অর্পণ সেনগুপ্ত, কলকাতা: দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি অডিট। অধ্যাপক আশুতোষ ঘোষ দায়িত্ব নেওয়ার পরে অডিটের চিঠি দিয়েছে রাজ্য সরকার। তার আগে তহবিলের হাল দেখে মাথায় হাত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। গত আড়াই বছরে ১৩৭ কোটির সঞ্চয় নেমে এসেছে ৩৬ কোটিতে। শুধু তাই নয়, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে লেনদেন হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। অডিটে এর কী উত্তর দেবেন, ভেবেই আকুল কর্তৃপক্ষ। তবে, আশু বন্দোবস্ত হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ কাটছাঁটের পথেই হাঁটছে তারা। পাশাপাশি জোর দেওয়া হচ্ছে আয় বৃদ্ধিতেও।
রাজ্য সরকারকে এড়িয়ে একতরফা অন্তর্বর্তী উপাচার্য নিয়োগ করেছিলেন রাজ্যপাল তথা আচার্য সি ভি আনন্দ বোস। এনিয়ে রাজ্য সরকারের করা মামলা হাইকোর্ট পেরিয়ে গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। খোদ রাজ্যপালও ছিলেন অন্যতম পক্ষ। সেই মামলার খরচ জোগাতে তাঁর নিয়োগ করা অন্তর্বর্তী উপাচার্যদেরই নজিরবিহীন নির্দেশ দিয়েছিলেন রাজ্যপাল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কেই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেই টাকা সংগ্রহ করে উকিলদের দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এরপরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনান্স অফিসার অভীক কুশারী তৎকালীন অন্তর্বর্তী উপাচার্য শান্তা দত্তের নির্দেশে একটি নিষ্ক্রিয় (ডরম্যাট) অ্যাকাউন্টকে সেই লেনদেনের জন্য ব্যবহার করেন। অ্যাকাউন্ট ডিটেইলসে দেখা যাচ্ছে, ছোটো বড়ো নানা বিশ্ববিদ্যালয় ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছে। যাদবপুরই দিয়েছে ৬০ হাজার টাকা। আর হিসেব করে দেখা যাচ্ছে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাত থেকে ২ লক্ষ ৮৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে এই মামলা লড়ার জন্য।
অ্যাকাউন্টস বিভাগের কর্মী-আধিকারিকরা, বিশেষ করে তৃণমূলপন্থী পক্ষ এভাবে ডরম্যান্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টাকা লেনদেনকে নিয়মবিরুদ্ধ বলেই দাবি করেছেন। এর বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েও কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি জমা পড়েছে। তবে, এ তো গেল অনিয়মের অভিযোগ। ফান্ড কমে যাওয়ার নানা কারণ রয়েছে। রাজ্য সরকার বেতন খাতে মোটামুটি বার্ষিক ১৮৭ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খরচ হিসেবে কমবেশি ৯৫ কোটি টাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে থাকে। এদিকে, সরকারের প্রদেয় ৫০০ কোটি টাকা দেখিয়ে ঘাটতি বাজেট করে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। তা সামাল দিতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের জমানো অর্থ ব্যয় হয়েছে। এছাড়া, অনেক নির্মাণ সংক্রান্ত খরচও হয়েছে এইসময়ের মধ্যে, যেগুলি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ১৯ কোটি টাকার একটি ‘মিসলেনিয়াস’ খরচ দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে সফটওয়্যার এবং আইনি খরচই মূল বলে দাবি অ্যাকাউন্টস অফিসারদের। তবে, ইআরপি’র সেই বহুমূল্য সফটওয়্যার একবছর ধরে ড্রাই রানই হয়ে যাচ্ছে বলে সূত্রের খবর। আর প্রত্যেক মাসে তার জন্য গুনতে হচ্ছে ৮০ হাজার টাকা।
বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেট বৈঠক শুরু হয়েছে। তার মূল উপজীব্যই হল খরচ কমিয়ে আয় বৃদ্ধি। বিভাগগুলিতে প্রদেয় অর্থেও রাশ টানা হবে। আয় বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ফান্ডিং এজেন্সি, বহুজাতিক সংস্থা এবং প্রাক্তনীদের কাছেও দরবার করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। উপাচার্য আশুতোষ ঘোষ বলেন, ‘আয় বাড়িয়ে খরচে রাশ টানাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’ তবে, তার আগে অডিটে যে অনিয়মের ছবি উঠে আসবে, তার ব্যাখ্যা বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে দেবে, সেই চিন্তায় ঘুম ছুটেছে আধিকারিকদের।