Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

জিএসটি: আদি পাপের সংশোধন মাত্র

প্রতিমাসে যে প্রবন্ধগুলির জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি তা হল আরবিআইয়ের মাসিক বুলেটিনে প্রকাশিত ‘স্টেট অফ দি ইকোনোমি’।

জিএসটি: আদি পাপের সংশোধন মাত্র
  • ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: প্রতিমাসে যে প্রবন্ধগুলির জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি তা হল আরবিআইয়ের মাসিক বুলেটিনে প্রকাশিত ‘স্টেট অফ দি ইকোনোমি’। এর শুরুতে একটি ‘সতর্কতা’ (ক্যাভিয়েট) থাকে, সেটা আমার পছন্দ নয়। এতে লেখা আছে, ‘ডেপুটি গভর্নর ডঃ পুনম গুপ্তের গাইডেন্স এবং মন্তব্য কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করা হচ্ছে...এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকদের নিজস্ব এবং এই মতামতের দায় ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের নয়।’ এটা কোনও গোপন বিষয় নয় যে গভর্নরের অনুমোদন ছাড়া আরবিআই বুলেটিনের একটিও শব্দ ছাপা হয়নি। এমনকি যেকোনও একজন ডেপুটি গভর্নরের অ্যাকাডেমিক পেপার অথবা ভাষণ—গভর্নরের অনুমোদনসাপেক্ষ।

