মৃণালকান্তি দাস: সময়টা ‘সুইঙ্গিং সিক্সটিজ’। আমেরিকার নতুন প্রজন্ম তখন উত্তাল ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রার গানে। কেনেডিকে জেতাতে সেই সিনাত্রাও গান বেঁধেছিলেন। ‘হাই হোপস’। কেনেডি যে সময়ের থেকেও এগিয়ে ছিলেন, সেটা তাঁর নিন্দুকেরাও স্বীকার করেন। আমেরিকার ইতিহাসে এত কম বয়সে আর কেউ রাষ্ট্রপ্রধানের কুর্সি পাননি। প্রেসিডেন্ট কেনেডিকে নিয়ে আমেরিকানদের সেই আবেগে ধাক্কা লেগেছিল ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর। ইতিহাস বলে, অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন ছাড়া আর কোনও প্রেসিডেন্টের মৃত্যুতে আমেরিকা এত কাঁদেনি!
সেদিন ডালাসে প্রেসিডেন্ট জন ফিটজেরাল্ড কেনেডিকে স্বাগত জানাতে অসংখ্য মানুষের উচ্ছ্বাস। আমেরিকা সহ গোটা বিশ্বে শান্তির আহ্বান জানানো তাঁর ভাষণ তখন মানুষের মুখে মুখে। এয়ারফোর্স ওয়ান ডালাস বিমানবন্দরের মাটি ছোঁয়ার পর প্রেসিডেন্ট চাপলেন হুডখোলা গাড়িতে। পাশে ফার্স্ট লেডি জ্যাকলিন কেনেডি। হঠাৎ গুলির শব্দ। মুহূর্তেই নিথর হয়ে স্ত্রী জ্যাকলিনের কাঁধে ঢলে পড়লেন দুনিয়া কাঁপানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট। শুনশান চারিদিক। প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে হাজির জনগণের কোলাহল উধাও। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তারক্ষীরা ছুটে এলেন। ততক্ষণে সব শেষ। সেই মুহূর্তের প্রচণ্ড ধাক্কা রিচার্ড ও’কনেলের কবিতা ‘নেক্রোসে’ চিত্রিত হয়েছিল এভাবে: ‘মাথাটা পিছনের দিকে ঝুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে খুলি...।’
সেই কেনেডি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি ২ হাজার ২০০টি গোপন ফাইল প্রকাশ করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। যার মধ্যে রয়েছে ৬৩ হাজার পাতার নথি। টাইপ রাইটারে লেখা, হাতে লেখা নোট, স্টিল ছবি, অডিও ক্লিপ, ভিডিও—সব মিলিয়ে এক বিপুল দলিল। যার পরতে পরতে রহস্য। এমন নয় যে এই প্রথম কেনেডি হত্যার গোপন ফাইল প্রকাশ করল আমেরিকা। এর আগেও করেছে। কিন্তু তাতে ধোঁয়াশা কাটেনি। আর তাই গত ছ’দশকের বেশি সময় ধরে জেএফকে হত্যাকাণ্ড নিয়ে কত যে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়েছে তা গুনে শেষ করা যাবে না।
নির্বাচনী প্রচারের সময় সেই সব গোপন নথি প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তাঁর যুক্তি ছিল, এতে মার্কিন নাগরিকদের মন থেকে সরে যাবে ধোঁয়াশার পাহাড়। সত্যিই কি তাই? নথিতে জন গ্যারেট আন্ডারহিল নামে আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-র এক এজেন্টের নাম উল্লেখ রয়েছে। যিনি তাঁর এক বন্ধুকে জানিয়েছিলেন, তাঁর সন্দেহ কেনেডিকে খুনের পিছনে আমেরিকান গুপ্তচর সংস্থারই একাংশের হাত রয়েছে। লি হার্ভি অসওয়াল্ড নামে যে ব্যক্তিকে কেনেডি হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাকে সেই সময় ফাঁসানো হয়েছিল বলেও দাবি করেছিলেন আন্ডারহিল। কিন্তু কে এই আন্ডারহিল? প্রকাশিত নথি বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আন্ডারহিল মার্কিন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন। হার্ভার্ডের স্নাতক। একসময় বিখ্যাত লাইফ ম্যাগাজিনের সামরিক সংবাদদাতা ছিলেন। সিআইএ-র সঙ্গে যোগ আরও পরে।
