Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাংলায় কি বিজেপি নেতৃত্ব হাল ছেড়ে দিয়েছে?

বাংলায় কি বিজেপি নেতৃত্ব হাল ছেড়ে দিয়েছে?
  • ২৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: গত ১০ বছরে বিহার পেয়েছে ৯ লক্ষ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প। গত ৬ মাস ধরে বিহার পেয়েই চলেছে অসংখ্য প্রকল্প। যেহেতু বিধানসভা ভোট। অথচ সামনে কোনও ভোট নেই, কিন্তু ওড়িশাকে শুধুমাত্র গত মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই দেওয়া হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। টেলিকম, রেল, উচ্চশিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্কিল উন্নয়ন এবং গ্রামীণ আবাসন। গত বছর মহারাষ্ট্রে ছিল বিধানসভা ভোট। ৫ মাস আগেই ২০২৪ সালের জুন মাসে ৭৬ হাজার কোটি টাকার নতুন বন্দর দেওয়া হয়েছিল মহারাষ্ট্রকে। সেটা ছিল শুরু। এরপর থেকে প্রকল্পের বন্যা। বিগত কয়েক বছরের যে প্রবণতা দেখা গিয়েছে সেটি হল, যে কোনও রাজ্যের ভোটের অন্তত আট নয় মাস আগে থেকেই সেই রাজ্যের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার বরাদ্দ করতে শুরু করে ভোটের উপহার। সামান্য উপহার নয়। একটানা সেই উপহার চলে ভোট ঘোষণা হওয়া পর্যন্ত।

Advertisement

আর মাত্র চার পাঁচ মাস পরই পশ্চিমবঙ্গে ভোট ঘোষণা হয়ে যাবে। সম্প্রতি একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সফর করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি ও দলীয় কর্মসূচি করেছেন। কিন্তু এই যে উপরিলিখিত প্রকল্পগুলির ধাঁচে কোনও ঘোষণা হয়নি বাংলার ক্ষেত্রে। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগেও বাংলার জন্য এরকম কোনও বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প হয়নি। এবারও সেরকম কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাংলার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটিই প্রকল্প পাওয়া গিয়েছে। কল্যাণী এইমস। যে সরকারি প্রকল্প সরাসরি মানুষের প্রতিদিনের কাজে লাগে, সেটাই হল জনস্বার্থবাহী। এটা সেরকম। ১০ বছরে আরও অনেক কিছু উপহার ও কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প দেওয়াই যেত। দেওয়া হল না। 
বংলাকে বঞ্চনা করা হচ্ছে অথবা অন্য রাজ্যকে দেওয়া হচ্ছে, বাংলাকে কেন দেওয়া হয় না? বাংলা কি আজীবন শুধু উপেক্ষারই শিকার হয়ে থাকবে? এই সব বহুচর্চিত এবং ক্লিশে হয়ে যাওয়া অভিযোগ পুনর্বার উত্থাপন করার লক্ষ্য এই প্রতিবেদনের নয়। ওসব বলে লাভ হয় না। বরং একটি বিশেষ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না বিগত ১০ বছর ধরেই। সেই প্রশ্নই আবার উঠছে। সেটি হল, এই যে একের পর এক ভোট আসছে এবং চলে যাচ্ছে, কিন্তু মোদি সরকার বাংলার জন্য কোনও উপহার দিচ্ছে না, এই মনোভাবের নিশ্চয়ই কোনও রহস্য আছে। যেটা হয়তো আমরা ধরতে পারছি না। 
রহস্যটা ঠিক কী? বিজেপির রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি অত্যন্ত ধোঁয়াশার জন্ম দিয়েছে। এটা সাধারণ বঙ্গবাসীই শুধু নয়, খোদ বঙ্গবিজেপির অন্দরেরও প্রশ্ন। কারণ, তাদের যখন শাসকপক্ষ কিংবা সাধারণ ভোটার প্রশ্ন করছে যে, ১০ বছরে বাংলাকে মোদি সরকার কী কী দিয়েছে, কেন একটিও বড়সড় কোনও আইকনিক প্রকল্প দেওয়া হল না? এই প্রশ্নের সঠিক জবাব বঙ্গবিজেপির নেতাকর্মী সমর্থকরা দিতে পারছেন না। তাঁদেরও অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। কারণ, শুধুই হিন্দু মুসলমান ইস্যু বাংলা জয়ের জন্য সম্পূর্ণ কার্যকর যে নয়, সেটা এতদিনে সম্পূর্ণ স্পষ্ট। এক্ষেত্রে একমাত্র বিকল্প হল, অতিরিক্ত সহায়ক অস্ত্র অন্তত হতে পারত কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ম করে বাংলাকে নানাবিধ উন্নয়ন প্রকল্পে সম্পূর্ণ যদি ভাসিয়ে দেয়। প্রচুর নতুন নতুন ট্রেন, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রো রেলের নবতন সম্প্রসারণ, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা স্থাপন কিংবা এক্সটেনশন, নতুন এয়ারপোর্ট, নতুন বন্দর, একাধিক কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। 
