পি চিদম্বরম: আমার গত সপ্তাহের বিশেষ নিবন্ধটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই পত্রিকা দপ্তরে জমা দিয়েছিলাম। আমার দুর্ভাগ্য যে তার ২৪ ঘণ্টার ভিতরে, গত ৩১ মে চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ (সিডিএস) জেনারেল অনিল চৌহান সিঙ্গাপুরে ব্লুমবার্গ এবং রয়টার্সকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সময়, স্থান এবং মিডিয়ার পছন্দ সত্যিই আশ্চর্যজনক ছিল কিন্তু উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো ভুল কিছু ছিল না। উপলক্ষটি ছিল শাংরি-লা ডায়ালগ: একটি ট্র্যাক ওয়ান ইন্টার-গভর্নমেন্টাল সিকিউরিটি কনফারেন্স। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএ) উদ্যোগে এটি প্রতিবছরই সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হয়। সিঙ্গাপুর একটি বন্ধু দেশ।
সত্যটা একদিন বলে দেওয়াই উচিত। আমার মনে হয়, এই উপলক্ষ্যে সংসদের একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকাই হতো আরও উপযুক্ত পদক্ষেপ। অপারেশন সিন্দুর সম্পর্কে সেখানে প্রধানমন্ত্রী অথবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বিবৃতি দিতেন এবং অতঃপর, বিষয়টির উপর সংসদে আলোচনার ব্যবস্থা করা যেত। তবে, ভক্তদের পক্ষ থেকে জেনারেল চৌহানকে ট্রোল করার ব্যাপারটা ছিল জঘন্য। অবশ্য বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রকেও তারা ট্রোল করেছিল।
লাভ ও ক্ষতি
সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের নির্দেশ ছাড়া জেনারেল চৌহান কথাগুলি বলতে পারেন না। তিনি যা বলেছেন তা সহজ এবং স্পষ্টাস্পষ্টি। চৌহান বলেছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর লক্ষ্যপূরণ হলেও তারা কিছু ক্ষতিরও সম্মুখীন হয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন যে ৭ মে কৌশলগত কিছু ভুল (ট্যাকটিক্যাল মিসটেকস) হয়ে গিয়েছিল। এজন্য সশস্ত্র বাহিনীর লিডাররা কৌশল পাল্টে নিয়েছিলেন। এবং, সেইমতো ৯-১০ মে রাতে পাকিস্তানের সামরিক বিমানঘাঁটিগুলি তাক করে নতুন আক্রমণ শুরু করেছিল ভারত। সিডিএস ক্ষতির পরিমাণটা জানাননি। তবে স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া ক্ষতির পরিমাণ জানাতে গিয়ে পাঁচটি বিমানের উল্লেখ করেছেন। তার ভিতরে রয়েছে তিনটি রাফাল, একটি সুখোই এবং একটি এমআইজি।
‘কৌশলগত ভুল’ এবং ‘ক্ষতির’ বিষয়টির গভীর এবং বিচক্ষণ বিশ্লেষণের প্রয়োজন। আর সেটা হওয়া দরকার সামরিক বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে। ভাসা ভাসা কিছু কথা নিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় হইচই বিতর্ক ইত্যাদি কাম্য নয়। পাবলিক ডোমেইনে পাওয়া তথ্যাদি (তার কিছু যাচাই করা হয়েছে এবং কিছু যাচাই করা নয়) থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি স্পষ্ট:
• ৭ মে ভোরের দিকে ভারতীয় বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলি প্রথম অগ্রসর হওয়ার সুবিধা পেয়েছিল। পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলির নয়টি প্রধান ঘাঁটি পুরো ধ্বংস করা হয়েছে অথবা সেগুলির মারাত্মক ক্ষতি করে দেওয়া হয়েছে।
• প্রত্যাঘাতের জন্য পাকিস্তান ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ৮ মে। একাধিক টার্গেট স্থির করে কাউন্টার-অ্যাটাকের জন্য ওরা ড্রোন পাঠিয়েছিল। পাকিস্তানও গাইডেড মিসাইল মোতায়েন করেছিল। ভারতীয় বিমান ধ্বংস হয়েছিল ৮ মে। সিডিএসের পরবর্তীকালের (৪ জুন পুনেতে) মন্তব্য থেকে মনে হয় যে, ভারতীয় বিমান ভারতীয় আকাশসীমাতেই ধ্বংস হয়েছিল। অন্য বিমানগুলি ভূপাতিত হয়েছিল ৮ ও ৯ মে।
• কৌশল নতুনভাবে সাজাবার পর, ৯-১০ মে ভারতীয় বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন মোতায়েন করা হয় (সিডিএস ১০ মে বলেছেন)। ভারতীয় বিমানগুলি ভারতীয় আকাশসীমার মধ্যে থেকেই ব্রহ্মস-সহ বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। সেগুলি আঘাত হেনেছিল পাকিস্তানের ১১টি সামরিক বিমান ঘাঁটিতে।
• যুদ্ধ থামল ১০ মে।
চীনের প্রক্সি যুদ্ধ
