Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

গ্রেট পিরামিড

গ্রেট পিরামিড
  • ৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

Advertisement

কায়রোর মাটিতে যে দিন পা রেখেছিলাম সেদিন থেকেই বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম তিনটে জিনিস চাক্ষুষ করব বলে। নীলনদ, গিজার গ্রেট পিরামিড আর স্ফিংস। মানুষের কাছে মিশর আর পিরামিড— এই শব্দ দুটো সমার্থক। কায়রোতে আমার হোটেল যেখানে সেই ডাউন-টাউন অঞ্চলে বেশ কিছু ভ্রমণ সংস্থা আছে। তেমনই একটি সংস্থার মাধ্যমে আমার গিজা দেখতে যাওয়ার বন্দোবস্ত হল। গাইডও তাঁরা সঙ্গে দেবেন। তবে গিজা ভ্রমণের ব্যাপারে তিনটে বিষয়ে ভ্রমণ সংস্থার ম্যানেজার আমাকে সতর্ক করেছিলেন। প্রথমত, যথাসম্ভব সকালে গিজার উদ্দেশে রওনা হওয়া প্রয়োজন। সে জায়গাতে যেতে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় না লাগলেও বেলা যত বাড়ে তত ট্যুরিস্ট বাসগুলো সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। টিকিট কাউন্টারে লাইন পড়ে যায়। বিশেষত গ্রেট পিরামিডের ভিতরে প্রবেশ করতে হলে তখন সমস্যায় পড়তে হয়, কারণ দুর্ঘটনা এড়াতে পিরামিডের অভ্যন্তরে সংকীর্ণ পথে একসঙ্গে বেশি লোক প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। দ্বিতীয়ত, পাসপোর্ট আর টাকা পয়সার ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, স্থানীয় যাযাবর গোষ্ঠীর কিছু লোক সেগুলো হাতিয়ে নেওয়ার জন্য সক্রিয়। আর তৃতীয়ত, সেখানে একদল লোক আছে যাঁরা ছোটখাট অ্যান্টিক সামগ্রী বিক্রি করে। তাদের ফাঁদে পা না দেওয়াই ভালো। কারণ সে সব জিনিসের আসল-নকলের পার্থক্য করা কঠিন। আর সবচাইতে বড় কথা ওসব জিনিস কেনা-বেচা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। অনেক পর্যটকই ওসব জিনিস কিনে দেশে ফেরার সময় পুলিসের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। জিনিস তো বাজেয়াপ্ত হয়ই আর তার সঙ্গে সঙ্গে মোটা অঙ্কের ফাইন দিতে হয় আর হাজতবাসেরও আশঙ্কা থাকে।
গিজায় যাওয়ার আগের রাতে সঙ্গে থাকা বই আর ইন্টারনেট ঘেঁটে যথাসম্ভব তথ্য সংগ্রহ করে রাখলাম। এ কাজটা আমি কোথাও গেলে করি। কারণ তাতে সে জায়গা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায় মনের মধ্যে।
পিরামিড দেখার উত্তেজনায় সারা রাত ভালো ঘুম হয়নি। ভোরবেলা যখন বিছানা ছাড়লাম তখন কায়রো শহরের মাথায় সবে সূর্যদেব আত্মপ্রকাশ করেছেন। বেরনোর আগে ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম। একজন ওয়েটার আমাকে বলল, ‘স্যার, শুনলাম গিজা দেখতে যাচ্ছেন। ও জায়গাটা মরুভূমি অঞ্চলে অবস্থিত। শুষ্ক আবহাওয়া, বেলা ন’টার পর থেকেই রোদের তেজ বাড়তে থাকে। অন্য খাবার কম খেয়ে বেশি পরিমাণ তরমুজ আর ফলের রস খান। তাতে শরীর ঠান্ডা থাকবে।’ ওয়েটারের পরামর্শ মতোই কাজ করলাম আমি। গাড়ি ঠিক সময়মতোই এল। উঠে দেখি ড্রাইভারের পাশের আসনে একটি অল্প বয়সি তরুণী বসে আছে। সে তার পরিচয় দিয়ে বলল, তার নাম আইসিস। সে আমার গাইড, আমাকে গিজার পিরামিড ঘুরিয়ে দেখাবে। কথায় কথায় মেয়েটি জানাল, তার বাড়ি গিজার কাছেই এক গ্রামে। কয়েক বছর ধরে সে এ কাজ করছে। গিজার অবস্থান কায়রোর পশ্চিমে। প্রাচীনকালে গিজাই ছিল মিশরের ফ্যারাওদের রাজধানী। কায়রো-আলেকজান্দ্রিয়ার পর জনসংখ্যার নিরিখে গিজাই মিশরের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। কায়রো থেকে গিজা পৌঁছনোর জন্য আমরা যে রাস্তা ধরলাম, সে রাস্তায় নীলনদের শাখা নদীর ওপর একটা ব্রিজ পার হতে হয়। তা অতিক্রম করে সোজা গিজার রাস্তা ধরতে হয়। খেয়াল করলাম পথের দু’পাশে বড় বড় বাড়ির সংখ্যা কমে আসছে। তার পরিবর্তে চোখে পড়ছে ছোট ছোট পল্লি অঞ্চল। ছিরিছাঁদহীন ঘরবাড়ি। কোথাও কোথাও উট বাঁধা আছে।
ক্রমশ চারপাশে সবুজের সমারোহ মুছে যেতে শুরু করল। তার পরিবর্তে জেগে উঠতে লাগল ঊষর ভূমি। বইতে গিজার ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থা সম্বন্ধে যতটুকু পড়েছি— তা হল শক্ত চুনা পাথর দিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। যে কারণে এ স্থানে পিরামিডের মতো ভারী স্থাপত্য নির্মাণ করা হয়েছিল।
ক্রমশ বালিয়াড়ির মধ্যে প্রবেশ করতে লাগলাম। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির প্রান্তসীমা এসে স্পর্শ করেছে গিজা মালভূমিকে। সেই বালিই আস্তরণ বিছিয়ে দিয়েছে এ মালভূমির ওপর। উজ্জ্বল সোনালি রঙের বালি ঝলমল করছে সকালের সূর্যালোকে। পথ কখনও ওপর দিকে উঠছে, আবার ঢালু হয়ে নীচে নামছে। একসময় এমন একটা জায়গায় উপস্থিত হলাম, যেখানে চারপাশে শুধু বালির সমুদ্র। গাড়ির ড্রাইভার জানলার বাইরে এক দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই দেখুন স্যার, দেখতে পাচ্ছেন?’
তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আমি দেখলাম দূরে নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে ত্রিভুজ আকৃতির এক স্থাপত্যর শীর্ষ বিন্দু—গ্রেট পিরামিড অব গিজা! সেটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসলাম আমি। যদিও সে জায়গাটা তখনও আমার থেকে মাইল খানেক দূরে। সেদিকে এগিয়ে চলল গাড়ি। ক্রমশ আকারে বড় হতে লাগল পিরামিডের আকৃতি। এই মরুভূমিতে হাজার হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও সদম্ভে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। মহাকালকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা কতজনের থাকতে পারে? এরপর চোখে পড়তে লাগল আরও কতগুলো পিরামিড। আকারে তারা অপেক্ষাকৃত ছোট। তবে স্ফিংসের দেখা এখনই মিলল না। তাকে দেখতে পেলাম যেখানে গ্রেট পিরামিড দাঁড়িয়ে আছে