বিশ্বজিৎ দাস. কলকাতা: ঘটনা ১: বিধাননগর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে বছর তিনেকের বাচ্চাটিকে। পড়ে গিয়ে মারাত্মক চোট পেয়েছে পায়ে। চিকিৎসা শুরু করতে হবে এখনই। কিন্তু হাসপাতাল প্রথমেই চেয়ে বসল আধার কার্ড। মহিষবাথান থেকে আসা বাচ্চাটির আধার কার্ডই যে এখনও হয়নি! কর্তব্যরত কর্মী জানিয়ে দিলেন, আগের মতো বার্থ সার্টিফিকেট বা মা-বাবার আধার দেখালে চলবে না। অগত্যা যন্ত্রণায় ছটফট করা বাচ্চাটিকে নিয়ে শুরু হল ছোটাছুটি।
ঘটনা ২: বয়স্ক মহিলাকে একেবারে স্বাস্থ্যভবনে পাঠিয়েছে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাত ভেঙেছে বৃদ্ধার। তাঁর ক্ষেত্রেও বিধি বাম! আভা আইডি তৈরি করতে হবে। তাই লাগবে আধার কার্ড। না হলে চিকিৎসা শুরু করাই মুশকিল। অবশেষে খোদ স্বাস্থ্যভবনের হস্তক্ষেপে তিনি ভরতি হতে পারলেন ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে।
সরকারি হোক বা প্রাইভেট হাসপাতাল—দেশজুড়ে বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে ‘আয়ুষ্মান ভারত হেলথ অ্যাকাউন্ট’ বা ‘আভা’ আইডি। সরকারের দাবি, নাগরিকের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সব তথ্য এক জায়গায় রাখতে এবং ‘পেপারলেস’ সুবিধা দিতেই এই ব্যবস্থা। রাজ্যেও জোরকদমে আইডি তৈরি চলছে। আর তা করতে গিয়ে সরকারি হাসপাতালে ভোগান্তির একশেষ হতে হচ্ছে রোগী ও তাঁদের পরিজনকে। মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি এমন হচ্ছে যে রোগীর প্রাণ সংশয়ের উপক্রম হচ্ছে। কারণ, হাসপাতাল থেকে সাফ বলে দেওয়া হচ্ছে, আগে আইডি, তারপর চিকিৎসা!
১৪ জুলাই রাজ্য জানায়, সরকারি হাসপাতালের আউটডোর, ইনডোর, ফার্মেসি, ন্যায্য মূল্যের রোগ পরীক্ষাকেন্দ্র, স্বাস্থ্যসাথী সর্বত্র রোগীর তথ্যে তাঁর ‘আভা’ আইডি উল্লেখ করতেই হবে। ইমার্জেন্সি রোগীর ক্ষেত্রে অবশ্য আগে পরিষেবা, তারপর আইডি করতে হবে বলে নির্দেশে জানান স্বাস্থ্যসচিব। কিন্তু বাস্তবে তা নির্দেশেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছে। ‘আভা’ নিয়ে রোজ ভোগান্তি চলছে বিভিন্ন হাসপাতালে। কারণ, এই আইডি করতে লাগবে আধার কার্ড। তাই আধার সঙ্গে না থাকলে দুর্ঘটনায় গুরুতর চোট পাওয়া কেউ, এমনকি শিশুদেরও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। কারণ, স্বাস্থ্যভবনের রোগী সংক্রান্ত পোর্টালে ‘আভা’ আইডি ছাড়া এখন কোনো রোগীকে ভরতিই করা যাবে না। সদ্য নয়া নিয়ম চালু হয়েছে আউটডোরেও। বহু ক্ষেত্রে ডেটা এন্ট্রি অপারেটররা ভিড়ের চাপে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে রোগীর আধার নম্বর বা নাম ভুল এন্ট্রি করছেন। তখন শুরু হচ্ছে আরেক দফা সমস্যা।
দপ্তর সূত্রে খবর, রাজ্যের অধিকাংশ বড়ো সরকারি হাসপাতালে ইমার্জেন্সি ডিজিটাল এক্স রে, এমআরআই, সিটি স্ক্যান (ন্যায্য মূল্যে রোগ পরীক্ষা) পরিচালিত হয় পিপিপি মোডে। সাম্প্রতিক নির্দেশে তাদের জানানো হয়েছে, রোগী আধার বা ‘আভা’ আইডি না দিলে পোর্টালে তাঁকে মান্যতা দেওয়া হবে না। এদিকে ট্রমা ও জেনারেল ইমার্জেন্সি রোগীর চিকিৎসা রোগপরীক্ষা নির্ভর। ফলে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হচ্ছে। শহরের একটি বড়ো মেডিকেল কলেজের পিপিপি মডেলে চলা এমআরআই-সিটি স্ক্যান পরিষেবা সংস্থার ডিরেক্টর বলেন, ‘এই নিয়ম না মানলে স্বাস্থ্যভবন আমাদের বিল আটকে দিচ্ছে। আধার ছাড়া ইমার্জেন্সি রোগীর সিটি, এমআরআই করায় আমাদের ২০০ বিল আটকে দেওয়া হয়েছে। ওঁরা বলছেন, দিনে যত রোগ পরীক্ষা হবে, তার বড়োজোর ৫ শতাংশ আধার ছাড়া হতে পারে। বেশি হলেই আটকে দেবে।’ দিন দুয়েক আগে পিপিপি মডেলের কেন্দ্রগুলির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্বাস্থ্যভবনের বৈঠকেও প্রসঙ্গটি ওঠে। সমস্যা কিন্তু মেটেনি। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম বলেন, ‘আভা আইডি করতেই হবে। সরকারি নির্দেশ। রোগীদের সমস্যা হচ্ছে কি না, খোঁজ নেব।’