এগুলি ঘোষণা করা এমন কিছু রকেট সায়েন্স নয়। এই সবই সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরগুলির মাধ্যমেই রূপায়িত হয়। সুতরাং কেন্দ্র টাকা দিলেও রাজ্য সরকার সেই টাকা খরচ করবে না, এই যুক্তিও চলবে না। অথচ কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এসব কোনও প্রকল্পই ঘোষণা করা হয় না। এটা নিছক বঞ্চনা নয়। বরং একটি রহস্য। কারণটা কী? 
২০০৯ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী হওয়ার পর রেলবাজেটগুলিতে বাংলার জন্য কল্পতরু হওয়ার একটি জোরালো বার্তা দিয়ে গিয়েছেন। তার আগে লালুপ্রসাদ যাদব, নীতীশকুমার, রামবিলাস পাসোয়ান এমনকি আটের দশকে গনি খান চৌধুরীও এই একই পথের অনুসারী ছিলেন। অর্থাৎ উপহার দিয়ে ভোটের রাজনীতির বাজিমাত করা। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এসব কিছুই করছে না। তারা কি আসলে জিততে চায়ই না? 
সন্দেহ ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে যে, বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব কি বাংলায় আগেই হার স্বীকার করে নিয়েছে? ওয়াকওভার দিয়ে দিয়েছে তৃণমূলকে? তৃণমূলের বিরুদ্ধে শত অভিযোগ তোলা হলেও সেগুলি নিয়ে বিজেপির মধ্যে সেই প্রবল আন্দোলন কিংবা দাঁতে দাঁত চাপা রাজনীতি দেখা যায় না।
সিপিএম বলতেই পারে আমরা তো আগেই বলেছি মোদি ও মমতার মধ্যে সেটিং আছে। কিন্তু ওগুলো তো হাততালি পাওয়ার কথা। রাজনীতি কম, চটকদার স্লোগান বেশি। সিপিএমের আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, সেটিং থাকলেও আমরা কিছু করতে পারছি না কেন? সেটিং না থাকলেও আমরা কিছু করতে পারছি না কেন? আমাদের সমস্যাটা ঠিক কী হচ্ছে? সিপিএম অনায়াসে ঘুরে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু সেই পদ্ধতি তারা গ্রহণ করছে না। সেটা অন্য আলোচনা। 
কিন্তু মূল প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে যে, আর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে রাজ্যজুড়ে বিধানসভা ভোটের দামামা বেজে যাবে, অথচ বঙ্গবিজেপিকে দেখলে সেটা বোঝার উপায় আছে? আগামী সোমবার যদি ভোট হয়, তাহলে বিজেপি ঠিক কী ইস্যু নিয়ে রাস্তায় নামবে? এখনও ঠিক হয়েছে? সিবিআই, ইডি দিয়ে যখন চরমতম এক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল শাসক শিবিরে, তখনই কিছু করতে পারেনি বিজেপি, এখন তো ওই দুই অস্ত্রকে কেউ আর বিশ্বাসই করে না। এমনকি আগামী কাল রাজ্যে কোনও বড়সড় ঘটনা ঘটলে সম্ভবত বিরোধীরা আর যাই হোক সিবিআই তদন্ত আর চাইবে না। প্রত্যেকটি কেন্দ্রীয় এজেন্সি ফ্লপ। 
কেন ফ্লপ? ভোটের রাজনীতিতে একটি কথা খুব পরিচিত। সেটি হল ‘হাওয়া’। একে অন্যকে প্রশ্ন করা হয়, হাওয়া কেমন বুঝছো? হাওয়া কোনদিকে? ইত্যাদি। এখন যদি সেই হাওয়ার প্রশ্ন করা যায়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কেউ নিরপেক্ষভাবে বলতে পারছে যে, বিজেপির পক্ষে হাওয়া প্রবল? যে কোনও সময় ভোট হলেই বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জিতে যাবে? কেউ বলবে না। উল্টে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে যে, ৫০টি আসন বিজেপি পাবে তো?
