Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গ্রামোন্নয়নে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ

গ্রামোন্নয়নে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ
  • ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
মহাত্মা গান্ধীকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, স্বাধীন ভারত ব্রিটেনের মতো জীবনযাত্রার মান অর্জন করবে বলে কি আপনি বিশ্বাস করেন? গান্ধীজি উত্তর দিয়েছিলেন, এই সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য এই গ্রহের অর্ধেক সম্পদ লেগেছে একা ব্রিটেনের। তাহলে অনুমান করুন, ভারতের মতো বিশাল দেশের জন্য কতগুলি গ্রহের সম্পদ প্রয়োজন হবে! গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন যে, প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট সম্পদের জোগান এই পৃথিবী দিয়ে থাকে, কিন্তু প্রত্যেক মানুষের লোভ মেটানোর পক্ষে তা যথেষ্ট নিশ্চয় নয়। জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে মানুষ যেভাবে বায়ু, জল ও ভূমিকে দূষিত করে চলেছে তাতে মহাত্মার সমর্থন ছিল না। অরণ্যে বন্যপ্রাণীর বাঁচার অধিকার হরণের তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি। অমূল্য জল, মাটি ও ঔষধি গাছের প্রাকৃতিক ভাণ্ডার নিছক বিলাসের কারণে ধ্বংস করে ফেলাকে তিনি চরম অনৈতিক মনে করতেন। এসবই ছিল তাঁর অহিংস নীতির ভিত্তি। আমাদের প্রিয় গ্রহ পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে সকলের সুন্দরভাবে বাঁচার পক্ষে সওয়াল করতে গিয়েই গান্ধীজি ‘গ্রাম স্বরাজ’ চেয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গেই ফিরে আসে ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের স্মৃতি। গ্রাম চরম সংকটে পড়লে শহরের রাজপথেও সমানে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল তার আর্তনাদ। শহর-গ্রামের এই সম্পর্কের সত্য তারপরেও বার বার অনুভব করেছে ভারতের অর্থনীতি। প্রতিটি সংকট এই বার্তাই দিয়েছে যে মহানগর, শহর প্রভৃতি মিলিয়ে ভারতকে বাঁচার মতো বাঁচতে হলে গ্রামকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। 
Advertisement
গ্রাম আজও কৃষিনির্ভর। স্বাধীনতার পর জমির চরিত্র ও কৃষকের সংখ্যায় বদল ঘটেছে। বৈচিত্র্য এসেছে কৃষিপণ্যে ও চাহিদার ক্ষেত্রে। সব মিলিয়ে ধরন বদলে গিয়েছে কৃষিনির্ভরতার। চেহারা বদলে গিয়েছে গ্রামের। কিছু ক্ষেত্রে কমে এসেছে গ্রাম ও শহরের ফারাক। এজন্য বিশেষ কৃতিত্ব দাবি করতে পারে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং তার মাধ্যমে গ্রামোন্নয়নের প্রচেষ্টা। গ্রামোন্নয়নের ধারাবাহিক কাজের পাশাপাশি সব মানুষের কথা মাথায় রেখে ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন কিছু কর্মসূচি নিয়ে থাকে বাংলার আজকের গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি। কিন্তু তাদের কাজের উপযুক্ত মূল্যায়নের ব্যবস্থা এতদিন ছিল না। ফলে ভালো কাজ করেও তার সরকারি স্বীকৃতি পেত না অনেক পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েত পরিচালনার এই অভাব পূরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। এবার থেকে পঞ্চায়েতের ভালো কাজকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জনসমক্ষে তুলে আনবে রাজ্য পঞ্চায়েত দপ্তর। নিরপেক্ষ মূল্যায়নের স্বীকৃতিস্বরূপ উপযুক্ত পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হবে শংসাপত্র। সম্প্রতি রাজ্যের পঞ্চায়েত সচিব পি উলগানাথন সব জেলাশাসককে এক চিঠিতে জানিয়েছেন, পঞ্চায়েতগুলির কাজের প্রাথমিক মূল্যায়ন করবে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত সমিতি। জেলা পরিষদ করবে দ্বিতীয় দফার মূল্যায়ন। পঞ্চায়েতগুলির তরফে গৃহীত উদ্যোগের নিরিখেই শ্রেষ্ঠত্বের বিচার হবে। সেখানে দেখা হবে পঞ্চায়েতের উদ্যোগের ব্যাপ্তি কতখানি, তাতে গোটা সমাজের উপর কী ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রভৃতি। সবদিক মাথায় রেখেই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করবে রাজ্য পঞ্চায়েত দপ্তর। এরপর তা তুলে দেওয়া হবে পঞ্চায়েত দপ্তরের পোর্টালে, যাতে সেরা পঞ্চায়েতকে সামনে রেখে বা মডেল মেনে বাকি পঞ্চায়েতগুলিও আগামী দিনে এগিয়ে যেতে পারে। পঞ্চায়েত ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম একই নিয়মে পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদগুলিরও কাজের বিচার এবং তাদের পুরস্কৃত করবে। 
এই ধারণা এবং উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। গ্রামোন্নয়নের ধারা অব্যাহত, এমনকী তাকে ত্বরান্বিত করার পক্ষেই সহায়ক হবে এই পদক্ষেপ। একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, এই মহৎ উদ্যোগ যেন কোনোভাবেই গোষ্ঠী রাজনীতির ছোঁয়ায় কলুষিত না-হয়; বহু নিন্দিত ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’, ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সংস্কৃতির ছায়ামাত্র না-পড়ে এতে; গ্রামের উন্নতির অর্থ যেন কোথাও শহরে রূপান্তরের ভ্রান্ত তাগিদেরও সমার্থক না-হয়ে ওঠে। তাতে গ্রাম এবং শহর একত্রে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। গ্রামীণ পরিবেশের সুস্থতা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ 
রেখেই গ্রামীণ মানুষের কাছে উন্নয়নের আশীর্বাদ পৌঁছে দিতে হবে। 
এই কাজ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়, প্রয়োজনে প্রাসঙ্গিক গবেষণার পরিসর বৃদ্ধি দরকার। পঞ্চায়েত থেকে জেলা পরিষদ প্রভৃতির শ্রেষ্ঠতার বিচারে এই দিকটিও যেন কোনোভাবে গুরুত্ব না-হারায়, তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।
সম্পর্কিত সংবাদ