Bartaman Logo
৩০ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বলি হওয়ার গ্যারান্টি!

বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম একলপ্তে রেকর্ড পরিমাণ বাড়িয়ে কেন্দ্রের মোদি সরকার আরও একবার বুঝিয়ে দিল, সরকার যেকোনো সমস্যায় (ক্রাইসিস) পড়লে হাড়িকাঠে বলি দেওয়ার জন্য দেশের আম জনতাকেই বেছে নেওয়া হবে! পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারির শেষে।

বলি হওয়ার গ্যারান্টি!
  • ৩ মে, ২০২৬ ০৪:০০

বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম একলপ্তে রেকর্ড পরিমাণ বাড়িয়ে কেন্দ্রের মোদি সরকার আরও একবার বুঝিয়ে দিল, সরকার যেকোনো সমস্যায় (ক্রাইসিস) পড়লে হাড়িকাঠে বলি দেওয়ার জন্য দেশের আম জনতাকেই বেছে নেওয়া হবে! পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারির শেষে। এই কারণে ইরানের হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। যেহেতু জ্বালানি পরিবহণের সিংহভাগ এই রুটেই হয়, তাই ভারতসহ তামাম দুনিয়া সংকটে পড়েছে। তা সত্ত্বেও ভারত প্রথম থেকেই দাবি করে এসেছিল, দেশে যথেষ্ট পরিমাণে তেল ও গ্যাস মজুত রয়েছে। কিন্তু এসব যে নেহাতই কথার কথা ছিল মোদি সরকারের আচরণেই তা প্রকট। দেখা যাচ্ছে, জানুয়ারিতে ৪৯.৫০ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ৩১ টাকা, মার্চে ১১৪.৫০ টাকা, এপ্রিলে ২১৮ টাকা এবং ১ মে থেকে আরও ৯৪৩ টাকা বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে কেন্দ্র। বর্তমানে ১৯.৫ কেজির একটি বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বেড়ে হয়েছে ৩২০২ টাকা। চার মাসে ৮১ শতাংশ বৃদ্ধি! দাম বেড়েছে অটো-এলপিজিরও। চার মাসে ৩৭ টাকা ৭৫ পয়সা। বর্তমানে এই দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ৯০ টাকা। এপ্রিল মাসে দেশের পাঁচ রাজ্যে বিধানসভার ভোট হয়েছে। সরকারি সূত্রেই খবর, এবার গৃহস্থ বাড়ির রান্নার গ্যাসের দাম আরও একধাপ বাড়ার আশঙ্কা। পেট্রল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিও স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। কে না জানে পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়ার দরুন জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। কোপ পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটে। তাই আশঙ্কায় রয়েছেন আম জনতা।

Advertisement

বিশেষজ্ঞদের একাংশের ব্যাখ্যা হল, যুদ্ধ শুরুর সময় হরমুজ প্রণালীতে গ্যাস ও তেলের অনেক ট্যাঙ্কার ছিল। প্রণালী দিয়ে পরিবহণ বন্ধ হয়ে গেলেও গ্যাসের কিছু ট্যাঙ্কার আসতে পেরেছে। কিন্তু এপ্রিল মাসে কার্যত যাবতীয় চলাচল বন্ধ থাকে। ফলে জ্বালানি আমদানি অর্ধেক নেমে আসে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় শোধনাগারগুলি এলপিজি গ্যাস উৎপাদন ২৫-৩০ শতাংশ বাড়ালেও ঘাটতি অনেকটাই থেকে যায়। ঘাটতি মেটাতে আমেরিকা থেকে এলপিজি গ্যাস আনার চেষ্টা করছে ভারত। কিন্তু তা যেমন খরচসাপেক্ষ, তেমনই সময়সাপেক্ষও। তাই আপাতত গৃহস্থকে রেহাই দিয়ে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়িয়ে ভারসাম্য রাখতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। পরিস্থিতি অনেকটা যেন, জল মাথার উপর দিয়ে বইছে। কিন্তু ঘটনা হল, বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়লেও শেষ বিচারে বিপদে পড়ছেন সেই সাধারণ মানুষই। দেখা যাচ্ছে, গ্যাসের দামের বর্ধিত খরচ বহন করতে পারবে না বলে বহু খাবার ও ফাস্ট ফুডের ছোটো দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আবার গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে প্রায় প্রতিটি খাবারের দাম বাড়বে। এর ধাক্কা পড়বে তাঁদের পকেটে, যাঁরা নানা কারণে রাস্তার দোকানে খেতে বাধ্য হন। অনেকে আবার কয়লার উনুনে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য, গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের দাম মার্চ মাসে সিলিন্ডার পিছু ৬০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। আরও একদফা দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রবল। এবার সিলিন্ডার পিছু ১০০ টাকা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। যা নাকি ভোটে প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় এতদিন থমকে রয়েছে। 
সরকারের একটি মহলের দাবি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ লাগার পরে বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম পৌঁছেছিল ব্যারেল প্রতি ১৩০ ডলারে। তার ধাক্কায় ভারতে পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ে চার বছর আগে। বৃহস্পতিবার ফের তেলের দাম পৌঁছেছে ১২৬ ডলারে। সুতরাং চলতি মাসেই লিটার পিছু ১০-২০ টাকা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সিদ্ধান্ত একরকম নাকি পাকা। কারণ তেল সংস্থাগুলি পেট্রলে লিটারে ২০ টাকা এবং ডিজেলে ১০০ টাকা করে লোকসান গুনছে বলে গাওনা গেয়েছে। বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম ক্রমাগত বেড়ে চলায় লোকসানের বহরও বেড়ে চলেছে, যা তাদের পক্ষে আর টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কেন্দ্র এতদিন ভোটের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি ঠেকিয়ে রাখলেও এখন নাকি দাম বাড়ানোয় সম্মতি দিতে প্রস্তুত। সন্দেহ নেই, তেমনটা হলে আম জনতার উপর ত্রিমুখী আক্রমণ নেমে আসবে। বাণিজ্যিক গ্যাস, রান্নার গ্যাস এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাজারে যে আগুন লাগবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন উঠেছে, অশোধিত তেলের দাম বেড়েছে বলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে। তাহলে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন অনেকটাই কম ছিল, যার কারণে মোদি সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা করেছে—তখন কেন দেশের পেট্রল, ডিজেলের দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষকে সুরাহা দেওয়ার কথা ভাবা হয়নি? কেনই বা মানুষকে একটু স্বস্তি দিতে এখন ভরতুকি দেওয়ার কথা ভাববে না কেন্দ্র? আসলে এই জমানায় সাধারণ মানুষকে বলির পাঁঠা করাটাই একমাত্র মোদির ‘গ্যারান্টি’! 

সম্পর্কিত সংবাদ