এটা কেন হচ্ছে? ১৫ বছর পরও বিজেপি প্রধান বিরোধী দল হয়ে বড়সড় ভোটশেয়ার থাকা সত্ত্বেও এরকম ম্লান এবং নড়বড়ে কেন? দিল্লির বিজেপি নেতৃত্ব থেকে কোনও কুশলী রাজনৈতিক পরিণতমনস্ক মনোভাবও দেখা যায় না। 
এখন থেকেই স্পষ্ট যে, বিজেপি দুটি ইস্যু নিয়ে আগামী দিনে রাজনীতি করতে চাইবে। মাঝেমধ্যেই এদিক ওদিক থেকে শোনা যাবে সাম্প্রদায়িক টেনশন। আর দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এসআইআর। নির্বাচন কমিশনের এই ভোটার তালিকা সংশোধন অন্তত বাংলার ক্ষেত্রে ব্যুমেরাং হতে চলেছে বিজেপির জন্য। কারণ নাগরিকত্ব নিয়ে সবথেকে বেশি উদ্বেগ তৈরি হবে বিগত চল্লিশ পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু অধিবাসীদের মনে। একটু খোঁজখবর করলেই বঙ্গবিজেপির নেতানেত্রীরা জানতে পারবেন যে, এই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন নিয়ে যতটা বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিমরা আতঙ্কে আছে, তার থেকে বেশি টেনশনে বহু বছর ধরে ভারতের বাসিন্দা হয়ে যাওয়া হিন্দুরা। যাদের একটি বড় অংশ বিজেপির সমর্থক। যেখানে দেওয়া যেত নানাবিধ ভোটের উপহার, সেখানে দেওয়া হচ্ছে নিত্যনতুন আতঙ্ক। 
ভোটপর্ব মিটে গেলে, সব শান্ত হয়ে যাওয়ার পর, ভবিষ্যতের জন্য এই তালিকা সংশোধন করাই যেত। কিন্তু এই যে জেনেশুনে একটা আতঙ্ক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার আবহ সৃষ্টি করা হচ্ছে, এটা কিন্তু মানুষের মধ্যে মানসিকভাবে বিরক্তি ও ক্রোধের সঞ্চার করবে। 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন মহাশক্তিধর রাজনীতিবিদ। যাঁর ৪২ বছরের সংসদীয় রাজনীতির একচ্ছত্র অভিজ্ঞতা। তাঁকে পরাস্ত করা কি 
এত হেলাফেলা করে সম্ভব? তাঁকে পরাস্ত করতে গেলে যে ক্ষুরধার পরিকল্পনার প্রয়োজন, শাণিত বুদ্ধির রাজনীতির দাবাখেলা দরকার, সেটা আদৌ দেখা যাচ্ছে বিজেপির মধ্যে? বরং আগামী কয়েকমাসের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো এমন কিছু জনমন জয়ের ঘোষণা করবেন যে, বিজেপি আরও পিছিয়ে পড়বে! 
একটি দল ১১ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারে রয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ নেতা সর্বশক্তিমান। দক্ষিণের কয়েকটি বাদে, প্রায় সব রাজ্যই দখল করেছেন তিনি। অথচ বাংলাই পারছেন না। আর তাই আবার প্রশ্নটা মাথাচড়া দিচ্ছে যে, বাংলার জন্য কোনও ফর্মুলাই কেন কাজে দিচ্ছে না? কেন বিজেপির তথাকথিত চাণক্যও বারংবার ব্যর্থ? আগামী ভোটের পর দলের কর্মী এবং সমর্থকরাই কিন্তু প্রশ্ন করবেন শীর্ষ নেতৃত্বকে যে, আপনারা কী চান?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