১৯৬৭ সালের ১৯ জুলাইয়ের এক নথিতে উল্লেখ রয়েছে, কেনেডি হত্যাকাণ্ডের পরই আতঙ্কে ওয়াশিংটন ছাড়েন আন্ডারহিল। পালিয়ে নিউ জার্সিতে তাঁর এক বন্ধুর বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। সেই বন্ধুর দেওয়া সাক্ষ্যর উল্লেখ রয়েছে সদ্য প্রকাশিত নথিতে। আন্ডারহিল নাকি তাঁর বন্ধু শার্লিন ফিটসিমন্সকে বলেছিলেন, কেনেডির কাজকর্মে সিআইএ-র একটা অংশ আদৌ সন্তুষ্ট ছিল না। তারা অস্ত্র চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং অন্যান্য অবৈধ কাজে জড়িত। সে বিষয়ে কেনেডি মুখ খোলার আগেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। শুধু তাই-ই নয়, প্রেসিডেন্টের উপর আক্রমণ হতে পারে, এমন গোয়েন্দা তথ্য জানার পরেও তাকে গুরুত্ব দেননি তৎকালীন সিআইএ অফিসাররা। ঘাতক অসওয়াল্ড স্রেফ বলির পাঁঠা। তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, কেনেডির মৃত্যুর ছ’মাসের মাথায় রহস্যজনক পরিস্থিতিতে উদ্ধার হয় আন্ডারহিলের মৃতদেহও। তাঁর শরীরে গুলির আঘাত ছিল। একটি অটোমেটিক পিস্তল পাওয়া যায় তাঁর শরীরের বাঁ পাশে। অটোপ্সি রিপোর্টে বলা হয়, আন্ডারহিল নিজেই নিজেকে গুলি করেছিলেন। আন্ডারহিলের রহস্য-মৃত্যুর পরে গোটা ঘটনাপ্রবাহে সিআইএ-র ভূমিকার বিষয়টি আরও বেশি করে নজরে আসে। কারণ, আন্ডারহিলের মৃতদেহ প্রথম দেখতে পান দ্য নিউ রিপাবলিকের সাংবাদিক অ্যাশার ব্রাইনস। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, আন্ডারহিল ডানহাতি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মাথার বাম কানের পিছনে গুলি কীভাবে লাগল?
কেনেডি খুনের তদন্তভার গিয়েছিল ‘ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’ বা এফবিআইয়ের কাঁধে। আততায়ী রাইফেলের গুলিতে প্রেসিডেন্টকে হত্যা করেছেন বলে জানতে পারেন তাঁরা। ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই লি হার্ভি অসওয়াল্ড নামে ২৪ বছরের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করে এফবিআই। অভিযুক্ত মার্কিন নৌবাহিনীর প্রাক্তন সেনা বলে জানা গিয়েছিল। টেক্সাস স্কুল বুক ডিপোজিটরির ষষ্ঠ তলা থেকে কেনেডিকে নিশানা করে গুলি ছোড়ে অসওয়াল্ড। এর দু’দিন পরের ঘটনা। অসওয়াল্ডসহ বন্দিদের অন্য একটি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এমন সময় জ্যাক রুবি নামে এক নৈশক্লাব মালিকের গুলিতে নিহত হন অসওয়াল্ড। ফলে প্রকাশ্যে আসে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব। মুখ বন্ধ করতেই অসওয়াল্ডকে দুনিয়া থেকে সরানো হয়েছে বলে মার্কিন পত্রপত্রিকাগুলিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। যদিও তা মানতে চাননি এফবিআইয়ের গোয়েন্দারা।
কেনেডির মৃত্যুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন লিন্ডন বি জনসন। তাঁর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড তদন্তে একটি কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের প্রধান করা হয় সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আর্ল ওয়ারেনকে। তদন্তে নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৬৪ সালে কমিশন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, অসওয়াল্ড একাই কেনেডিকে হত্যা করেছেন। তাঁর সঙ্গে আর কারও জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য কোনও প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু কেনেডি হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রশাসনের ব্যাখ্যা বা বয়ান, তা কয়েক দশক পরেও বেশিরভাগ আমেরিকান বিশ্বাস করেন না। সদ্য প্রকাশিত নথিতেও তেমন কিছু পাওয়া যায়নি বলে মনে করছেন ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মার্ক সেলভারস্টোন। কিন্তু আমেরিকার আম-জনতা কেন মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সিআইএ যোগ থাকার সম্ভবনা রয়েছে?