তার কাছাকাছি পৌঁছে। মানুষের মুখ আর সিংহর দেহধারী বসে থাকা স্ফিংসের মূর্তির অবস্থান পিরামিডগুলো যেখানে অবস্থান করছে তার খানিকটা নীচে। তাই আকারে বিশাল হলেও দূর থেকে তাকে দেখা যায় না। অবশ্য তারই কিছুটা তফাত দিয়ে রাস্তা ওপরে উঠে থামল একটা প্রশস্ত চত্বরে। সেখান থেকে গ্রেট পিরামিডের দূরত্ব এক মাইলের এক চতুর্থাংশ হবে। আইসিসের সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। কাছেই টিকিট ঘর। ইতিমধ্যে বেশ কিছু পর্যটক লাইন দিয়েছে টিকিট কাটার জন্য। একের পর এক গাড়ি এসে থামছে সেই পাথুরে চত্বরে। টিকিটের দাম তিনশো ইজিপশিয়ান পাউন্ড। তবে গ্রেট পিরামিডের ভিতর যদি প্রবেশ করতে চাই তবে হাজার পাউন্ড দিতে হবে। পিরামিডের ভিতরে ঢোকার রোমাঞ্চটা হাতছাড়া করতে চাইলাম না। আমরা একসময় উঠে এলাম মালভূমির ওপরের অংশের সমতল মতো জায়গাতে। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রেট পিরামিডসহ অন্য পিরামিডগুলো। তবে জায়গাটা পাথর ছড়ানো, এবড়ো-খেবড়ো। পিরামিডকে ঘিরে যে স্থাপত্যগুলো ছিল তারই পাথর ওগুলো। স্থানে স্থানে সে সব স্থাপত্যর কিছু ছোট ছোট ঘরের মতো অংশ আজও দাঁড়িয়ে আছে। আইসিস বলল, শুনেছি একসময় এ জায়গা থেকে নাকি নীলনদ দেখা যেত। এখন সে খানিক গতিপথ পরিবর্তন করেছে, তাছাড়া অনেক ঘরবাড়ি হয়েছে তাই তাকে আর 
দেখা যায় না। 
গ্রেট পিরামিডের কাছে পৌঁছে গেলাম। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের ট্যুরিস্ট জড়ো হয়েছে সেখানে। সকাল বেলাতেই পিরামিডকে ঘিরে বেশ হট্টগোল জমজমাট ব্যাপার। আমি এসে দাঁড়ালাম গিজার গ্রেট পিরামিডের সামনে। মনে হচ্ছিল একবার গায়ে চিমটি কেটে দেখি যে, সত্যি নাকি স্বপ্ন। ছোটবেলা থেকে এই পিরামিডের কত ছবি দেখেছি। কত গল্প কথা শুনেছি এই পিরামিডকে নিয়ে। আমাদের শৈশব-কৈশোরের ভ্রমণের জায়গা মানে ছিল পুরী বা দার্জিলিং। খুব বেশি হলে হয়তো বা দিল্লি বা বেনারস। পিরামিড কোনও দিন দেখব, তখন তা এক অবিশ্বাস্য কল্পনা। হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম পিরামিডের গায়ের একটা পাথর খণ্ড। কেমন যেন শিহরন জাগল শরীরে। আইসিস কিছুটা যান্ত্রিকভাবেই বলতে শুরু করল, স্যার, আপনি এখন দাঁড়িয়ে আছেন গিজার পৃথিবী বিখ্যাত গ্রেট পিরামিডের সামনে। এই পিরামিডের প্রাচীন নাম ‘আখেত খুফু’। অর্থাৎ ‘খুফুর দিগন্ত’। আনুমানিক খ্রিস্ট পূর্ব ২৬০০ অব্দে মিশরের সম্রাট ফ্যারাও খুফু চুনাপাথর ও গ্রানাইট পাথরে এই পিরামিড নির্মাণ করান। নির্মাণকালে এর উচ্চতা ছিল ১৪৭ মিটার। ১ লক্ষ শ্রমিক ২০ বছর ধরে এই পিরামিড নির্মাণ করে। প্রতিটি গ্রানাইট ব্লকের ওজন হচ্ছে ৮০ টন।
