কীভাবে যাবেন: আলিপুরদুয়ারগামী যে কোনো ট্রেনে দলগাঁও স্টেশন থেকে টোটো বা অটো করে যাওয়া যায়। আলিপুরদুয়ার থেকে বীরপাড়া হয়ে লংকাপাড়া মাত্র ১৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেই তিতি নদীর তীরে, ভুটান পাহাড়ের ছায়ায়, প্রকৃতির এক স্বপ্নপুরী লংকাপাড়া প্রতিটি পর্যটককে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় রয়েছে।
বর্ষার ডুয়ার্স যেন প্রকৃতির নিজস্ব জলরঙের ক্যানভাস। আকাশভরা কালো মেঘ, অবিরাম বৃষ্টিধারা, দূরে কুয়াশামাখা ভুটান পাহাড়, তার পায়ের কাছে সবুজের অসীম বিস্তার— সব মিলিয়ে ডুয়ার্স তখন এক অন্য জগৎ। যে ডুয়ার্সকে আমরা শীতের রোদের ওমে চিনি, বর্ষায় সে-ই নবযৌবনপ্রাপ্ত হয়। তখন তাকে আরও সজীব, উচ্ছ্বসিত ও রহস্যময় লাগে। ডুয়ার্সকে আমি কখনো শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল বলে ভাবতে পারি না। আমার কাছে ডুয়ার্স মানে সবুজের এমন এক অন্দরমহল, যার ওপারে অপেক্ষা করে থাকে অরণ্য, নদী, পাহাড় আর অসংখ্য না-বলা কাহিনি।
ডুয়ার্সের আনাচে-কানাচে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে পৌঁছালে মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজের হাতে একটি স্বপ্ন এঁকেছে। পাহাড়, নদী, চা-বাগান, নীল আকাশ আর সীমান্তের নিস্তব্ধতা— সব মিলিয়ে এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের ভুবন নিয়ে এক স্বল্প চেনা পর্যটনকেন্দ্রের নাম লংকাপাড়া। এখানে একদিকে দাঁড়িয়ে আছে ভুটান পাহাড়, অন্যদিকে ভারতের ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ সমভূমি। এই দুই ভূখণ্ডের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে তিতি নদী।
কিন্তু এই অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক নির্মম বাস্তবের ইতিহাস। একসময় লংকাপাড়ার মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল চা-বাগানের নানা কাজ। মুজনাই, ডালিমোর, দুমচিপাড়া নামে নানা চা-বাগান যাতায়াতের পথে আজও চোখে পড়ে। আলিপুরদুয়ার জেলার অন্যতম বৃহৎ লংকাপাড়া চা-বাগান ২০১৪ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ২০০০-এর বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। বহু পরিবারের সংসারে নেমে আসে অনিশ্চয়তার অন্ধকার। অর্থাভাবে এলাকা ধীরে ধীরে অবহেলিত হয়ে পড়ে। একসময় সমাজবিরোধীদের কার্যকলাপ বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়িও স্থাপন করা হয়।
কিন্তু প্রকৃতি যেমন ধ্বংসের মধ্যেও নতুন সৃষ্টির পথ খুঁজে নেয়, তেমনই লংকাপাড়ার মানুষও নতুন পথের সন্ধান করেছেন। মানুষের সবচেয়ে বড়ো শক্তি তার হার না-মানা মন। এখানকার মানুষ বুঝেছিলেন, প্রকৃতি যদি এতদিন তাঁদের অন্ন জুগিয়ে থাকে, তবে সেই প্রকৃতিই আবার নতুন করে পথ দেখাতে পারে। তাই তাঁরা কোনো অলৌকিক পরিবর্তনের অপেক্ষা করেননি, কারও সাহায্যও প্রত্যাশা করেননি। ভাগ্য বদলের কাজে নিজেরাই পরস্পরের হাত ধরেছেন। নদীর ধারে তৈরি হয়েছে বসার জায়গা, কাঠের দোলনা, রঙিন সেলফি পয়েন্ট, ছোটো ছোটো চায়ের দোকান, মোমো-ম্যাগির স্টল, পর্যটকদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা—সবকিছুই গড়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। তাঁরা বদলে দিয়েছেন লংকাপাড়ার পরিচয়।
