আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। রোজ আমাদের শরীর অসংখ্য জীবাণুর আক্রমণের শিকার হয়। এই আক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করে শরীরের অতন্দ্র প্রহরী, রোগ প্রতিরোধতন্ত্র। সহজভাবে বলা যায়, দেহের নিরাপত্তাব্যবস্থা। সেখানে সেনাবাহিনীর মতো প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ শ্বেতরক্ত কণিকা, টি-সেল, বি-সেল রক্ষা করতে অবিরাম ছুটে বেড়ায়। এই রোগজীবাণুগুলির প্রতিটির ভিন্ন ভিন্ন গড়ন রয়েছে। আবার অনেক জীবাণুর কোনও বিশেষ প্রতিরূপের সঙ্গে আমাদের মানব দেহকোষের অনেক মিলও রয়েছে। তাহলে কোন ক্ষেত্রে জীবাণুর উপর আক্রমণ করতে হবে, কোন ক্ষেত্রে করতে হবে না, কীভাবে স্থির করে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা? কী এমন বিষয় রয়েছে, যার জন্য নিজ শরীরকেই আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা? আক্রমণকারী জীবাণুর কোনও কোনওটি আবার আমাদের দেহকোষের রূপও নিতে পারে। অর্থাৎ ধারণ করতে পারে ছদ্মবেশ। তাদের সঠিকভাবে চিনে, নিজ শরীরের কোষকে আক্রমণ না করে রোগ প্রতিরোধ করে দেহের নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রশ্ন হল, কীভাবে এত কিছু সম্ভব হচ্ছে? এই ধাঁধারই সমাধান করলেন তিন বিজ্ঞানী— শিমোন সাকাগুচি (জাপান), মেরি ই. ব্রাঙ্কো এবং ফ্রেড র্যামসডেল (আমেরিকা)।
এই ত্রয়ী জানতে পারেন, এর নেপথ্যে রয়েছে একটি বিশেষ ধরনের রোগ প্রতিরোধক কোষ। এই কোষগুলিকে বলা হয় ‘রেগুলেটরি টি সেল’।
রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যে কোষটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হল ‘টি সেল’। একে বলা যায় শরীরের প্রহরী। এই কোষগুলিই বিভিন্ন ভাইরাস বা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত কোষগুলিকে ধ্বংস করে। এর পাশাপাশি শরীরে আরও এক ধরনের রোগ প্রতিরোধক কোষ রয়েছে— ‘রেগুলেটরি টি সেল’। এই কোষগুলিই মানবদেহে ‘অটোইমিউন’ ব্যাধি হওয়া আটকায়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্যই ম্যারি, ফ্রেড এবং শিমনকে ২০২৫ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার ঘোষণা করেছে সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট।
আমাদের দেহের নিরাপত্তাব্যবস্থা, যে কোনও দেশের সেনাবাহিনীর মতোই। সদা নির্ভীক, লড়াই করছে জীবাণুদের সঙ্গে। কিন্তু এরা আমাদের দেহকোষ এবং প্যাথোজেন বা জীবাণুদের মধ্যে পার্থক্য করে কীভাবে? প্রতিটি টি-কোষেই ‘টি-সেল রিসেপ্টর’ বা ‘টি-কোষ গ্রাহক’ নামে বিশেষ ধরনের প্রোটিন থাকে। এরা একধরনের সেন্সরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই সেন্সরই জীবাণু শনাক্ত করার মূল কারিগর। ‘টি-কোষ গ্রাহক’ আবার নানা আকার-আকৃতির হতে পারে। জিগস পাজলের বিভিন্ন অংশের মতো। তাত্ত্বিকভাবে আমাদের দেহে বিপুল ধরনের বৈচিত্র্যময় টি-কোষ তৈরি হতে পারে। তাদের থাকে আবার নানা আকারের গ্রাহক। এই আকার-আকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এরা বিভিন্ন প্রকারের ভাইরাসের আকৃতি শনাক্ত করতে পারে। সমস্যা হল, শরীরে এমন কিছু গ্রাহক টি-কোষ তৈরি হয়, যেগুলি দেহের নিজস্ব টিস্যুর সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। ঘুরেফিরে তাই সেই প্রশ্ন— এরা তাহলে কেন শুধু জীবাণুদেরই আক্রমণ করে?
