সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রধান চাহিদা সুষ্ঠুভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিটি নির্বাচন অনুষ্ঠান। অন্যথায় নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারেও জনমতের প্রতিফলন থাকে না। তাই প্রতিটি নির্বাচনের মুখে একটি প্রশ্ন বারবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: জাতীয় নির্বাচন কমিশন কি বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে পারবে? এবারের লোকসভা নির্বাচনও এই প্রশ্ন এড়াতে পারেনি। প্রশ্নটি উঠেছে ফের। এমনকী, সমালোচনার কাঠগড়াতেও জাতীয় নির্বাচন কমিশন এখন। ১৩ ও ২০ নভেম্বর ঝাড়খণ্ড ও মহারাষ্ট্রে বিধানসভা নির্বাচন। তৎসহ উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে মোট ১৫টি রাজ্যে। তার মধ্যে রয়েছে দুটি লোকসভা এবং ৪৮টি বিধানসভা আসন। এই ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর অপব্যবহারের অভিযোগে বিদ্ধ বিজেপি। বিরোধীদের অভিযোগ, আধা সেনাকে বিজেপির স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে তৃণমূলের দাবি, ভোটের নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বিজেপির হয়ে প্রচার করছেন! এছাড়া রয়েছে মহিলাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের পুরনো সমস্যাও। কিন্তু অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার মিলছে না। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় এই যে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়েও গুরুতর অভিযোগ গ্রহণের উপযুক্ত কর্তারা সদর দপ্তরে নেই। শনিবার নয়াদিল্লির অশোক রোডে কমিশনের দপ্তরে তিন কমিশনারের কাউকেই পাওয়া যায়নি! অথচ বাংলায় ভোটারদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে না কেন্দ্রীয় বাহিনী। বিজেপি নেতাদের সঙ্গে নিয়েই চলছে রুটমার্চ। পদ্মফুল চিহ্নে ভোট দিতে ভোটারদের চাপ দিচ্ছেন বলেই জওয়ানদের দিকে আঙুল তুলল বাংলার শাসক দল। কমিশনের বিরুদ্ধে গাছাড়া মনোভাবের অভিযোগও তুলেছে তৃণমূল।
Advertisement
পশ্চিমবঙ্গে ভোট নেওয়া হবে ৬টি বিধানসভা আসনের জন্য: কোচবিহার জেলার সিতাই, আলিপুরদুয়ারের মাদারিহাট, উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটি ও হাড়োয়া, মেদিনীপুর জেলায় মেদিনীপুর এবং বাঁকুড়ার তালড্যাংরা। লোকসভার উপনির্বাচন হবে কেরলে ওয়েনাড় এবং মহারাষ্ট্রে নানদেদ আসনে। উপনির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিধানসভা আসন উত্তরপ্রদেশে (৯)। তারপরেই রাজস্থান (৭) ও পশ্চিমবঙ্গ (৬)। এই আসনগুলির মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক দখলে রয়েছে কংগ্রেসের (১৩)। সংখ্যার দিক থেকে পরবর্তী দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলের নাম যথাক্রমে বিজেপি (১১) ও তৃণমূল কংগ্রেস (৫)। উল্লেখ্য, বাংলার মোট ৬টি আসনের মধ্যে বিজেপির দখলে আছে মাত্র একটি। এই উপনির্বাচন কোনও রাজ্য সরকারে পরিবর্তন আনবে না, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য একাধিক রাজ্যে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক রূপরেখা এঁকে দিতে পারে। অন্যদিকে, হেমন্ত