নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: গম্ভীরা, টুসু থেকে বোলান— লোকসংস্কৃতির এইসব মণিমুক্তো একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলা থেকে। তার বদলে পশ্চিমি ঘরানার যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে বাংলার পল্লিগীতি মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে অদ্ভুত খিচুড়ি। আজকের প্রজন্ম তাই খমক অথবা একতারার তালে তালে এইসব গানের আসল স্বাদ থেকে বঞ্চিত। তবে লোকসংস্কৃতির এই ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রচেষ্টা চলেছে নদীয়া জেলার বগুলায়। চলতি ডিসেম্বরের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের উদ্যোগে এক বিন্দুতে মিলতে চলেছে বাংলার এক ডজনের বেশি লোকসংগীত।
Advertisement
চূর্ণি পাড়ের বোলান গানে এক সময়ে কৃষ্ণপুর শিবনিবাসের আশপাশ মুখরিত হয়ে উঠত। শোনা যায়, গ্রামের ঘোষ সম্প্রদায়ের মানুষ গাইত এই গান। কিন্তু আজ প্রায় হারাতেই বসেছে বোলান। লোকগানের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার কারণে অনেকের তো আবার ভ্রান্তিও তৈরি হয়েছে বোলান নিয়ে। হোলুই বা হোল বোল গানের সঙ্গে হামেশাই গুলিয়ে ফেলেন। তবে এর পিছনে কারণ, ক্রমশই সংস্কৃতি চর্চা কমে যাওয়া। গাজন উৎসবকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল চূর্ণি পাড়ের এক নিজস্ব লোকসংগীত। তবে এছাড়াও তালিকায় রয়েছে রামপ্রসাদী, ভাটিয়ালি, সারি গান, গম্ভীরা, ঝুমুর, টুসু। এছাড়াও চেনা পরিচিত বাউল তো রয়েছেই। সামগ্রিকভাবে এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা থেকে গ্রাম সংস্কৃতিকে ফের তুলে আনতে নদীয়া জেলার এক বিন্দুতে মিলতে চলেছে গ্রাম বাংলার এরকম ডজন খানেক পল্লিগীতি। ‘বৈঠা উৎসব ও সাংস্কৃতিক মেলা’ শীর্ষক একদিনব্যাপী লোকসংগীত চর্চার মাধ্যমে সংরক্ষণের চেষ্টা হবে বঙ্গীয় সংস্কৃতির এই বীজ। কোনও প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের উদ্যোগে ২২ ডিসেম্বর রবিবার, বগুলা পূর্বপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়েই আসর বসত চলেছে। বলাই বাহুল্য, বর্তমান প্রজন্মের কাছে বাংলার লোকগানকে পৌঁছে দিতেই এই উদ্যোগ। যেখান থেকে সরাসরি আগ্রহীরা গুরু পাবেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সংস্কৃতির মশাল পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করবেন উদ্যোক্তারা। উদ্যোক্তাদের তরফে গৌতম অধিকারী বলেন, বর্তমানে লোকগান চর্চা মানে পশ্চিমী ঘরানায় একটা অদ্ভুত খিচুড়ি। তাতে অবশ্য আপত্তি নেই। কিন্তু তার মূল স্বাদ তো পৌঁছচ্ছে না বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত। একটু একটু করে শিক্ষার্থীর অভাবে গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এই গানগুলো। আমরা স্রেফ একটি মঞ্চে বাংলার সমস্ত গানকে এবং তার ঘরানাকে মঞ্চস্থ করার চেষ্টা করছি। যেখানে সাধারণ মানুষ এসে পরিচিত হতে পারবেন আমাদের অমূল্য সংস্কৃতির সঙ্গে এবং চাইলে তাঁরা সেই চর্চার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। দিনব্যাপী গান চর্চার পাশাপাশি এক বৃহত্তর কর্মশালাও বলা চলে একে। প্রসঙ্গত, লোকসংগীত চর্চার উদ্দেশ্য নিয়ে এই বৈঠা উৎসব আয়োজিত হয়েছে। যার উদ্বোধন করবেন পদ্মশ্রী প্রাপ্ত গীতিকার ও লোকশিল্পী রতন কাহার। অর্থাৎ সবমিলিয়ে বলাই চলে, চলতি মাসে নদীয়ার বগুলা দেখতে চলেছে বাংলার সমৃদ্ধ সংস্কৃতির বিচ্ছুরণ।