এর কারণটি বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ১৯৮০-এর দশকে। আশির দশকের শুরুতে, জাপানের তরুণ ইমিউনোলজিস্ট শিমোন সাকাগুচি একটি প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন— ‘আমাদের ইমিউন সিস্টেম কেন নিজের শরীরের সাধারণ কোষকে আক্রমণ করে না?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি একদিন ইঁদুরের থাইমাস গ্রন্থি (যেখানে টি-সেল তৈরি হয়) কেটে ফেলে দেন। ফলাফল ছিল ভয়াবহ। ইঁদুরগুলির শরীরে অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। তাদের ইমিউন সিস্টেম নিজের শরীরের সাধারণ কোষ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে তাদের শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। চামড়ায় প্রদাহ, অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্ষতি এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা। শেষপর্যন্ত, এদের অনেকেরই মৃত্যু ঘটে। তবে, আবার যখন সাকাগুচি এই ইঁদুরদের শরীরে সুস্থ ইঁদুরের পরিপক্ব টি-সেল প্রবেশ করান, তখন রোগ থেমে যায়। এ থেকেই তিনি ধারণা করেন যে, ইমিউন সিস্টেমে এমন কিছু কোষ আছে, যারা অন্য কোষগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এই শান্তিপ্রিয় ‘সেনা’ কোষগুলো খুঁজে পেতে সাকাগুচির লেগে যায় ১০ বছরেরও বেশি সময়।
বিজ্ঞানীরা দেখেন, টি-কোষ একধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। পরীক্ষাটি ঘটে থাইমাস নামে নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি বিশেষ অঙ্গের ভিতরে। এই অঙ্গের ভিতরেই রোগ প্রতিরোধক কোষগুলি পরিপক্বতা লাভ করে। সেখানে থাইমাস এসব টি-কোষকে দেহের নিজস্ব প্রোটিনের কিছু অংশ দেখায়। যেসব টি-কোষ এসব প্রোটিনের অংশকে চিনতে পারে এবং সেগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেগুলিকে ওখানেই ধ্বংস করে ফেলা হয়। আর যেগুলি আমাদের প্রোটিনকে চেনে না, তারা বেঁচে যায়। তার মানে, এগুলি ভবিষ্যতে ভুল করে আমাদের নিজস্ব টিস্যু বা অঙ্গকে আক্রমণ করবে না। শুধু জীবাণুদেরই আক্রমণ করবে। এটাই সেই সেন্ট্রাল ইমিউন টলারেন্স বা কেন্দ্রীয় সহনশীলতা। বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, ঘটনা এটুকুই। কিন্তু ১৯৯৫ সালে শিমন সাকাগুচির হাত ধরে প্রথম বোঝা গেল, ঘটনা এত সহজ নয়। ১৯৯৫ সালে তিনি আবিষ্কার করেন এই কোষগুলির অস্তিত্ব। নাম দেন ‘রেগুলেটরি টি-সেল’ বা নিয়ন্ত্রক টি-সেল। তিনি জানান, এরা সিডি ৪ এবং সিডি ২৫ প্রোটিন দ্বারা চিহ্নিত হয়। রেগুলেটরি টি-সেল হল, ইমিউন সিস্টেমের একটি বিশেষ ধরনের কোষ, যারা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখে এবং অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় ইমিউন প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এদের কাজ— ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত রাখা, যাতে এটি শরীরের নিজস্ব কোষ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিরুদ্ধে আক্রমণ না করে। এরাই শরীরের ‘সেনাবাহিনী’ হিসেবে কাজ করে, যারা ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য কোষকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
আমেরিকার বায়োটেক কোম্পানি সেলটেক চিরোসায়েন্সে কাজ করছিলেন মেরি ব্রাঙ্কো ও ফ্রেড র্যামসডেল। তাদের দৃষ্টি পড়ে স্কারফি নামে এক অসুস্থ ইঁদুর প্রজাতির উপর। এই পুরুষ ইঁদুরগুলি জন্ম থেকেই ত্বকের সমস্যায় ভুগত, তাদের প্লীহা ও লিম্ফ গ্রন্থি ফুলে যেত এবং মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মারা যেত। ব্রাঙ্কো ও র্যামসডেল জানতে চাইলেন, ঠিক কোন জিন এর জন্য দায়ী? তাঁরা এক্স ক্রোমোজোমের বিশ্লেষণ শুরু করেন এবং অবশেষে ২০টি সম্ভাব্য জিনের মধ্যে একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন খুঁজে পান, যার নাম দেন ফক্সপি৩। পরে তারা আবিষ্কার করেন, মানব শরীরে ফক্সপি৩ জিনে ত্রুটি হলে আইপিইএক্স নামে এক ভয়াবহ অটোইমিউন রোগ হয়, যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। ২০০১ সালে, ব্রাঙ্কো ও র্যামসডেল নেচার জেনেটিক্স-এ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেখানে প্রথম বলা হয়, স্কারফি ইঁদুর ও আইপিইএক্স রোগের পিছনে রয়েছে ফক্সপি৩ জিনের ত্রুটি। এরপর গবেষকরা সাকাগুচির রেগুলেটরি টি-সেল-এর সঙ্গে ফক্সপি৩-এর সম্পর্ক খুঁজতে শুরু করেন। দুই বছরের মধ্যে সাকাগুচি নিজেই প্রমাণ করেন, ফক্সপি৩ জিনই নিয়ন্ত্রণ করে রেগুলেটরি টি-সেল তৈরি হবে কি না। অর্থাৎ, এই জিনই ঠিক করে শরীরের ‘সেনা’ কোষ তৈরি হবে কি না এবং ইমিউন সিস্টেম কতটা নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, ...ইমিউন সিস্টেম কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় কোন অণুজীবকে আক্রমণ করতে হবে এবং কোনটিকে রক্ষা করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিন বিজ্ঞানী—শিমোন সাকাগুচি, মেরি ব্রাঙ্কো ও ফ্রেড র্যামসডেল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এই আবিষ্কার ইমিউন সিস্টেমের ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করে, যার মাধ্যমে শরীর ক্ষতিকর প্যাথোজেন এবং নিজস্ব কোষের মধ্যে পার্থক্য করে। এই যুগান্তকারী গবেষণার ফলে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ২০০-এর বেশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। এতে রেগুলেটরি টি-সেল ব্যবহার করে টাইপ-১ ডায়াবেটিস, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জটিলতা এবং এমনকী ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
লিখেছেন মৃণালকান্তি দাস