শ্রীরামকৃষ্ণদেব এ যুগের আদর্শ দিলেন ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’। পদব্রজে ভারত পরিভ্রমণ কালে বিবেকানন্দ সারা ভারতে ভয়াবহ দারিদ্র্যের রূপ প্রত্যক্ষ ক’রে অন্তরে গভীর বেদনা অনুভব করেন। দেশের এই ভয়াবহ দারিদ্র্য মোচনের উপায় চিন্তনে তিনি উপলব্ধি করলেন রামকৃষ্ণদেবের ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ মন্ত্রের নিগুঢ় মর্ম। উদগীত হল তাঁর কণ্ঠে সেই পরম উপলব্ধি—“বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?/ জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।” মেঘমন্দ্রিত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন সপ্তর্ষিমণ্ডলের ঋষি—“পড়েছ ‘মাতৃদেবো ভব’, ‘পিতৃদেবো ভব’, আমি বলি ‘দরিদ্রদেবো ভব’, ‘মূর্খদেবো ভব’। দরিদ্র, মূর্খ, অজ্ঞানী, কাতর—ইহারাই তোমার দেবতা হউক, ইহাদের সেবাই পরম ধর্ম জানিবে।” ভারতবাসীর দারিদ্র্য-দুঃখ দূর করার জন্য বনের বেদান্তকে ঘরে আনলেন বিবেকানন্দ প্রভুর দেওয়া “শিবজ্ঞানে জীবসেবা” মন্ত্রে কর্মযজ্ঞের প্রবর্তন ক’রে। নরদেহে শ্রীসত্যানন্দদেবের লীলা অনুধাবন করলে দেখা যায় দীননারায়ণের প্রতি তাঁর ছিল আশৈশব অশেষ করুণা। স্কুল-কলেজ জীবনে টিফিনের পয়সাগুলি নিজে অভুক্ত থেকে পথে দীন দুঃখীদের দান করতেন। আবাল্য-তপস্বী সত্যানন্দদেবের মনুষ্যেতর প্রাণীর প্রতিও ছিল সমান প্রেম। পথের মুমূর্ষু কুকুরকে দোকান থেকে খাবার কিনে খাইয়ে তবে ফিরেছেন বাড়ী সারাদিনের স্নানাহার-রিক্ত তপোক্লিষ্ট দেহটি নিয়ে। ছোটবেলা থেকেই ভালবেসেছিলেন বিবেকানন্দকে। তখন থেকেই স্বামীজীর ছবি বুকে নিয়ে বেড়াতেন। স্বামীজীর বিশাল নেত্রে অনুভব করতেন সমস্ত জগতের দুঃখে যেন অভিভূত হয়ে আছে সে দৃষ্টি। পরবর্তীকালে সন্তানদের কাছে স্বামীজীর এসব কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ দুটিও হয়ে উঠত করুণার্দ্র।


