নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: ষোড়শী কন্যা রূপে পুজোর সূচনা করিয়েছিলেন জগজ্জননী স্বয়ং। অষ্টমী পুজোর দিন গৃহবধূর বেশে, কখনও আবার পথচারীর ছদ্মবেশে ছলনা করে শাড়ি চান। পুজোর কয়েক দিন নাটমন্দিরের সিসি ক্যামেরা বন্ধ করান নিজের ইচ্ছেমতো। পানিহাটির প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির ছলনাময়ী দুর্গাকে ঘিরে এরকম হাজারো মিথের ছড়াছড়ি। ভক্তরা মনে করেন দুর্গা এখানে খুব জাগ্রত।
দেবীর ভোগে থাকে বাহারি আয়োজন। পুজোর চারদিন ইলিশ, চিংড়ি, ভেটকির রাজকীয় পদ। বিদায়ের আগে পান্তা-কচুশাকে তৃপ্ত করা হয় তাঁকে। তাঁর বাহনও চমকদার। সাদা রঙের ঘোড়ামুখী সিংহ প্রাচীন রীতি বহন করছে এই বাড়ির।
পানিহাটির মহোৎসবতলা ঘাট লাগোয়া পুরাতনবাটির দুর্গাকে ঘিরে গল্পের শেষ নেই। ১৯০০ সালে এই বাড়ির সদস্য অম্বিকাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় পানিহাটি পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। প্রাচীন আমলের বাড়িতে রয়েছে ঠাকুরদালান। দালানটি সিমেন্টের। তবে দেবী যেখানে অধিষ্ঠান করেন সেটি এখনও মাটির। জন্মাষ্টমীতে কাঠামো পুজো করে মূর্তি গড়া শুরু হয় ঠাকুরদালানে। মহালয়ায় হয় চক্ষুদান। প্রতিপদ থেকে ঘট বসিয়ে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। প্রতিদিন সকালে চণ্ডীপাঠ। চতুর্থীতে অলঙ্কার সজ্জা। ষষ্ঠীতে হয় বোধন। সপ্তমী থেকে নবমী বাল্যভোগ ও ছত্রভোগ আয়োজন করার রীতি। বাল্যভোগে থাকে খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, নানা ধরনের তরকারি, পায়েস, চাটনি। ছত্রভোগে ভাত, শুক্তো, ডাল,পাঁচরকম ভাজা, তরকারি, কাতলা, রুই, ইলিশ, ভেটকি সহ নানা ধরনের মাছের পদ, চাটনি, পায়েস ও মিষ্টি। নবমীর রাতে রান্না হয় মুসুর ডাল, কচুশাক, চিংড়ি, চালতার টক। দশমীর সকালে পান্তাভাতের সঙ্গে ওই সব তরকারি খেয়ে সপরিবারে বিদায় নেন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কন্যা।
এই পুজোয় বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে অংশ নেন প্রতিবেশীরা। বাড়ির প্রবীণা কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন আধিকারিক মিঠু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বাড়ির মেয়ে নানা রূপে দেখা দেয়। শুনেছি, মা নিজে বাড়ির দালানে বসে পুজো শুরুর নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। আমি নিজে দেখেছি, অষ্টমী পুজোর দিন এক মাঝবয়সী অপরূপা মহিলা মণ্ডপে এসে শাড়ি চান। তখন বাড়িতে শাড়ি নেই বলেছিলেন কয়েকজন। তখন উনি আলমারিতে রাখা শাড়ি দিতে বলেন। আমি সেই শাড়ি এনে দেওয়ার কয়েক মুহূর্ত পর ওঁকে আর দেখা যায়নি। আরও একবার শাড়ি নিয়ে গিয়েছেন। সারাবছর সিসি ক্যামেরা চললেও পুজোর সময় ক্যামেরা কোনো অজ্ঞাত কারণে বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে উনি বরাভয়দায়িনী রূপে হাজির হন। পুজোর খরচ উনিই জুগিয়ে দেন। মন দিয়ে অনুভব করলে ওঁকে প্রতিমুহূর্তে উপলব্ধি করা যায়।’ নিজস্ব চিত্র