বাজি আমাদের আনন্দ দেয়। কিন্তু বাজি থেকে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাও থাকে। কী কী সাবধানতা মেনে বাজি পোড়াবেন? জানালেন ত্বক বিশেষজ্ঞ ডাঃ কৌশিক লাহিড়ী।
চতুর্দশ শতাব্দীর পর যখন ভারতে যুদ্ধের কাজে বারুদের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে, তখন থেকেই আতশবাজির প্রচলন শুরু হয়। মুঘল সম্রাটদের আমলে রাজকীয় উৎসব, বিবাহ এবং জয়ের আনন্দে আতশবাজির প্রদর্শনী করা হত। কালীপুজো ও দীপাবলির সঙ্গে বাজির সম্পর্ক বহু দিনের। উনিশ শতকে কলকাতার বাবুদের মধ্যে জাঁকজমকের সঙ্গে কালীপুজো পালন ও বাজি পোড়ানোর চল বেশ জনপ্রিয় ছিল। অমাবস্যা থাকায় কালীপুজোয় আলোর বাজি পুড়িয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ করা হত। অমাবস্যার কালো অন্ধকারকে যাতে এই বাজির আলো দূর করতে পারে সেই উদ্দেশ্যেই এই বাজি পোড়ানোর রীতি বহু দিনের। এক সময় মানুষ বিশ্বাস করত, কালীপুজোয় প্রদীপ ও আলো জ্বালিয়ে মন্দ শক্তিকে দূর করা সম্ভব। তারপর বাজিও প্রদীপের আলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। আলোর বাজিই প্রধানত গুরুত্ব পেত, ধীরে ধীরে শব্দবাজি সকলের মনে জায়গা করে নেয়। কিন্তু শব্দবাজির ক্ষতিও প্রবল। এর দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় পুলিশের তরফ থেকে গত কয়েক বছর হল বন্ধ রাখার নির্দেশিকাও জারি হয়েছে।
রাত পোহালেই আলোর উৎসবে মেতে উঠবেন আট থেকে আশি সকলেই। দুর্গাপুজো, দীপাবলি ও কালীপুজো মানেই আনন্দ, আলো, উৎসব আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই বাজি ও আতশবাজি থেকে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। ত্বকের পোড়া ক্ষত, চোখের গুরুতর আঘাত, শ্বাসকষ্ট, শ্রবণশক্তির ক্ষতি এবং অগ্নিকাণ্ড হতে পারে। সামান্য অসাবধানতা ডেকে আনতে পারে বড়ো বিপদ। বাজি আমাদের খুবই আনন্দ দেয়, কিন্তু প্রত্যেক বছরই বাজির কারণে কোথাও না কোথাও ছোটো থেকে বড়ো কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। শিশুদের বোঝার ক্ষমতা বড়োদের মতো নয়। তাই তাদের মতো করে বুঝিয়ে বলতে হবে, এই সময় কী কী করণীয় এবং কোনটা করা উচিত নয়। তাহলেই আলোর উৎসবে সকলের ভালো কাটবে।
ত্বক বিশেষজ্ঞ ডাঃ কৌশিক লাহিড়ী জানালেন, আলোর উৎসবে আমাদের ত্বক নানা ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে, বাজি তৈরিতে নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়। যা ত্বকের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ওইসব রাসায়নিক আমাদের ত্বককে শুষ্ক করে দেয়। তাই সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। বাজির আগুনে ত্বকের ক্ষতি শুধু সাময়িক জ্বালা বা লালচে ভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গভীর ক্ষত থেকে স্থায়ী দাগ, ত্বকের রঙের পরিবর্তন হতে পারে। তাই উৎসবের আনন্দ উপভোগ করুন, কিন্তু নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করবেন না।
১) সুতির পোশাককে অগ্রাধিকার: সুতির পোশাককেই দীপাবলিতে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রেও তাই। ঢিলেঢালা পোশাকের বদলে শরীরের সঙ্গে মানানসই সুতির পোশাক পরুন। নাইলন, পলিয়েস্টার বা সহজে গলে যায় এমন সিন্থেটিক পোশাক এড়িয়ে চলুন। বাচ্চা যেন জুতো পড়েই বাজি পোড়ায় সেইদিকে বড়োদের লক্ষ রাখতে হবে। বাজি পোড়ানোর কাছাকাছি জায়গায় একটা জলের বালতি রাখুন যাতে বাজি পোড়ানোর পর ওই বালতিতে বাচ্চারা ফেলে দিতে পারে।
