নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: কার্তিক মাসের অমাবস্যার দীপান্বিতা তিথিতে রূপ বদলে ফেলেন দেবী হংসেশ্বরী। শান্ত, সৌম্য মাতৃকা মূর্তি হয়ে ওঠে প্রচণ্ডা, ভয়াল। তাঁর মুখে ওঠে মুখোশ। দাঁতের তলায় ধারণ করেন রক্তাক্ত লোলজিহ্বা। সারাবছরে এই একবারই রূপ বদলান দেবী।
দীপান্বিতা তিথিতে তাই তাঁর পুজো হয় তন্ত্রমতে। তিনি পুজো নেন ভয়াল চেহারা আর এলোচুলে। বছরের অন্যসময় তিনি দক্ষিণাকালী রূপে ভক্তমেলায় হাজির থাকেন। হুগলির সাবেক বংশবাটি বর্তমান বাঁশবেড়িয়ার দেবী হংসেশ্বরীর প্রতিমা বা পুজো শুধু নয়, মন্দিরের কাঠামোও বেনজির এবং বিচিত্র। ওই মন্দির আর পুজো ঘিরে আছে জনশ্রুতি। আর আছে প্রায় দু’শো বছরের ইতিহাস। যে ইতিহাস গড়ে তুলেছে শতাব্দী প্রাচীন অমলিন ঐতিহ্য।
সাবেক বংশবাটি বা গড়বাটির দেবী হংসেশ্বরীর রূপ ও পুজো বিষয়ে জানতে হলে পরিচিত হতে হবে এক সন্ন্যাসী রাজার সঙ্গে। ১৭৯২ সালে বাঁশবেড়িয়ার রাজা নৃসিংহদেব রায় পাড়ি দিয়েছিলেন কাশী। সেখানে তিনি তান্ত্রিক সাধক হিসেবে পরিচিতি পান। পরে ফিরে আসেন বাঁশবেড়িয়ায়। শুরু হয় হংসেশ্বরী মন্দিরের নির্মাণ কাজ। কিন্তু তিনি কাজ শেষ করতে পারেননি। অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন তাঁর স্ত্রী শঙ্করীদেবী। জনশ্রুতি, সন্ন্যাসী-রাজা নৃসিংহদেব স্বপ্নাদেশ পেয়ে বংশবাটিতে ফিরেছিলেন। দেবী কালীকে তন্ত্রমতে পুজো করা স্বাভাবিক। কিন্তু নৃসিংহদেব দেবীর পুজো, প্রতিমা এমনকি মন্দিরের গঠনেও চিরস্থায়ী করে দিয়েছিলেন তন্ত্র। সেই বেনজির শৈলী আজও তাক লাগায়।
কেমন দেখতে দেবী ও মন্দির? কোথায় জুড়ে আছে তন্ত্রের ষটচক্রভেদন ও মোক্ষলাভ তত্ত্ব? তন্ত্র মতে, মানবের সুষুম্নাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ষটচক্রের(ছয়টি) অবস্থান। কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত করে সহস্রাধার অর্থাৎ অন্তিম চক্রে যাওয়াই মোক্ষ। হংসেশ্বরী মন্দির ওই সুষুম্নাকাণ্ডের প্রতিরূপ হিসেবে নির্মিত। যার কুলকুণ্ডলিনীতে বিরাজমান দেবী। সহস্রদল পদ্মের উপরে তাঁর অবস্থান। যা আবার চর্যাপদের সাধনতত্ত্বকে স্মরণ করায়। পাঁচটি নাড়ির রূপক, পাঁচটি সিঁড়ি আছে। যা উপরের ভাগে গিয়ে গোলকধাঁধা তৈরি করেছে। সেটাই অন্তিমচক্র, যেখানে লিঙ্গস্বরূপ স্বয়ং লিঙ্গেশ্বর শিব থাকেন। উপনিষদ মতে, ‘হং’ অর্থ বীজস্বরূপ আর ‘সঃ’ শক্তিস্বরূপা। তাই হংসেশ্বরী অর্থাৎ পরিশুদ্ধ মোক্ষ। পাঁচতলা মন্দিরে ১৩টি মিনার আছে। প্রতিটির চূড়া পদ্মাকার। সেখানেও তন্ত্রসাধনার ইঙ্গিত সুস্পষ্ট।
প্রতিমা? মহাদেবের নাভিপদ্ম থেকে উত্থিত একটি শতদলে দেবী বিরাজমান। তাঁর এক পদ ভাঁজ করে পদ্মে রাখা। অন্যটি ঝুলন্ত। দেবী চর্তুভুজা, নীলবর্ণা। নিমকাঠে নির্মিত। মহাকাল শিব পাথর কুঁদে তৈরি। মন্দিরে আরও চর্তুদশ শিব বিরাজমান। দেবীর ওই ভঙ্গিমা কালীপ্রতিমার ক্ষেত্রে অভিনব। কারণ, মন্দিরের সমস্তটাই তন্ত্রধারকের তত্ত্বের স্থাপত্যময় উদাহারণ। সমস্তটাই এক সাধকের অর্জিত জ্ঞানের আধুনিক বর্ণপরিচয়। একদা কুলীন সপ্তগ্রাম বন্দর শহরের রাজভূম বংশবাটির গৌরব আজ অস্তমিত সূর্যের মতো। কিন্তু জাগ্রত হয়ে আছেন এক রূপ বদলানো দেবী। এক তন্ত্রসাধকের বিরল স্থাপত্যের অভিনব গঠনে দীপান্বিতা অমাবস্যায় ঐতিহ্যের আলো জ্বালেন মোক্ষস্বরূপা দেবী হংসেশ্বরী। নিজস্ব চিত্র