Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সরকার ফন্দিবাজ, বিরোধী ঐক্য জরুরি

ভারতের সংবিধানের ৩৬৮ অনুচ্ছেদে, সংবিধান সংশোধনে সংসদের সাংবিধানিক ক্ষমতার দিকটি উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকার ফন্দিবাজ, বিরোধী ঐক্য জরুরি
  • ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ভারতের সংবিধানের ৩৬৮ অনুচ্ছেদে, সংবিধান সংশোধনে সংসদের সাংবিধানিক ক্ষমতার দিকটি উল্লেখ করা হয়েছে। ৩৬৮ অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ (২)-এ অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে বলা হয়েছে—

Advertisement

(২) এই সংবিধানের সংশোধনী কেবলমাত্র একটি বিল... পেশের মাধ্যমেই শুরু করা যেতে পারে। বিলটি প্রতিটি কক্ষে, সেই কক্ষের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমর্থনে পাশ হতে হবে। সেই পাশ হতে হবে উপস্থিত সদস্যদের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোটে। অতঃপর, বিলটি পাঠানো হবে রাষ্ট্রপতির কাছে। বিলটিতে রাষ্ট্রপতি সম্মতি প্রদানের পরেই সংবিধান সংশোধিত হল বলে গণ্য হবে...।
সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করার জন্য উভয় কক্ষেই এনডিএ’র সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। লোকসভায় এনডিএ’র সংখ্যাগরিষ্ঠতা ২৯৩ (৫৪৩ সদস্যের মধ্যে) এবং রাজ্যসভায় ১৩৩ (২৪৫ সদস্যের মধ্যে)। প্রতিটি কক্ষের সকল সদস্য উপস্থিত থাকলে এবং তাঁরা ভোটদানে অংশ নিলে সংখ্যাটি দুই-তৃতীয়াংশের ‘ম্যাজিক’ সংখ্যার চেয়ে কম হয়ে যায়।
বিরোধী দলগুলির, মিলিতভাবে, লোকসভায় ২৫০ জন এবং রাজ্যসভায় ১১২ জন সদস্য রয়েছেন। যদি লোকসভায় ১৮২ জন এবং রাজ্যসভায় ৮২ জন এমপি বিলের বিরুদ্ধে ভোট দেন তবে বিলটি আর পাশ হবে না। দুর্ভাগ্য এই যে, সমস্ত বিরোধী দলই কিন্তু এনডিএ’র বিরুদ্ধে নয়! ওয়াইএসআরসিপি, বিজেডি, বিআরএস ও বিএসপি এবং কিছু ছোট দলের মধ্যে এনডিএ সরকারকে সমর্থন করার প্রবণতা আগেই দেখা গিয়েছে। এআইটিসি (তৃণমূল কংগ্রেস) এবং এএপি (আম আদমি পার্টি) নামক দল দুটি এনডিএ বিরোধী। কিন্তু তারা আইএনডিআইএ বা ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের সঙ্গে আছে কি না তা নির্ভর করছে ইস্যুটির উপর।
একটি বেপরোয়া জুয়া
এটি এরকম একটি পরিস্থিতি যেখানে খেলার জন্য এনডিএ সরকার একটি বল রেখে দিয়েছে। সেটি হল সংবিধান (১৩০তম সংশোধনী) বিল, ২০২৫। বিলটি পেশ করার পরই, সরকার সেটি বিবেচনার জন্য তড়িঘড়ি একটি জয়েন্ট সিলেক্ট কমিটির কাছে পাঠিয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে, এটি একটি সরল বিল এবং এর উদ্দেশ্যও সোজাসাপটা: একজন মন্ত্রীকে (প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী-সহ) অপসারণ করা, যিনি গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং, পাঁচবছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ড পেয়েছেন এবং, কারাগারে থেকেছেন ৩০ দিনের জন্য। ৩০ দিনের মধ্যে, অবশ্যই তদন্ত সম্পন্ন হবে না। জমা পড়বে না কোনও চার্জশিট। চার্জগঠনও সম্ভব হবে না। কোনও প্রকার ট্রায়াল বা বিচার সম্পন্ন হবে না। তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করারও প্রশ্ন থাকবে না। তবু ৩১তম দিনেই ওই মন্ত্রীকে পদচ্যুত করার আদেশ দেওয়া হবে, যা তাঁকে ‘অপরাধী’ দেগে দেবে।
বিজেপি বিলটিকে সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার চূড়ান্ত হিসেবে প্রচার করছে।
এর যুক্তি হল: একজন ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ মন্ত্রীকে অপসারণের চেয়ে মহত্তর লক্ষ্য আর কী থাকতে পারে? একজন মন্ত্রী (অথবা মুখ্যমন্ত্রী) কি জেল থেকেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারেন? এই বিলকে যাঁরা ‘হ্যাঁ (Aye)’ বলেন তাঁরা প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং জাতীয়তাবাদী আর যাঁরা ‘না (Nay)’ বলেন তাঁরা হলেন দেশবিরোধী, আরবান নকশাল কিংবা পাকিস্তানের দালাল।
বিপরীতক্রমে...