Advertisement

অনিশ্চয়তা ও স্থিতিস্থাপকতা
সতর্কতাটিকে কেউই গুরুত্বসহকারে নেয় না এবং নিবন্ধটি ব্যাপকভাবে পঠিত ও প্রয়োজন মতো উদ্ধৃতও করা হয়ে থাকে। ‘অনিশ্চয়তা’ শব্দটি নিবন্ধে অসংখ্যবার ব্যবহার করা হয়। সরকার এবং আরবিআই বিভিন্ন পদক্ষেপ করার পরেও মুদ্রাস্ফীতি, জিনিসপত্রের দাম, কর্মসংস্থান, বেতন ও মজুরি, বিনিয়োগ, আয়, কর এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বাইরেও—যেমন পাবলিক এগজাম, ভোটার তালিকা ও নির্বাচন, আইন ও সেগুলির বাস্তবায়ন, বিদেশ নীতি, প্রতিবেশী নীতি প্রভৃতিতে। প্রকৃতপক্ষে, অনিশ্চয়তা দেশের বর্তমান অবস্থা নির্ধারণ করে।
বিদ্যমান অনিশ্চিত অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে আরবিআইয়ের অবস্থানটি আমাদের পরিচিত—‘অর্থনীতি স্থিতিশীল’। সরকারের মতো, আরবিআইও মরিয়া হয়ে খড়কুটো আঁকড়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বশেষ খড়টি হল জিএসটি হার হ্রাস। এই হার কমানোর পদক্ষেপকে ‘যুগান্তকারী জিএসটি সংস্কার’ আখ্যা দিয়েছে আরবিআই। করের উচ্চ এবং একাধিক রেট হ্রাস ছিল কি ‘সংস্কারমূলক’? তাহলে এটাই কি ছিল মূল পাপ? জিএসটি আইনের নকশা ভুল ছিল, কর কাঠামো ভুল ছিল, ভুল ছিল নিয়মকানুন এবং কর হার। জিএসটি আইনের বাস্তবায়নও ছিল ভুলে ভরা। ত্রুটিপূর্ণ একাধিক কর হার সংশোধন করা, আমার মতে, কোনও যুগান্তকারী সংস্কার নয়।
আহ্লাদের কিছু নেই
তবে, জিএসটি হার হ্রাস নিয়ে ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি’ উদ্বেল, আহ্লাদে আটখানা আর কী! আশা করা হচ্ছে, জিএসটি হার কমার ফলে গ্রাহকদের হাতে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা রয়ে যাবে, বা মিলিতভাবে কমে যাবে তাদের কেনাকাটার ওই পরিমাণ খরচ। ২০২৫-২৬ সালে দেশে নমিনাল জিডিপির পরিমাণ ছিল ৩৫৭ লক্ষ কোটি টাকা। তার পাশে এই আর্থিক সাশ্রয় মাত্র ০.৫৬ শতাংশ। ভারতের বার্ষিক খুচরো বাজারের বহর মোটামুটি ৮২ লক্ষ কোটি টাকা। সেখানে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ ২.৪ শতাংশ। এই আর্থিক সাশ্রয় খুচরো ভোগব্যয় বৃদ্ধি করলেও দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব নিয়ে যা করা হচ্ছে তা ভীষণই অতিরঞ্জিত।
আরও একটি জিনিস ভাববার এই যে, দেশবাসীর সাশ্রয়ের এই ২ লক্ষ কোটি টাকার সবটাই কিন্তু ভোগব্যয় হিসেবে বাজারে ফিরে আসবে না। সরকারি তথ্য অনুসারে, পারিবারিক ঋণ জিডিপির ৪০ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে এবং পারিবারিক সঞ্চয় নেমে এসেছে জিডিপির ১৮.১ শতাংশে। অতএব, কেনাকাটায় সাশ্রয়ের কল্যাণে পরিবারের হাতে ‘জিএসটি মানি’র কিছু অংশ খরচ হবে ঋণ পরিশোধে। কিছুটা দিয়ে সঞ্চয় বৃদ্ধিরও চেষ্টা হবে। তবে আমি একমত যে, ভোগব্যয় বৃদ্ধি পাবে। তবে সেটা কি ভোগ, উৎপাদন এবং বিনিয়োগ চক্রকে তেমনটা এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারবে? ‘সরকারি’ অর্থনীতিবিদ যাঁরা, তাঁরা ছাড়া সকলেই এই প্রশ্নের মতামত মুলতুবি রেখেছেন।
অর্থমন্ত্রক এবং আরবিআই একই স্তোত্রপুস্তক থেকে পাঠ করছে। গত ১৯ জুন অর্থমন্ত্রকের পরামর্শদাতা কমিটির কাছে উপস্থাপিত একটি গবেষণাপত্রে, প্রথম তিন পৃষ্ঠার শিরোনাম ছিল নিম্নরূপ:
 বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।
 হ্রাস পেয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ।
 এই পটভূমিতে, ভারতের অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছে।
অজানা কারণে, প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা (সিইএ) কঠোর সংস্কার আনতে ইচ্ছুক বা সক্ষম নন। প্রধানমন্ত্রী ‘জীবনযাত্রার সহজতা (ইজ অফ লিভিং)’ এবং ‘ব্যবসা করার সহজতা (ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস)’ এগিয়ে নেওয়ার ডাক দিয়েছেন। আমি যে কঠোর সংস্কারের কথা বলছি সেটা প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের ঊর্ধ্বে।
মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক
ভারতকে অবশ্যই একটি মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক (ওপেন অ্যান্ড কমপিটিটিভ) অর্থনীতি হয়ে উঠতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতা হল যখন একটি দরজা খোলা থাকে, তখন বন্ধ থাকে একটি জানালা! একটি ‘মুক্ত’ অর্থনীতিকে বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। একটি ‘প্রতিযোগিতামূলক’ অর্থনীতিতে পরিণত হতে আমাদের আরও দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে শামিল হওয়া দরকার। অতিক্ষুদ্র জিনিস তৈরি থেকে অতিকায় বস্তু নির্মাণ পর্যন্ত সবকিছু একাই করব, এমনটা একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির লক্ষ্য হতে পারে না, বস্তুত এই কাণ্ড করে পার পাওয়াও সম্ভব নয়। আমাদের কেবল এমন জিনিসপত্রই (পণ্য এবং পরিষেবা) তৈরি করা উচিত, যেগুলি আমরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে তৈরি করে লাভবান হতে পারি।
আমরা দক্ষিণ এশিয়া এবং আসিয়ান দিয়ে শুরু করতে পারি। বিশ্বের সবচেয়ে ছোটো ট্রেডিং ব্লকগুলির মধ্যে একটি হল সার্ক। সার্ক দেশগুলির মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাত্র ৫-৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে থাকে তাদের নিজস্ব ক্ষুদ্রগণ্ডির মধ্যে। সার্ক দেশগুলির সঙ্গে ভারতের এক্সটার্নাল ট্রেডের পরিমাণ ৮ শতাংশেরও কম। আসিয়ান দেশগুলির সঙ্গে আমাদের এই বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১১ শতাংশ।
আর একটি কঠিন সংস্কার হল নিয়ন্ত্রণমুক্তি (ডি-রেগুলেশন)। আইন প্রয়োগকারী (ল এনফোর্সমেন্ট) থেকে শুরু করে কর প্রশাসন (ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) পর্যন্ত সকলেই নিয়মকানুন (রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনস) তৈরি করতে পছন্দ করে। মন্ত্রীদের বিলগুলি সম্পর্কে অবহিত করা হয় কিন্তু নিয়ম, বিধি, ফর্ম, বিজ্ঞপ্তি, নির্দেশিকা প্রভৃতি সম্পর্কে তাঁদের অন্ধকারে রেখে দেওয়া হয়। ঠিক এভাবেই জিএসটির মতো একটি নিখুঁত ধারণা ‘গব্বর সিং ট্যাক্সে’ পরিণত হয়েছে! ১৯৯১-৯৬ সালে দেশে প্রথমবারের মতো ডি-রেগুলেশনের ধাক্কা আসার পর, ফের সেই পুরোনো ‘কন্ট্রোল অ্যান্ড রেগুলেশনস’ ব্যবস্থাই ফিরে এসেছে। এবং, ‘প্রতিদিন’ আরও বেশি বেশি করে নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা হচ্ছে। নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের বাড়বাড়ন্ত রোধ করার জন্য সরকার যদি একটি ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করে তবে সেটা হবে একটা বড়ো সংস্কার। একটি বৃহৎ পদক্ষেপে, প্রধানমন্ত্রীর ‘জীবনযাত্রার সহজতা’ এবং ‘ব্যবসা করার সহজতা’ সরকার অর্জন করতে পারত। এবং আমি সাহস করে বলতে পারি যে, সেটা বৃদ্ধির হারকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
জিএসটির হার হ্রাস একটা আদি পাপের সংশোধন মাত্র, তার বেশি কিছু নয়। এটা নিয়ে ‘উৎসব’ করার কী আছে! ভারতের অর্থনীতি যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, এই পদক্ষেপ তারও কোনও উত্তর নয়।
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