Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

গ্রাম থেকে জিরো পয়েন্টে সরল বিএসএফ, মুক্তির স্বাদ জলঙ্গির চর পরাশপুরের বাসিন্দাদের

গ্রাম থেকে জিরো পয়েন্টে সরল বিএসএফ, মুক্তির স্বাদ জলঙ্গির চর পরাশপুরের বাসিন্দাদের
  • ২৯ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
তামিম ইসলাম, ডোমকল:  ঘন কুয়াশার চাদর ছিন্ন করে সবে উঁকি মারছে সূর্য! ভোরের আলোর গতিবেগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রামজুড়ে চাউড় হয়ে গিয়েছে একটিই খবর—‘আজ আমরা স্বাধীন।’ 
Advertisement
কানাকানি খবর শুনে বাড়ির বাইরে সকলে। উন্মুক্ত আকাশের নীচে। আনন্দে আত্মহারা সবাই। কেউ ছুটে গিয়েছেন বাজারে। ভালো মাছ কিনবেন। কেউ আবার মাংসের দোকানের লাইনে। আজ কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার আয়োজনে কেউই পিছিয়ে থাকতে চান না। গ্রামের প্রতি বাড়ির হেঁশেলে ভুরিভোজের প্রস্তুতি। 
এই কয়েকটা লাইন পড়ে মনে হতে পারে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্টের কথা। সেদিনও ঠিক একই ভাবে স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার উৎসব উদ্‌যাপন হয়েছিল চতুর্দিকে। কিন্তু ২৮ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার দিনটা জলঙ্গির চর পরাশপুর ও উদয়নগর খণ্ড কলোনির কাছে তেমনটা নয়। আসলে, দীর্ঘ প্রতিবাদ, আন্দোলনের পর এদিন গ্রামের প্রবেশদ্বার থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে সরে গেল বিএসএফ। চলে যায় জিরো পয়েন্টে। চলাফেরায় পায়ে কোনও বেড়ি থাকবে  না। যাতায়াতে মিলিটারি হুকুম থাকবে না। তল্লাশির নামে জুলুমবাজিও থাকবে না। এখন থেকে দুই চরের বাসিন্দারা মুক্ত বিহঙ্গ। তাই আনন্দে তাঁরা দিশেহারা। মেতে উঠেছেন উৎসব-উদ্‌যাপনে। সেই উৎসব চলল দিনভর।  
একদা জলঙ্গির উদয়নগর, টলটলি, পরাশপুর মিলিয়ে ছিল বর্ধিষ্ণু গ্রাম। ওপারে বাংলাদেশ। মাঝে পদ্মা। তার সীমানা ঘেঁষে জিরো পয়েন্ট। সেখানে পাহারা দিত বিএসএফ। বাজারহাট, পথঘাট ভিড়ে গমগম করত। সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হল না। ভিলেন পদ্মা। তার খামখেয়ালি চলন গিলে ফেলে আস্ত একটা গ্রাম। তখন গ্রামের বাসিন্দা থেকে শুরু করে সীমান্ত থেকে সরে আসে বিএসএফও। পরে পদ্মা ফের গতিপথ বদল করলেও জিরো পয়েন্টে যায়নি বিএসএফ। এদিকে, চরে ফের বসতি বাড়তে শুরু করে। কিন্তু বিএসএফ জিরো পয়েন্টে সরে যাওয়ার বদলে গ্রামে ঢোকার মুখেই ঘাঁটি গেড়ে বসে। সেটাই যেন কাল হয়ে দাঁড়ায় দুই চরের বাসিন্দাদের কাছে। স্বাধীন হয়েও তাঁরা ক্রমেই ‘পরাধীন’ হয়ে ওঠেন। কারণ, ভৌগোলিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সীমারেখায় কাঁটাতার না থাকার দোহাই দিয়ে দুই চরের বাসিন্দাদের যাতায়াত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে  বিএসএফ। গ্রামে ঢুকতে বেরোতে গেলে চেকিং। পোশাক থেকে শুরু করে জুতো পর্যন্ত তল্লাশি। মাঝেমধ্যেই তল্লাশির নামে হেনস্তা। মারধরেরও অভিযোগ উঠত। বিএসএফের এই অতি কড়াকড়ির জেরে গ্রামের ছেলেমেয়েদের চরের বাইরে বিয়ে পর্যন্ত দিতে পারতেন না অনেকেই। তাই, দীর্ঘদিন ধরে দাবি উঠছিল, গ্রামের প্রবেশদ্বার ছেড়ে জিরো পয়েন্টে ডিউটি করুক বিএসএফ। বিষয়টি বিএসএফ ওপর মহলেও জানান তাঁরা। শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তারা গ্রিন সিগন্যাল দিতেই এদিন সকালে ওপি পয়েন্ট ছেড়ে জিরো পয়েন্টে সরে যায় বিএসএফ। আর তা জানাজানি হতেই খুশির হাওয়া বইতে শুরু করে গ্রামজুড়ে। গ্রামের বাসিন্দা আলম শেখ বলছিলেন, ‘স্বাধীন ভারতে থাকার পরও আমরা এতদিন প্রায় পরাধীন ছিলাম। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কি খাচ্ছি?—সবকিছুতেই ছিল বিএসএফের অলিখিত হুকুমত! আজ অবশেষে তার অবসান ঘটল। নতুন করে যেন আমরা স্বাধীন হলাম। আমাদের যে কি আনন্দ হচ্ছে, তা বলে প্রকাশ করতে পারব না।’ জলঙ্গির ঘোষপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য আজাদ আলির কথায়, ‘আজ আমাদের বড় আনন্দের দিন। গ্রামের মানুষ এতদিন তল্লাশির নামে কি যে কষ্ট সহ্য করেছে, তা বলে বোঝানো যাবে না।’ জলঙ্গি বিএসএফের এক আধিকারিক বলেন, ‘আমরা ফরাজিপাড়া ক্যাম্পের জওয়ানরা ডিউটি পয়েন্টকে জিরো পয়েন্টে সরিয়ে নিয়ে এসেছি। আর গ্রামে ঢুকতে-বেরোতে আমাদের তল্লাশি চলবে না। তবে জিরো পয়েন্টে আমাদের নজরদারি আরও কড়া হবে।’
সম্পর্কিত সংবাদ