এনডিএ সরকারের অধীনে ফৌজদারি আইন কীভাবে কাজ করে তার সাধারণ অভিজ্ঞতা ভীতিপ্রদ। বর্তমানে—
• কার্যত, সকল আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—এমনকী জিএসটি আইনও;
• যেকোনও পুলিশ অফিসার (যাঁদের মধ্যে একজন কনস্টেবলও রয়েছেন) যেকোনও ব্যক্তিকে ওয়ারেন্টসহ কিংবা তা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারেন... যুক্তিসংগত সন্দেহ রয়েছে যে তিনি একটি কগনিজেবল বা আমলযোগ্য অপরাধ করেছেন;
• বিচারপতি কৃষ্ণ আয়ারের স্মরণীয় ঘোষণা—‘জামিনই নিয়ম, জেলই ব্যতিক্রম (bail is the rule, jail is the exception)’ থাকা সত্ত্বেও ট্রায়াল কোর্টগুলি জামিন দিতে অনীহা দেখিয়ে থাকে;
• প্রথম শুনানিতে হাইকোর্টগুলিও জামিন দেয় না। এছাড়া এক বা একাধিক অজুহাতে সরকার পক্ষকে, বিষয়টিকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ দিয়ে ৬০ থেকে ৯০ দিন পরে জামিন দিতে পারে;
• এই দুঃখজনক অবস্থার ফলে, প্রতিদিন শীর্ষ আদালতে অসংখ্য জামিনের আর্জি জমা পড়ে এবং মানুষের স্বাধীনতা দাবি করার প্রথম ভরসার আদালতে (কোর্ট অফ ফার্স্ট রিসোর্ট) পরিণত হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট; এবং
• বিলে প্রধানমন্ত্রীর নাম ঢুকিয়ে রাখার ব্যাপারটা সত্যিই হাস্যকর। কেননা, প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করার হিম্মত কোনও পুলিশ অফিসারই দেখাতে যাবেন না।
অটল থাকুন
বিলটিকে পরাজিত করার জন্য ‘ইন্ডিয়া’ ব্লক এবং তৃণমূল কংগ্রেস সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে। তবে, এনডিএ সরকার আত্মবিশ্বাসী যে তারা বিলটি পাশ করার একটি উপায় খুঁজে পাবে। তারা প্রতিটি কক্ষে কিছু বিরোধী দল বা সাংসদদের মন জয় করার জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করতে পারে। অথবা কিছু বিরোধী এমপিকে ‘অদৃশ্য’ করার জন্য একটি ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান স্কিম’ তাদের থাকতে পারে। মতলব একটাই, সরকার বিলটি পাশ করাবার ব্যাপারে যেন সফল হয়। অথবা তাদের এমন একটি কৌশল রয়েছে যা আমার জ্ঞানগম্যির বাইরে।
প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন এবং ‘নিজের পেটোয়া’ মিডিয়া মারফত তা সম্প্রচারিতও হয়েছে যথাযথরূপে। বিহার (২০২৫) এবং অসম, কেরল, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গ (২০২৬) রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের পর পর্যন্ত (ওয়ান-নেশন-ওয়ান-ইলেকশন জেপিসির মতো) বিষয়টিকে সিলেক্ট কমিটি জিইয়ে রাখতে পারে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক রিপোর্টে (২২ আগস্ট, ২০২৫) বলা হয়েছে যে, ২০১৪ সাল থেকে, বিরোধী দলের বারোজন মন্ত্রীকে জামিন ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে, এবং অনেক জনকে আটক রাখা হয়েছে বেশ কয়েকমাস যাবৎ। এদিকে আর একটি রিপোর্ট বলছে, ২০১৪ সাল থেকে এমন ২৫ জন রাজনৈতিক নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৩ জনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে! যতদূর মনে পড়ছে, ২০১৪ সাল থেকে বিজেপির কোনও মন্ত্রীকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি।
বিলটি পাশ হলে বেলারুশ, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কঙ্গো (ডিআরসি), মায়ানমার, নিকারাগুয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, রোয়ান্ডা, উগান্ডা, ভেনিজুয়েলা, জাম্বিয়া এবং জিম্বাবোয়ের মতো দেশগুলির পংক্তিভুক্ত হবে ভারত। উল্লেখ্য, বিরোধী নেতাদের নিয়ম করে জেলে পাঠায় ওই দেশগুলি। বিরোধিতা করবে বলে যেসব রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে, তারা তাদের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকলে সংবিধান (১৩০তম সংশোধনী) বিলটি পাশ হবে না। বিলটি পুনরায় উত্থাপন করা হলে, একটি বাতিল জিনিস পেশ করা হয়েছে (ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ডেড অন অ্যারাইভাল’) বলে ধরে নেওয়া হবে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