Bartaman Logo
৩০ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘গ্যারান্টি’ না জুমলা?

বিজেপির কাছে ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোট কি তবে ‘এবার না হলে নেভার’-এর মতো মরণবাঁচন লড়াই? প্রশ্নটা মনে আসা সংগত।

‘গ্যারান্টি’ না জুমলা?
  • ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০

বিজেপির কাছে ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোট কি তবে ‘এবার না হলে নেভার’-এর মতো মরণবাঁচন লড়াই? প্রশ্নটা মনে আসা সংগত। কারণ, গোটা দেশের কাজকর্মকে মোটামুটি শিকেয় তুলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেভাবে এরাজ্যে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছেন তাতে মনে হতে পারে, তাঁদের কাছে বঙ্গ দখলের বোধহয় এই শেষ সুযোগ এসে উপস্থিত হয়েছে! তাঁদের দোসর অন্তত শতাধিক মন্ত্রী-নেতা, যাঁরা গত দু’তিন সপ্তাহ ধরে এরাজ্যে ‘ডেইলি প্যাসেঞ্জারি’ করছেন। দৈনিক তিন-চারটি করে জনসভা, রোড-শো, মন্দিরে গিয়ে পুজো দেওয়া, রাত্রিযাপন, বৈঠক— মোদি, শাহ যেন এখন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন, বঙ্গ বিজেপির স্থানীয় স্তরের নেতা! গত ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় রাজ্যের ১৫২টি কেন্দ্রের ভোট হয়ে গিয়েছে। ভোটদানের হার ৯৩ শতাংশের বেশি। রাত পোহালে বুধবার, এরাজ্যের বাকি সাতটি জেলার ১৪২টি আসনে ভোট। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে এই ১৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূলের দখলে ছিল ১২৩টি আসন। বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ১৮টি আসন। স্বভাবতই দক্ষিণবঙ্গের এই জেলাগুলির অতীত ফলাফল মোদি-শাহদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এবার তাই প্রথম দফার ভোটের দিন থেকেই আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন তাঁরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে পরাজিত পুরুর দশা হতে পারে জেনেও পরাজয়ের আগে হার মানতে নারাজ বিজেপির এই দুই প্রধান সেনাপতি। কারণ, তাঁদের একের পর এক রাজ্য দখলের বিজয় রথের চাকা যে এই বাংলাতেই এসে মাটিতে বসে গিয়েছে বারবার। 

Advertisement

বিজেপির এই বঙ্গ-বিজয়ের যুদ্ধে যোগ্য সারথী যেন হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশন। এই সময়ে গলি থেকে রাজপথ যতদূর চোখ যায়, তাকালে মনে হবে কোনো যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি চলছে। সর্বত্র ভারী বুটের পদধ্বনি। মানুষ তটস্থ। আর এরাজ্যে ‘অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ নির্বাচনের স্বার্থে এ যেন পশ্চিমবঙ্গবাসীর একাংশের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে কমিশন! তাই যুদ্ধের প্রাক-প্রস্তুতি হিসাবে গত কয়েকমাস এই কমিশনের সৌজন্যে এসআইআর নামক বিভীষিকার সাক্ষী থেকেছেন বাংলার মানুষ। যেখানে ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখা বা নাম তোলার নামে আসলে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হয়েছে বৈধ অধিবাসীদের। এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ আবার ‘বৈধ নাগরিক’ হয়েও কমিশনের দেওয়া প্রশ্নপত্রের যথাযথ উত্তর দিতে না পেরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। মজার বিষয় হল, দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল বিজেপি, যারা কমিশনের এই তুঘলকি কর্মকাণ্ডে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। এসআইআর-এ লক্ষ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার ঘটনাকে তারা পশ্চিমবঙ্গ দখলের প্রথম ধাপ হিসাবে দিবাস্বপ্ন দেখেছে। বিজেপির লক্ষ্যপূরণে দ্বিতীয় ধাপে এখন দেখা যাচ্ছে নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনি! কী নেই তাতে! যুদ্ধের সাঁজোয়া গাড়ি থেকে সিসি ক্যামেরা, আড়াই লক্ষের কাছাকাছি আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ান থেকে ভিন রাজ্য থেকে আসা কয়েকশো পর্যবেক্ষক, বেপরোয়া ধরপাকড়, প্রজাসমজ্ঞানে মুহুর্মুহু অফিসার বদলি, পানের থেকে চুন খসলে কড়া শাস্তির দাওয়াই! বিরোধীদের মতে, এসআইআর থেকে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটাই লক্ষ্য হল, কেন্দ্রীয় শাসক দলকে ভোটের ময়দানে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কৌশল। 
এই প্রশাসনিক কৌশলের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি মিশেছে। যা ক্লিশে হয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতি। চলতি ভোটে মমতা সরকারের অনুকরণে (বলা যায় টুকে) জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে প্রতিশ্রুতি তো আছেই, তার সঙ্গে পাকা চাকরির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে ছাপার অক্ষরের সংকল্পপত্রে! কিন্তু মানুষের স্মৃতিকে দুর্বল মনে করে প্রধানমন্ত্রী আজও সেই প্রতিশ্রুতি বিলিয়ে চলেছেন, সাত বছর আগে (২০১৯-এ) হুবহু যা শোনা গিয়েছিল তাঁর মুখে! অঙ্ক বলছে, গত কয়েকটি নির্বাচনে রাজ্যের মতুয়া ও নমঃশূদ্র ভোটের একটা বড়ো অংশ গিয়েছিল বিজেপির ঝুলিতে। কারণটা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের আগে গাইঘাটার ঠাকুরনগরে দাঁড়িয়ে মোদি বলেছিলেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) কার্যকর করে মতুয়াদের নাগরিকত্বের অধিকার সুনিশ্চিত করা হবে। মতুয়ারা যাতে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের মতো সমস্ত অধিকার পান, তা সুনিশ্চিত করার গ্যারান্টি তাঁর। সাত বছর পর রবিবার সেই ঠাকুরনগরে দাঁড়িয়ে তাঁকে ফের বলতে শোনা গিয়েছে, ‘নাগরিকত্ব দেওয়া হবে, সমস্ত অধিকারও মিলবে। এটা মোদির গ্যারান্টি।’ ঘটনা হল, নাগরিকত্ব তো দূরের কথা, এসআইআর-এর দৌলতে শুধু বনগাঁ মহকুমাতেই ৮৫ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। স্বভাবতই পুনরায় মোদির ‘গ্যারান্টির’ আড়ালে প্রধানমন্ত্রী নতুন করে মতুয়াদের ভাঁওতা দিলেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। বেকারদের চাকরি থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব— সবেতেই মোদির ‘গ্যারান্টি’ বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা তো দূরঅস্ত, বঙ্গবাসীর কাছে তা হয়ে উঠেছে শাসকের ‘জুমলা’। তাই রাজনীতি সচেতন বাংলার মানুষের স্মৃতিকে দুর্বল ভেবে বঙ্গ দখলের উদ্দেশ্যে দেওয়া ‘গ্যারান্টি’র কৌশল আদৌ বাজিমাত করবে কি না তার উত্তর মিলবে ৪ মে, ভোটের ফল ঘোষণার পর। 

সম্পর্কিত সংবাদ