পাথরের ব্লকগুলোর ভিতর দিয়ে একটা খাঁজ কাটা রাস্তা বানানো হয়েছে অনুমানিক দোতলা বাড়ির সমান উচ্চতায় পিরামিডের গহ্বরে প্রবেশ করার জন্য। ইতিমধ্যে বহু মানুষ উঠতে শুরু করেছে সে পথে। আমি তাদের অনুসরণ করে পিরামিডের ভিতর প্রবেশ করলাম। দু’পাশে পাথুরে দেওয়াল। কিছুটা এগবার পর কাঠের পাটাতন বসানো একটা অপরিসর সুড়ঙ্গ ওপরে উঠে গিয়েছে। সোজাভাবে দাঁড়ানো বা ওঠা যায় না মাথার ওপরে ছাদ নিচু বলে। শরীর-সুস্থ স্বাভাবিক না থাকলে সে পথে ওঠা কষ্টকর। যাই হোক কোনক্রমে সে পথে উঠে অবশেষে প্রবেশ করলাম গ্রানাইট পাথর নির্মিত বিশাল এক কক্ষে। যেন টাইম মেশিন পিছিয়ে গেলাম সাড়ে চার হাজার বছর। কক্ষের ঠিক মাঝখানে পাথরের তৈরি একটা কফিন রাখা, তবে সেটা শূন্য। এ কক্ষের সব জিনিস নিয়ে যাওয়া হয়েছে কায়রো মিউজিয়ামে। মশালের মতো বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে ঘরে। তার আলোতে দেওয়াল আর ছাদের গায়ে জেগে আছে নানা ধরনের প্রাচীন মিশরীয়দের ছবির অলঙ্করণ।
বেরিয়ে এলাম। ইতিমধ্যে বাইরে বেশ ভিড় জমে গিয়েছে। একজন উটওয়ালার সঙ্গে দর কষাকষি করে উটের পিঠে উঠে বসলাম। সে আমাকে নিয়ে যাবে মাইলখানেক দূরে সেই জায়গায়, যেখান থেকে সরল রৈখিকভাবে সব পিরামিডগুলো একসঙ্গে দেখা যায়। তারপর সে আমাকে ফিরিয়ে আনবে স্ফিংসের সামনে। তবে উটে আরোহণ যে এত ভয়ঙ্কর, তা জানতাম না। আমি একলা উটের পিঠে। উঠ আর উটমালিক ছুটতে ছুটতে চলেছে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে। মনে হচ্ছিল আমার দেহের সব হাড় যেন খসে পড়বে! মনে পড়ে গেল ‘সোনার কেল্লা’য় লালমোহনবাবুর উটে চড়ার কথা। শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট স্থানে। সেখান থেকে দেখা যায় সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা পিরামিডগুলো। গ্রেট পিরামিড ছাড়া বাকি পাঁচটা পিরামিডের মধ্যে চারটি নির্মিত হয়েছিল ফ্যারাও খুফুর স্ত্রীদের জন্য। আর বাকি একটি নাকি ব্যবহৃত হতো মান মন্দির হিসাবে। উট আমাকে ফিরিয়ে এনে নামিয়ে দিয়েছিল স্ফিংসের সামনে। কাছেই এক প্রাচীন ভগ্ন গৃহের ছায়ায় বসে তাকিয়েছিলাম মানুষের মুখ আর সিংহের দেহধারী স্ফিংসের দিকে। হাজার হাজার বছর ধরে কত ঝড়বাদল মিশরের ইতিহাসের সাক্ষী। একদিন এই স্ফিংসের সামনে এসে নতজানু হয়েছিলেন সম্রাট নেপলিয়ানের মতো মহাবীরেরা, রোমানরা—এ সবই ভাবছিলাম সেই মূর্তির দিকে তাকিয়ে। 
হঠাৎ আইসিসের কণ্ঠস্বরে আমার চিন্তা জাল ছিন্ন হল। সে এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে। সঙ্গে আর একজন বয়স্ক মহিলা আর তাঁর কোলে একটা সদ্যোজাত শিশু। একটু থেমে বলল, আসলে আমি গত রাতেই কায়রো চলে গিয়েছিলাম, আজ সকালে আপনাকে নিয়ে এখানে আসব বলে। এটা আমার ছেলে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী নাম রেখেছ ছেলের? আইসিস তার সন্তানকে নিজের কোলে নিয়ে হেসে বলল, খুফু। ফ্যারাও খুফু। যিনি ওই গ্রেট পিরামিড নির্মাণ করেছিলেন। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