Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

চাঁদনি চকে ‘গুমঘর’, মৃত্যুর দিন গুনত নেটিভরা, ব্রিটিশ আমলেও কলকাতায় ছিল কোয়ারেন্টাইন সেন্টার

করোনার জন্য ‘কোয়ারেন্টাইন’ বিষয়টির সঙ্গে সবাই পরিচিত হয়ে গিয়েছে। অনেকে অবাক হবেন জানলে, ব্রিটিশ আমলেও কলকাতায় একটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার ছিল।

চাঁদনি চকে ‘গুমঘর’, মৃত্যুর দিন গুনত নেটিভরা, ব্রিটিশ আমলেও কলকাতায় ছিল কোয়ারেন্টাইন সেন্টার
  • ২ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অর্ক দে, কলকাতা: করোনার জন্য ‘কোয়ারেন্টাইন’ বিষয়টির সঙ্গে সবাই পরিচিত হয়ে গিয়েছে। অনেকে অবাক হবেন 

Advertisement

জানলে, ব্রিটিশ আমলেও কলকাতায় একটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার ছিল। সেখানেও সংক্রামক, মরণাপন্ন রোগীদের পাঠানো হতো। তখন অবশ্য সেটিকে কোয়ারেন্টাইন বলত না। বলা হতো ‘গুমঘর’। কলকাতার কোথায় রয়েছে সেই গুমঘর?
‘গুমঘর’ নামটির মধ্যেই কেমন একটা গা ছমছম করা ব্যাপার। অষ্টাদশ শতকের কলকাতা তখন যেন সাক্ষাৎ যমপুরী। চারিদিকে ছোঁয়াচে রোগের বাড়বাড়ন্ত। কলেরা, যক্ষ্মা, কী নেই! চিকিৎসা তখন উন্নত নয় মোটেই। অধিকাংশ নেটিভের ভরসা ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবচ। সম্পন্নরা খুব বেশি হলে কবিরাজি, হাকিমির দ্বারস্থ হন। ফলে অসুখে কথায় কথায় মানুষ মরছে। ব্রিটিশরা পড়ল মহা দুশ্চিন্তায়। যদি দলে দলে নেটিভ মরতে থাকে তাহলে খিদমত খাটবে কে? ফলে চিকিৎসা শুরুর ব্যবস্থা করল। কিন্তু সাদা চামড়ার সঙ্গে তো হাসপাতালে নেটিভদের রাখা যাবে না, তাই ১৭৯২ সালে কলুটোলায় (আজকের চিৎপুর) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নেটিভ কর্মীদের জন্য তৈরি হল আলাদা একটি হাসপাতাল। নাম, ‘নেটিভ হসপিটাল’। তারপর আরও একটিু খোলামেলা বাড়িতে স্থানান্তরিত করতে ঠিকানা বদল। ১৭৯৬ সালে নয়া বাড়ি হল ধর্মতলার কাছে। এখনকার চাঁদনি চকে। আর হাসপাতাল বিল্ডিংয়ের উত্তর দিকের সঙ্কীর্ণ, মাত্র ৩০০ মিটার দৈর্ঘের একটি গলির একটি বাড়ি হয়ে উঠল গুমঘর। সংক্রমণ মারাত্মক আকার নিলে রোগীদের মূল হাসপাতাল থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো গুমঘরে। সেখানে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু। সম্ভবত গুম হয়ে যেত বলেই মানুষের মুখে গলির নাম হয়ে গেল ‘গুমঘর লেন’। গলিটি এখনও এই সোয়া দুশো বছর পরও একইরকম স্যাঁৎসেঁতে, গা ছমছমে। ঠিক কোন বাড়িটিতে ছিল গুমঘর বা কোয়ারেন্টাইন সেন্টারটি তা জানা যায় না। টানা ৭৮ বছর সেটি চলেছিল। সেখানে কতশত নেটিভ যে গুম হয়েছেন তা ইতিহাসের গর্ভে গা ঢাকা দিয়েছে। সঠিক হিসেব গুম করেই দেশ ছেড়েছে ব্রিটিশরা।  মধ্য কলকাতার চাঁদনি চক। কলকাতার অন্যতম ব্যবসাস্থল। তার এক প্রান্তে এই গলি। এর একদিকে গণেশ চন্দ্র অ্যাভিনিউ, অন্যদিকে টেম্পল স্ট্রিট। এখন কয়েকটি ভাঙাচোরা বাড়ি কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে। অপরিসর রাস্তায় কোনওরকমে খাড়া রয়েছে পুরনো ইমারতগুলি। বেশিরভাগেরই ভগ্নদশা। শ্যাওলা জমেছে দেওয়ালে। আছে কয়েকটি দোকান। অন্ধকার ঘুপচি ঘরগুলি। হাতে গোনা কিছু মানুষ বসবাস করেন। গলির গা ছমছমে ভাবটি দিনেদুপুরেও দিব্যি টের পাওয়া যায়।  ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেটের ১৯১৯ সালের মে মাসের সংখ্যা দেখলে জানা যায়, ধর্মতলা থেকে নেটিভ হাসপাতালটি চলে এসেছিল গঙ্গার ঘাটে স্ট্র্যান্ড রোডে। উদ্যোগ নিয়েছিলেন হাসপাতালের সার্জিয়ন মেজর এন সি ম্যাকনামারা। তিনি ম্যাকিনটস বার্নের দলবলের সঙ্গে হাজির হয়েছিলেন গঙ্গার ঘাটে। আবর্জনাপূর্ণ জমি সাফ করে হাসপাতাল তৈরি শুরু। ১৮৭৩ সালে লর্ড নর্থব্রুক প্রথম ইটখানি গেঁথেছিলেন। হাসপাতাল তৈরির জন্য টাকা সংগ্রহ শুরু হয়। মেয়ো মেমোরিয়াল কমিটি দিয়েছিল ৫০ হাজার টাকা। তাঁদের শর্তেই নাম বদলে হয়েছিল, ‘মেয়ো নেটিভ হাসপাতাল’। একসময় সেটিতে তালাও পড়ে যায়। গুমঘর লেনে যাঁরা আজ কাজে যান তাঁরা বলেন, কত মানুষ অপঘাতে মরেছে এই গলিতে তার হিসেব নেই। তাঁদের বিদেহী আত্মা এখনও ঘুরে বেড়ায় বাড়িগুলির মধ্যে। নিঝুম দুপুরে গা ছমছম করে। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