সুকান্ত বসু, কলকাতা: বৈচিত্র্যের দিক থেকে বরানগর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের (কাচের মন্দির) পুজো অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। এই আশ্রমে মা সারদাকে দশভুজা রূপে পুজো করা হয়। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী সত্যানন্দদেব প্রথম এভাবে পুজো শুরু করেন এখানে। দুর্গাপুজোর চারদিন মা সারদাকে নানা বেশে সাজানো হয়। সপ্তমীতে মাকে সাজানো হয় রাজরাজেশ্বরী বেশে। মায়ের মাথায় থাকে সোনার কিরীট, অঙ্গে বেনারসী। অষ্টমীতে মা সাজেন যোগিনী বেশে। সেদিন গৈরিক বস্ত্রে ভূষিতা উমা তপস্বিনী। নবমীর দিন মায়ের থাকে কন্যা রূপ। অর্থাৎ কুমারীর বেশে ও অলঙ্কারে সাজানো হয় মাকে। দশমীতে থাকে ষোড়শী বেশ।
বরানগর প্রাণকৃষ্ণ সাহা লেনে অবস্থিত এই আশ্রমের সভাপতি স্বামী সত্যপ্রকাশানন্দ ও সম্পাদক স্বামী সারদাত্মানন্দ জানান, প্রথা মেনে আমরা দশমীর দিন সকালে নবপত্রিকা ও ঘট নিরঞ্জন করি। এরপর শান্তিবারি প্রদানের পর আশ্রম প্রাঙ্গণে লাঠি খেলা, তরোয়াল খেলা, ধুনুচি নাচ হয়। সন্ধ্যায় হয় বিজয়া সম্মেলন। আশ্রমে পুজো হয় বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে। অষ্টমীর দিন এখানে কুমারী পুজো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। পাশাপাশি ওইদিন সারদা‑দুর্গাদেবীর এই পুজোয় সন্ধিপুজোর পর ১০৮টি প্রদীপ জ্বেলে দেবীকে আরতি করা হয়। এই পুজোকে ঘিরে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন গঙ্গা লাগোয়া এই আশ্রমে। আশ্রম সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৪১ সালে বীরভূমের সিউড়িতে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমে প্রথম দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন স্বামী অভেদানন্দের মন্ত্রশিষ্য স্বামী সত্যানন্দদেব। দুর্গাপ্রতিমা গড়েই সেই পুজো শুরু হয়েছিল। কিন্তু প্রতিমা পুজোর পর তা নিরঞ্জনের সময় তাঁর মনকে পীড়া দিয়েছিল। ব্যথিত হয়েছিলেন তিনি। তাই বীরভূমের ওই আশ্রমে শেষবারের মতো প্রতিমা পুজো করা হয় ১৯৪৪ সালে। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৪৫ সালে তিনি প্রতিমার বদলে সারদা মায়ের পটমূর্তিকে দুর্গারূপে পুজোর পদ্ধতি চালু করেন। তাঁর উপলব্ধিতে মা সারদা আর পাঁচজন সাধারণ মায়ের মতো নন। তিনি হলেন স্বামী বিবেকানন্দ বর্ণিত ‘জ্যান্ত দুর্গা’। ১৯৫৫ সাল থেকে মা সারদার দ্বিভূজা মূর্তিকে দুর্গাপুজোর সময় দশভুজা হিসেবে বিচার করে দুর্গারূপে পুজো করা হয়। ১৯৫৮ সাল থেকে পাকাপাকিভাবে এভাবেই দুর্গাপুজোর গোড়াপত্তন হয় বরানগরের শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমে (কাচের মন্দির)। এই প্রথা আজও অব্যাহত। এই আশ্রমে নিত্য পূজিতা মা সারদার মূর্তিকেই লক্ষ্মী ও সরস্বতীরূপে পুজো করা হয়।