল। গবেষকদের মতে, এটি আলাদা দু’টি দলের মারামারির ফল। আবার সুদানের জেবেল সাহাবা নামের স্থানে ১৩ হাজার বছর পুরোনো একটি কবরস্থানেও দু’টি দলের আক্রমণের শিকার হওয়া কঙ্কাল পাওয়া গেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে সমাজগুলো ছিল অনেক ছোটো। তাই তখনকার ছোটোখাটো লড়াইকে যুদ্ধ বলা যায় না। মানুষ সব যুগেই মারামারি করত, কিন্তু মানুষ যখন বড়ো বড়ো দল ও সমাজে ভাগ হতে শুরু করল, তখনই ছোটখাটো মারামারি রূপ নিল বড় যুদ্ধে।
প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যেও শান্তি
পৃথিবীতে বড় বড় রাজ্য তৈরি হওয়ার পর যুদ্ধ করা খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে ইতিহাসজুড়ে শুধু যুদ্ধই নয়, কিছু ব্যতিক্রমী শান্তিপূর্ণ সময়ও ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ থেকে ১২০০ অব্দ পর্যন্ত প্রাচীন মিসর ও হিট্টাইট সাম্রাজ্য কোনো যুদ্ধ ছাড়াই শান্তিতে ছিল। দুই দেশের রাজারা মারামারি না করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটাতেন। আবার রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যও ৩৮৭ থেকে ৫০১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ রেখেছিল। সে সময় তারা একে অপরকে শত্রু না ভেবে সমকক্ষ বন্ধু মনে করত। চীন আবার টাকা দিয়ে শান্তি বজায় রাখত। ১০০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে চীনের সং রাজবংশ উত্তরের যুদ্ধপ্রিয় প্রতিবেশীদের টাকা বা উপহার দিয়ে শান্ত রাখত। এ ছাড়া ১৬০০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে চীন, কোরিয়া ও জাপানের মধ্যেও দীর্ঘ শান্তি বজায় ছিল। ইতিহাসে যুদ্ধ বেশি হলেও এসব ঘটনা প্রমাণ করে, সব সময় যুদ্ধই একমাত্র পথ ছিল না, শান্তির সময়ও ছিল।