২৬ জুন ১৯৬৩। দ্বিধাবিভক্ত বার্লিন শহরের পশ্চিম ভাগে দাঁড়িয়ে কেনেডির সেই বিখ্যাত ভাষণ। আমিও বার্লিনেরই লোক! কেনেডি সেদিন বলেছিলেন, যাঁরা বলেন কমিউনিজমই ভবিষ্যৎ, তাঁরা এসে দেখে যান, কমিউনিস্ট শেকলে বাঁধা পূর্ব, না কি গণতান্ত্রিক পশ্চিম, কোন জার্মানিতে প্রাণের স্ফূরণ বেশি! সম্ভবত এই কমিউনিস্ট–বিরোধিতার জায়গা থেকেই কিউবায় কাস্ত্রোকে ক্ষমতা থেকে হটানোর সিআইএ’র ছকে সায় দিয়ে ফেলেছিলেন কেনেডি। তিনি যে বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, সেই ১৯৬০-এই কিউবায় মার্কিন মালিকানাধীন সমস্ত তেল আর চিনি কোম্পানি সরকারি দখলে নিয়েছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। তার বদলা নিতে সিআইএ আমেরিকায় আশ্রয় নেওয়া এক দল কিউবানকে তালিম দিয়ে, আধাসেনা বাহিনী বানিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল কিউবায়। আমেরিকার কুখ্যাত বি–ফিফটি টু বম্বার গিয়ে এক প্রস্থ বোমাও ফেলেছিল কিউবার সামরিক বিমানঘাঁটিতে। কিন্তু তারপরই নিজের মত বদলে ফেলেছিলেন কেনেডি। আর বিমান হামলার অনুমতি দেননি। যে কারণে ব্যর্থ হয় ১৯৬১-র এপ্রিলে সিআইএ–র সেই ‘বে অব পিগ্স’ অভিযান। কাস্ত্রোর রেভোলিউশনারি আর্মি মাত্র তিন দিনের লড়াইয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে সিআইএ-র পাঠানো সেই ভাড়াটে সেনাদের। আহত, ক্ষিপ্ত সিআইএ আরও ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্রে নামে। ঠিক হয়, আমেরিকার মাটিতে মার্কিন নাগরিকদের উপর কিউবার সাজানো হামলা ঘটিয়ে, সেই অজুহাতে কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করবে মার্কিন বাহিনী। কেনেডি তাতে জল ঢেলে দেন। অনেকেই মনে করেন, সেই বিরোধের পরিণতিই কেনেডি–হত্যা। এখনও সেই হত্যাকাণ্ড রহস্যই থেকে গিয়েছে।
২০২৩ সালেও গ্যালাপের সমীক্ষা অনুযায়ী, আমেরিকানদের ২০ শতাংশ বিশ্বাস করেন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেনেডিকে হত্যা করেছেন ওই অসওয়াল্ড-ই। আর ১৬ শতাংশের ধারণা, অসওয়াল্ড নিজেই সিআইএর লোক ছিলেন। যদিও সদ্য প্রকাশিত নথিতে এসব দাবির পক্ষে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এটা নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে, কেনেডিকে হত্যার আগে মেক্সিকো সিটিতে অবস্থিত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কিউবার দূতাবাসে গিয়েছিলেন ঘাতক অসওয়াল্ড। একটি নথিতে অসওয়াল্ড কখন সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন, সেই সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। আমেরিকায় আবার ফিরে আসার পর তাঁর গতিবিধির উপর নজরদারি চালিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। ওই অসওয়াল্ডকে যিনি গুলি করে মেরেছিলেন সেই জ্যাক রুবির বিচার এবং জেলে থাকার সময় ক্যান্সারে মৃত্যুর ঘটনা সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে। রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন জানা যায়, জেলে রুবির চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ডাক্তারদের একজন লুইস জোলিয়ন ওয়েস্ট ছিলেন সিআইএ-এর মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প ‘এমকেআল্ট্রা’—এর সঙ্গে জড়িত গবেষক।
কেনেডি হত্যাকাণ্ড নিয়ে আরও কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব রয়েছে। যেমন, বিদেশি শত্রুরা এই হত্যার চক্রান্ত করেছিল। কারও এমনও দাবি, প্রেসিডেন্ট হওয়ার বাসনা থেকে এই হত্যাকাণ্ডের চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসন। কেউ কেউ মনে করেন, এটা কোনও মাফিয়া চক্রের কাজ। সদ্য প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানা যায়, সবই অন্তঃসারশূন্য!
শুধু জীবন্ত রয়ে গিয়েছে মাথায় গুলি লাগার ঠিক আগের মুহূর্তের ছবিটা। হুডখোলা লিমুজিনে বসে রাস্তার দু’পাশে জনতার দিকে কেনেডির সেই হাত নাড়ার দৃশ্য!