একজন অপেশাদার সামরিক বিশ্লেষকদের ভূমিকা পালন করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। একটি নতুন পরিস্থিতিতে ভারত নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে, এই বিষয়টি তুলে ধরাই লেখাটির লক্ষ্য। এই ঘটনায় মোটামুটিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে যে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা এবং প্রত্যাঘাত কৌশলে চীনা বিমান (জে-১০), চীনা ক্ষেপণাস্ত্র (পিএল-১৫) এবং চাইনিজ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সর্বাত্মক ভূমিকা নিয়েছিল। চীনা বিমান চালিয়েছিলেন পাকিস্তানি পাইলটরা। চীনা ক্ষেপণাস্ত্রের ট্রিগারে ছিল পাকিস্তানিদেরই আঙুল। চীনের সেনানায়করা যেমন যেমন কৌশলগত পরিকল্পনা ছকে দিয়েছিলেন পাকিস্তানিরা তার বাস্তবায়নও করেছিল সেইমতো। তাছাড়া চীনা উপগ্রহ এবং চীনা এআই পাকিস্তানকে পরিচালনা করেছিল বলেই মনে হচ্ছে। সংক্ষেপে এটাই দাঁড়াচ্ছে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের মিলিটারি হার্ডওয়্যার কেমন কাজ করে সেই পরীক্ষাটাও সেরে নিলে চীন। আমার মনে হচ্ছে, বস্তুত পাকিস্তানকে সামনে রেখে ভারতের বিরুদ্ধে একটি প্রক্সি যুদ্ধ করার সুযোগের সদ্ব্যবহার করল দেশটি।
বিষয়টি আমাদের পরবর্তী প্রধান সমস্যার প্রতি আলোকপাত করে। এই আমূল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তিন-দফা মতবাদ কতটা প্রাসঙ্গিক এবং কার্যকর? এই মতবাদটি বলে যে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। আর নয়। এখন এটা স্পষ্ট যে ভারতের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত যুদ্ধ করবে এবং তখন আমাদের ‘এক’ প্রতিপক্ষে পরিণত হবে চীন। ‘ওয়ান-ফ্রন্ট ওয়ার’ অথবা ‘টু-ফ্রন্ট ওয়ার’-এর উপর ভিত্তি করে ভারতের যুদ্ধ প্রস্তুতির দিন শেষ, ভবিষ্যতের যেকোনও যুদ্ধই হবে একটি ‘ফিউজড-ফ্রন্ট ওয়ার’।
মোদিজির তিন-দফা মতবাদের প্রথম নীতি হল, প্রতিটি সন্ত্রাসবাদী হামলার মোক্ষম জবাব দেওয়া হবে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর তরফে ক্রস-বর্ডার গোপন আক্রমণ (উরির ঘটনার জবাবে) অথবা ভারতীয় বিমান বাহিনীর একক বিমান হামলা (পাঠানকোট কাণ্ডের প্রত্যুত্তরে) কোনও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ ছিল না। অতএব, পহেলগাঁওয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল চারদিনের যুদ্ধ। সন্ত্রাসবাদী হামলা যদি বন্ধ না-হয়, তাহলে তারপর কী করা হবে—একটি দীর্ঘ এবং ভয়াবহ যুদ্ধ? নাকি যুদ্ধটি চলবে একটি ফিউজড ফ্রন্টের বিরুদ্ধে?
বিদেশ ও সামরিক নীতি
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের যে বিদেশ নীতি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা যথেষ্ট বা যথাযথ নয় বলেই প্রমাণিত হয়েছে। ভারতের বিরোধিতা সত্ত্বেও, গত ৯ মে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ) পাকিস্তানকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুমোদন করেছে। এই বিপুল অর্থ দেওয়া হয়েছে এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফেসিলিটির (ইএফএফ) অধীনে। তার ফলে পাকিস্তানের হাতে পৌঁছচ্ছে মোট ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরপর, ৩ জুন এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কও (এডিবি) পাকিস্তানকে ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে। সম্প্রতি, বিশ্বব্যাঙ্ক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পাকিস্তানকে তারা ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেবে এবং তা দেওয়া হবে দীর্ঘ দশ বছরের জন্য! ভারত বিরোধী এই সিদ্ধান্তগুলিতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন দুই দেশের অবস্থান ছিল একই পক্ষে। সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা এই যে, রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) তালিবান নিষেধাজ্ঞা কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে পাকিস্তান। এখানেই শেষ নয়, ইউএনএসসি সন্ত্রাস দমন কমিটিরও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে আমাদের এই পড়শি দেশটি (সূত্র: পবন খেরা, চেয়ারম্যান, এআইসিসি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্ট)।
এই সমস্ত ঘটনা ঘটে গিয়েছে ‘অপারেশন সিন্দুর’ চলাকালে এবং তারপর যখন আমাদের এমপিদের প্রতিনিধি দলগুলি নানা দেশে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিচ্ছিল। প্রতিটি দেশ সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করেছে, আমি যতদূর জানতে পেরেছি, কিন্তু কোনও দেশই পাকিস্তানের নিন্দা করেনি।
যেমনটি আমি গত সপ্তাহে লিখেছিলাম, ভারতের সামরিক কৌশল এবং বিদেশ নীতি ঢেলে সাজার সময় এসেছে। আর এটা করতে হবে ক্ষুরধার এবং প্রত্যুৎপন্ন মন মানসিকতা নিয়ে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত