ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্র বৈদিক উপনিষদ। বিরাট ব্রহ্মাণ্ড ও দৃশ্যমান স্থাবর জঙ্গম জীবজগৎ প্রভৃতি কে কবে সৃষ্টি করিলেন, কে পালন করেন, কে সংহার করেন এবং তাঁহার সহিত ইহাদের সম্বন্ধ কি ইত্যাদি দুর্জ্ঞেয় বিষয় আর্য ঋষিগণ তাঁহাদের ধ্যানলব্ধ সত্যের আলোকে ব্যাখ্যা করিয়া উপনিষদের আলোকে জগতের ধর্ম দর্শনের ইতিহাসকে উদ্ভাসিত করিয়াছেন। ঈশ্বরে বিশ্বাসহীন ব্যক্তির পক্ষে না হউক্ কিন্তু ঈশ্বরবিশ্বাসী আর্য মাত্রেরই অবলম্বন একমাত্র উপনিষদ্ এবং তদনুগামী তন্ত্র-পুরাণাদি। উপনিষদ্ বা শ্রুতি এবং তন্ত্রাদি শাস্ত্র হইতে জানা যায় সকলের আদিকারণ ব্রহ্ম একাকী আনন্দ পাইলেন না। তাঁহার সৃষ্টি প্রভৃতি লীলার সহকারিণী পাইবার জন্য নিজেই পুরুষ ও প্রকৃতি রূপে দ্বিধা বিভক্ত হইলেন। দ্বিধা বিভক্ত হইলেও অদ্বৈত ভাব ঠিকই থাকিল ('একাকী নৈব রমতে আত্মানং দ্বেধা করোৎ' ইত্যাদি, 'একমেবাদ্বিতীয়ম্'-শ্রুতি) এক দুই হইল আবার দুই মিলিয়া এক। যেমন ছোলা একটি মাত্র কিন্তু তার বল্কলের মধ্যে দুইটি দল। পুরুষ বা ব্রহ্ম এবং প্রকৃতি বা ব্রহ্মশক্তি বস্তুতঃ এক ও অভিন্ন, কেবল লীলার জন্য পৃথক্ অবস্থিতি মাত্র। তুরীয় ব্রহ্ম তাঁহার সহিত অভিন্না। মহাশক্তির দ্বারাই সৃজন পালন ও সংহারাদি লীলা করেন। এবং মহাপ্রলয়ে এই শক্তি ব্রহ্মভূতা হইয়া যান। তন্ত্রমতে এই আদ্যাশক্তি ব্রহ্মের সহিত অবিনাভূতা অর্থাৎ কেহ কাহাকেও ছাড়িয়া থাকেন না। ভক্তিবাদী শ্রীরামানুজাচার্য বাসুদেব ব্রহ্মের সমবায়িনী এই মহাশক্তি শ্রীদেবীকে ভগবান্ ও জীবসমূহের মধ্যে সেতুরূপা বলিয়াছেন। সন্তানবৎসলা মাতা যেমন দুষ্ট সন্তানকে পিতার প্রিয় হইবার জন্য সচ্চরিত্র হইতে উপদেশ সহ তাহাকে শোধন করিতে সচেষ্ট হন এবং দণ্ডদাতা পিতার নিকট গিয়া সন্তানকে ক্ষমা করিয়া গ্রহণ করিতে অনুরোধ জানান, ধেনু যেরূপ নবজাত বৎসের গাত্রস্থিত ময়লা জিহ্বার দ্বারা লেহন করিয়া পরিষ্কার করে, সেইরূপ করুণাময়ী জগজ্জননী মহাদেবী জীবসমূহকে দোষমুক্ত করিয়া দণ্ডদাতা ভগবানের নিকট তাঁহার কৃপালাভের জন্য অর্পণ করেন। এই পরাশক্তি ব্রহ্মের লীলার উপযোগী মূর্তি, গুণ, ধাম, উপকরণ ও পরিকর ইত্যাদি রূপে প্রকাশিত সন্ধিনী, অনন্ত জ্ঞানশক্তি বা সম্বিৎ এবং আনন্দরূপা হ্লাদিনী এই তিন নামে অভিহিতা হয়েন। ইনি অন্তরঙ্গা শক্তি। ব্রহ্মের বহিরঙ্গা বা অপরা মায়াশক্তির কার্য সৃজন পালন সংহারাদি। ব্রহ্মের জীবশক্তির নাম তটস্থা শক্তি। নদীর তট যেরূপ জলভাগ ও স্থলভাগের মধ্যবর্তী, জীবসমূহ সেইরূপ ভগবান্ ও তাঁহার মায়ার মধ্যে আছে। যাহারা সাধনার দ্বারা ভগবানের প্রতি অগ্রসর হয়, তাহারা সংসারমুক্ত হইয়া ভগবান্কে পাইয়া মায়াকবলিত হয় না। তাহারা সংসারসমুদ্রে হাবুডুবু খায় না। তন্ত্রের মতে ব্রহ্মকে লাভ করিতে হইলে প্রথমে তাহার শক্তির উপাসনা করিতে হয়। শক্তি প্রসন্না হইলে বিদ্যারূপে শ্রীশ্রীমহামায়ার মহাস্তোত্রে মহানামাবলী ব্রহ্মপ্রাপ্তি করান। “শক্তি জ্ঞানং বিনা দেবী মুক্তির্হাস্যায় কল্পতে।" সার কথা ব্রহ্ম ও তাঁহার শক্তি সূর্য ও সূর্যরশ্মি, চন্দ্র ও জ্যোৎস্নার মত অভিন্ন হইলেও শক্তির উপাসনার মাধ্যমেই শক্তিমান্ ব্রহ্মের কৃপালাভ ঘটে। ঈশ্বরের নানা মুর্তি ধ্যান, পূজা, মন্ত্র, জপ ইত্যাদি আরাধনা সকল প্রকারই শক্তির মধ্যে। "ব্রহ্মবিষ্ণুশিবা রাজন্ প্রধান ব্রহ্মশক্তয়ঃ"-বিষ্ণুপুরাণ।