সোরেন গ্রেপ্তার ইস্যুতে ঝাড়খণ্ডে বিজেপি যথেষ্ট বেকায়দায়। আদিবাসী ভোটাররা গেরুয়া শাসক দলের উপর কতটা রুষ্ট তা তাঁরা বুঝিয়ে দিয়েছেন সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে। উনিশের বিধানসভা ভোটে জিতে হেমন্ত মুখ্যমন্ত্রী হন। সেবার জেএমএম মোদি-শাহের পার্টিকে রুখেছিল কংগ্রেস ও আরজেডির সঙ্গে জোট গড়ে। বাড়া ভাতে ফেলা ছাই সরাতে পাঁচবছর যাবৎ বিজেপি কম ফিকির করেনি। এমনকী আর্থিক কেলেঙ্কারির দায় চাপিয়ে গুরুজির ছেলেকে অ্যারেস্ট করিয়েও রাঁচির দখল তাদের অধরা রয়ে গিয়েছে। উল্টে লোকসভা ভোটের রেজাল্ট দিয়ে রেখেছে হিতে বিপরীত কিছু ঘটারই সংকেত! এছাড়া মহারাষ্ট্রের কুর্সি নিয়ে গত পাঁচবছরে বিজেপি যে কুনাট্য মঞ্চস্থ করেছে, তার দৃষ্টান্ত ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে কমই। বিশেষত বিজেপির চালেই সেখানে শিবসেনা এবং এনসিপির মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের ছত্রখান অবস্থা! এজন্য অংশত ফুঁসছে মারাঠা স্বাভিমান। ক্ষমতা ফিরে পেতে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসকে মোদি বিঁধতে চেয়েছেন বিভাজনের তিরে: ওবিসি, আদিবাসী এবং দলিত ঐক্য ও দরদের নামে। সব মিলিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরে রামধাক্কা খাওয়া বিজেপির মনে এখন মহারাষ্ট্র এবং ঝাড়খণ্ড নিয়ে শতেক প্ল্যান।
বিজেপির রণকৌশল নিয়ে সাধারণভাবে আপত্তির কিছু নেই। আপত্তি শুধু সেখানেই, যেখানে কেন্দ্রীয় শাসক বা অন্যকোনও রাজনৈতিক শক্তিকে পরোক্ষে বাড়তি ও অন্যায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়। এমনটা হলে যুগপৎ অর্থ ও গুরুত্ব হারায় নির্বাচন। নষ্ট হয় জাতীয় নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা। বৃহত্তম গণতন্ত্রের গুণমান নিয়ে বিরূপ প্রশ্ন বরাবরের। ভারতকে ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’র ঊর্ধ্বে ওঠার পক্ষেই সওয়াল করে গণতান্ত্রিক দুনিয়া। তাই সদাসতর্ক পদক্ষেপই কাম্য, সেখানে কমিশনের ভূমিকায় সামান্য ত্রুটিও ভারতের গণতন্ত্রকে এগিয়ে দেওয়ার বদলে পিছিয়েই দেবে। বিষয়টি মাথায় রেখেই অবিলম্বে পদক্ষেপ করতে হবে কমিশনকে, যাতে এই নির্বাচনও সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হতে পারে।
বিজেপির রণকৌশল নিয়ে সাধারণভাবে আপত্তির কিছু নেই। আপত্তি শুধু সেখানেই, যেখানে কেন্দ্রীয় শাসক বা অন্যকোনও রাজনৈতিক শক্তিকে পরোক্ষে বাড়তি ও অন্যায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়। এমনটা হলে যুগপৎ অর্থ ও গুরুত্ব হারায় নির্বাচন। নষ্ট হয় জাতীয় নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা। বৃহত্তম গণতন্ত্রের গুণমান নিয়ে বিরূপ প্রশ্ন বরাবরের। ভারতকে ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’র ঊর্ধ্বে ওঠার পক্ষেই সওয়াল করে গণতান্ত্রিক দুনিয়া। তাই সদাসতর্ক পদক্ষেপই কাম্য, সেখানে কমিশনের ভূমিকায় সামান্য ত্রুটিও ভারতের গণতন্ত্রকে এগিয়ে দেওয়ার বদলে পিছিয়েই দেবে। বিষয়টি মাথায় রেখেই অবিলম্বে পদক্ষেপ করতে হবে কমিশনকে, যাতে এই নির্বাচনও সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হতে পারে।