২) শিশুদের ক্ষেত্রে কী কী করণীয়: শিশুদের জন্য বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন। বাজি পোড়ানোর সময় শিশুদের হাতে বাজি দিয়ে চলে আসবেন না। প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো শিশুকেই বাজি জ্বালাতে দেবেন না। সবচেয়ে নিরাপদ হল শিশুদের বাজি না ধরতে দিয়ে দূর থেকে দেখানো। শিশুরা যাতে কোনোভাবেই পুড়ে না যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি, কারণ তারা বাজির তাপ, আগুনের গতি এবং বিস্ফোরণের বিপদ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নয়। খুব ছোটো শিশুদের হাতে বাজি দেবেন না। ফুলঝুরির মতো বাজিও বিপজ্জনক। ফুলঝুরির ধাতব তার ও জ্বলন্ত অংশ থেকে হাত, আঙুল, মুখ ও চোখে গুরুতর পোড়া ক্ষত হতে পারে। শিশুকে বাজি হাতে ধরে জ্বালানো, জ্বলন্ত বাজি ছুড়ে দেওয়া বা জ্বলে না ওঠা বাজির কাছে গিয়ে দেখা থেকে বিরত রাখুন। বাজি পকেটে রাখবেন না। বাজির বাক্স ও অব্যবহৃত বাজি শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন। আগুন লাগলে কী করতে হবে, তা আগে থেকেই বুঝিয়ে দিন।
৩) বড়োদের ক্ষেত্রে কী কী করণীয়: প্রাপ্তবয়স্করা অনেকেই ভাবেন, দীর্ঘদিন বাজি ফাটানোর অভিজ্ঞতা থাকায় তাঁদের বিপদের আশঙ্কা কম। বাস্তবে অসাবধানতা, তাড়াহুড়ো এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বাজি কখনো হাতে ধরে জ্বালাবেন না। বাজি হাতে নিয়ে পোড়ানোকে অনেকেই বাহাদুরি বলে মনে করেন। বাজি পোড়ানোর পর ভালো করে হাত ধোবেন। নাহলে অ্যালার্জি হতে পারে। মোমবাতি বা প্রদীপ থেকে বাজি পোড়াতে গিয়ে অনেক সময়ই জামাকাপড়ে আগুন ধরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। সেই অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে জল দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করুন। অযথা ছোটাছুটি করবেন না, তাতে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়বে। একান্তই জল না পেলে ভারী কম্বল বা ভারী কাপড় চাপা দিতে হবে। হাতে ফোস্কা পড়লে অনেকেই সেটা ফাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে বিপদ বাড়ে। বাজি জ্বালানোর সময় মুখ বা শরীর তার উপরে ঝুঁকিয়ে রাখবেন না। বাজি ফাটানোর সময় ধূমপান, মদ্যপান বা মাদকজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করবেন না। জ্বলন্ত প্রদীপ, মোমবাতি ও অন্য কোনো আগুনের উৎস থেকে বাজি দূরে রাখুন। হার্টের অসুখ, হাঁপানি বা দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ থাকলে ধোঁয়া ও উচ্চ শব্দের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। বয়স্ক ব্যক্তিদের পাশাপাশি গর্ভবতী মহিলা, শিশু এবং শব্দে সংবেদনশীল ব্যক্তিদেরও উচ্চ শব্দ ও ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা উচিত।
৪) ত্বকের যত্ন: বাজি পোড়ানোর আগে ভালো ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে পারেন।
৫) নিয়ম মেনে কেনা: লাইসেন্স আছে এমন দোকানকেই বাজি কেনার জন্য বাছুন। খুব সস্তার বাজি কিনবেন না। দোকানের লাইসেন্স প্রয়োজনে দেখে তবেই সেখান থেকে বাজি কিনুন।
৬) ফাঁকা জায়গায় বাজি পোড়ান: অনেক বাজি একসঙ্গে মজুত রয়েছে এমন স্থানে বাজি পোড়াবেন না, তাহলে কোনোভাবে বাজির আগুনের ফুলকি চলে গেলে বাকি বাজিতে আগুন ধরে যেতে পারে।
৭) হাতের নাগালে ফার্স্ট এড বক্স: বার্নল, ডেটল জাতীয় জিনিস মজুত রাখুন। শরীরের কোনো অংশ পুড়ে গেলে অন্তত ১০ মিনিট বরফ দিন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শিশুর চোখ জ্বালা করলে প্রথমে জল দেবেন। চোখের ড্রপ দিতে পারেন। অত্যধিক পুড়ে গেলে বা খুব স্পর্শকাতর স্থান ঝলসে গেলে কখনোই বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করানো উচিত নয়। প্রথম অবস্থায় বোঝা না গেলেও ঘা শুকানোর সময় এতে ঝুঁকি বাড়ে। পোড়ার ক্ষতটা কীরকম সেটা প্রথমে বুঝতে হবে, মাইল্ড, মডারেট, না সিভিয়র বার্ন। সেই মতো শুরু হবে চিকিৎসা। অনেক সময় শুধু উপরের ত্বক পুড়ে যায়। সেক্ষেত্রে জল বা বরফ দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করা যায়। তবে চামড়ার নীচের অংশ পুড়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই প্রয়োজন।
বাজিতে পুড়ে গেলে কী করবেন?
• সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রথম ২০ মিনিটের যত্ন। কলের ঠান্ডা জল ঢালুন। পোড়া জায়গায় অবিলম্বে পরিষ্কার, ঠান্ডা (বরফ-ঠান্ডা নয়) জল প্রায় ২০ মিনিট দিন। এতে তাপজনিত ক্ষতি কমতে পারে।
• গয়না ও আঁটোসাঁটো জিনিস খুলুন। হাত ফুলে যাওয়ার আগে আংটি, ঘড়ি বা আঁটোসাঁটো অলংকার খুলে দিন।
• ত্বকে লেগে থাকা পোশাক টান দিয়ে তুলবেন না। পরিষ্কারভাবে ঢেকে রাখুন। ক্ষতে আটকে যায় না এমন ড্রেসিং বা পরিষ্কার কাপড় আলতো করে দিন। প্রয়োজনে হাসপাতালে যান। ক্ষত গভীর হলে, ফোসকা পড়লে, মুখ বা হাত পুড়লে কিংবা ব্যথা তীব্র হলে চিকিৎসা নিন।
কী করবেন না?
• টুথপেস্ট, মাখন, ঘি, তেল বা হলুদ লাগাবেন না। এগুলি ক্ষতকে দূষিত করতে পারে এবং চিকিৎসকের পক্ষে ক্ষত পরীক্ষা করা কঠিন হতে পারে। সরাসরি বরফ লাগাবেন না। বরফ বা অতিরিক্ত ঠান্ডা জল ত্বকের ক্ষতি বাড়াতে পারে। ফোসকা ফাটাবেন না। ফোসকার উপরিভাগ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতকে সুরক্ষা দেয়। নিজে থেকে তা তুলে ফেলবেন না। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার করবেন না। ক্ষতের গভীরতা ও প্রকৃতি বুঝে চিকিৎসক চিকিৎসা নির্ধারণ করবেন।
কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কখন অবিলম্বে হাসপাতালে যাবেন সেটাও জানা জরুরি। চোখে বাজির কণা ঢোকা, ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে যান। শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে ঢোকার পর কাশি ও শ্বাসের সমস্যা হলেও হাসপাতালে যাওয়া শ্রেয়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা গুরুতর অসুস্থ কারও উল্লেখযোগ্য ক্ষত তৈরি হলে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যান। চোখে আঘাত লাগলে চোখ ঘষবেন না। চোখে গেঁথে থাকা কণা নিজে বার করার চেষ্টা করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বাজির ধোঁয়ায় হাঁপানি, অ্যালার্জি বা দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগের উপসর্গ বাড়তে পারে। বাজির শব্দ কানে আঘাত করতে পারে। পোষ্য প্রাণীদের ঘরের ভিতরে নিরাপদে রাখুন। আবাসনের ছাদ বা বারান্দায় বাজি ফাটালে আগুন পাশের বাড়ির বৈদ্যুতিক তার, পরদা বা গাড়িতে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাই এমন জায়গা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। আলোয় সাজুক উৎসব, আগুনে নয়। সতর্ক থেকে আনন্দ করুন।
অর্পিতা ঘোষ