বিকেলের আলো যখন তিতি নদীর জলে পড়ে সোনালি হয়ে ওঠে, তখন পর্যটকরা হাসিমুখে কেউ ছবি তুলছেন, কেউ নদীর পাড়ে বসে নীরবে পাহাড় দেখছেন, কেউ আবার শিশুর মতো দোলনায় দুলছেন। সেই হাসি দেখে স্থানীয় মানুষও স্বস্তির শ্বাস নেন। কারণ প্রতিটি আগন্তুকের আগমন তাঁদের ঘরে নিয়ে আসে নতুন আশার আলো। তাঁরা বুঝেছিলেন, নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নতি করতে গেলে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে হবে তাদের সহজ সরল মনোভাব আর আতিথেয়তার মাধ্যমে। যে প্রকৃতি এতদিন চা-বাগানের মাধ্যমে তাঁদের জীবিকা অর্জনের সুযোগ দিয়েছিল, সেই প্রকৃতিই আবার নতুন করে তাঁদের বাঁচার পথ দেখাবে। তাই স্থানীয় মানুষ নিজেদের উদ্যোগে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। আজ সেই লংকাপাড়া পর্যটকদের কাছে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত। যেখানকার প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের শ্রম, স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাসের গল্প। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথায় কথায় জানলাম, বেকার সমস্যা দূর করার জন্য তাঁরা এই স্থানকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন। বহুদিন ধরে চা-বাগান বন্ধ থাকায় এখানকার সমস্যা দ্রুত বাড়ছিল। এখন পর্যটকরা আসছেন, ফলে মানুষ অর্থ উপার্জন করতে পারছেন। এই কয়েকটি কথার মধ্যেই ধরা পড়ে লংকাপাড়ার সংগ্রামের ইতিহাস, যেখানে হতাশাকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। লংকাপাড়া আত্মনির্ভরশীলতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে প্রকৃতি যেমন মন ভরিয়ে দেয়, তেমনি স্থানীয় মানুষের সংগ্রাম, ঐক্য ও উদ্যোগ নতুন করে জীবনের প্রতি বিশ্বাস জাগায়। তাই লংকাপাড়ায় বেড়াতে এলে শুধু পাহাড়, নদী আর চা-বাগানের সৌন্দর্যই নয়, অনুভব করা যায় মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাহিনি।
লংকাপাড়ার প্রাণ হল তিতি নদী। সারাবছর শান্ত থাকলেও ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা এই ছোট্ট নদীটি বর্ষায় কিশোরীর মতো দুরন্ত হয়ে ওঠে। নদীর বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নুড়ি-পাথর, স্বচ্ছ জলের তলায় রোদ্দুরের ঝিকিমিকি আর দূরে পাহাড়ের নীলাভ রেখা— সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক নিরাভরণ সৌন্দর্য আকর্ষণ করে। নদীর পাড়ে দাঁড়ালে চোখ চলে যায় উত্তরের দিকে, সেখানে দেখা যায় ঢেউ খেলানো নীলচে পাহাড় আর সবুজের স্তরে স্তরে সাজানো ভুটানের সীমান্ত। কোলাহলহীন জায়গায় বাতাসে ভেসে আসে অরণ্যের গন্ধ। মাঝে মাঝে পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসা সাদা মেঘ নদীর ওপর ছায়া ফেলে।
সীমানা মানুষের তৈরি, প্রকৃতিকে তার মাধ্যমে বেঁধে রাখা যায় না। তিতি নদী এক দেশের বুক থেকে জন্ম নিয়ে অন্য দেশের মাটিকে ছুঁয়ে আপন ছন্দে এগিয়ে চলে। পাহাড়, বন, মেঘ, পাখি, হিমেল বাতাস এরা কেউ জানে না রাষ্ট্রের বিভাজন। সেই কারণেই লংকাপাড়ায় দাঁড়িয়ে সীমান্তকে কখনো বিচ্ছেদের রেখা বলে মনে হয় না; বরং মনে হয়, এটি দুই ভূখণ্ডের মিলনকেন্দ্র। নদীর ওপারেই শুরু হয়েছে ঘন অরণ্য। এই বন বৃহত্তর ডুয়ার্সের বনভূমিরই অংশ, যেখানে শাল, সেগুন, শিমুল, গামারি, চিকরাশি, খয়ের, বাঁশঝাড় আর অসংখ্য লতাগুল্ম মিলে গড়ে তুলেছে এক জীবন্ত পরিবেশতন্ত্র। বর্ষার পরে অরণ্যের মাটিতে জন্ম নেয় অসংখ্য বুনো ফুল, আর ভোরের আলোয় শিশিরভেজা পাতার ওপর সূর্যের প্রথম কিরণ পড়লে গোটা বনভূমি যেন অলক্ষ্যে জেগে ওঠে।
এই এলাকা অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। লংকাপাড়া অঞ্চলের বনভূমি দীর্ঘদিন ধরেই হাতি চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর বলে খ্যাত। সন্ধ্যা নামার পর কিংবা গভীর রাতে বুনো হাতির পাল নদী পেরিয়ে এক বন থেকে অন্য বনে চলে যায়। স্থানীয় মানুষ অরণ্যের অধিকারকে সম্মান করতে শিখেছেন। মানুষের বসতি আর বন্যপ্রাণীর এই সহাবস্থান সহজ নয়, তবু অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে— প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করার থেকে তাদের সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে হয়।
ভোরবেলায় যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকে, তবে ময়ূরের ডাক, ধনেশ পাখির উড়ান, নানা রঙের প্রজাপতির নাচ কিংবা দূরে হরিণের সতর্ক ছুটে চলা চোখে পড়তে পারে। কখনো বানরের দল গাছের ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে বেড়ায়, আবার কখনো অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেঙে শোনা যায় অজানা পাখির ডাক। এই বন মানুষের বিনোদনের জন্য নয়; এটি এক পরিপূর্ণ জীবন্ত পৃথিবী, যেখানে প্রতিটি প্রাণী নিজের নিয়মে বেঁচে থাকে।
লংকাপাড়ার প্রকৃতির মতো এখানকার মানুষও বৈচিত্রময়। নেপালি, মেচ, রাভা, ওঁরাও, মুন্ডা, রাজবংশী-সহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বহুদিন ধরে এখানে পাশাপাশি বসবাস করছেন। তাঁদের উৎসব আলাদা, ভাষা আলাদা, পোশাক আলাদা— কিন্তু জীবনযুদ্ধ এক। চা-বাগানের শ্রম তাঁদের একসূত্রে বেঁধেছিল, আর আজ পর্যটন সেই বন্ধনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। নেপালি পরিবারের উঠোনে এখনও দশাই আর তিহারের উৎসবের আনন্দ ভরে ওঠে। ঘরের সামনে ফুটে থাকে ফুল, অতিথিকে আপ্যায়ন করা হয় আন্তরিক হাসিতে। অন্যদিকে আদিবাসী সমাজে করম, সরহুল কিংবা বাহা উৎসবের সময় ঢোল-মাদলের তালে নাচে মেতে ওঠে গ্রামের তরুণ-তরুণীরা। সেই নাচে থাকে মাটির প্রতি কৃতজ্ঞতা, অরণ্যের প্রতি শ্রদ্ধা আর জীবনের উদযাপন। এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্রই লংকাপাড়াকে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। গ্রামে একটি চার্চও দেখতে পেলাম। বিশেষ দিনে সেখানে নানা অনুষ্ঠান হয়। শীতে এই জায়গাটি একটি পিকনিক স্পটের রূপ নেয়। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বহু পর্যটকও এখানে দিনসফরে এসে বনভোজন সেরে চলে যান।
নন্দিতা মিত্র