এতকাল জানা ছিল, লজ্জা নাকি নারীর ভূষণ। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সৌজন্যে এখন শোনা গিয়েছে, এমন দিন আসছে যখন ইংরেজি বলতে মানুষ লজ্জা পাবেন! দিন দশেক আগে ইংরেজি ভাষা নিয়ে শাহের বক্তব্যে তোলপাড় পড়ে গেলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থামতে নারাজ। বৃহস্পতিবার আবারও তিনি বলেছেন, ভাষাজনিত কারণে ‘মানসিক দাসত্বের মনোভাব’ থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। অমিত শাহ যা বলেছেন, তা কি শাসক গোষ্ঠীর মন্ত্রী-নেতারা মেনে চলছেন বা চলবেন? ধরা যাক, এমনই এক আষাঢ়-সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে একান্তে আলোচনায় বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তত্ত্ব অনুযায়ী, সেই বৈঠকে কি ইংরেজিতে কথা বলতে লজ্জা পাবেন প্রধানমন্ত্রী? নাকি বক্তব্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সেটাই হবে সঠিক ভাষা? প্রশ্ন উঠেছে, অমিত শাহের বক্তব্য ঠিক হলে বর্তমানে মোদি সরকারের একাধিক শীর্ষস্তরের মন্ত্রীর ছেলেমেয়েকে কেন বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠানো হয়? অমিত তনয় জয় শাহ বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থা (আইসিসি)-র প্রধান হয়ে ইংরেজিতে কথা বলার জন্য কি প্রতিনিয়ত লজ্জা পান? শাহ যাকে দাসত্ব বা শৃঙ্খল বলছেন, সেই ভাষাকেই ‘শক্তি’র উৎস বলে মনে করে বিরোধীদের অনেকে। এই শক্তি একজন ব্যক্তিকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, কাজ ও ব্যবহারিক জগতে বাড়তি সুবিধা দেয়, যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করে। তাই মাতৃভাষার সঙ্গে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ও তার অনুশীলন একান্ত জরুরি— মত বিরোধীদের।
শাহ যা বলেছেন, তা আসলে বিজেপি তথা আরএসএস-এর দর্শনের কথা। সেই দর্শনের মূল কথাই হল, ‘হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান’। আর ‘এক দেশ, এক ভাষা’ হিসাবে হিন্দিকে প্রতিষ্ঠিত করা। সেই দর্শনে ইংরেজি হল বিদেশি ভাষা যা অবশ্যই বর্জন করা উচিত। এই দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করতে জাতীয় শিক্ষানীতিতেই তৃতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার এই কৌশলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সরব তামিলনাড়ু, কর্ণাটক সহ দক্ষিণের প্রায় সব রাজ্য। তামিলনাড়ুতে সরকারি স্কুলে হিন্দি ভাষা চালু করতে রাজি না হওয়ায় সে রাজ্যের শিক্ষাখাতে দু’ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্র আটকে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। শুধু স্কুলপাঠ্যে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়াই নয়, মোদি জমানায় সরকারি বিজ্ঞপ্তি, সরকারি প্রকল্প, নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও হিন্দি ভাষার ব্যবহার চলছে জোরকদমে। অভিযোগ উঠেছে, অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে!
পরিকল্পনা যে কত গভীর বোঝা যায় ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের ভূমিকা থেকেই। আরএসএস মনে করে, হিন্দুত্বের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে সংস্কৃত। হিন্দি হল মুখোশ, মুখ সংস্কৃত। অথচ এখন এই প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা পড়ানো হয় মাত্র দু’ একটি শ্রেণিতে। সংস্কৃত পড়ে শিক্ষকতা বাদে অন্য চাকরির সুযোগও তেমন নেই বললেই চলে। তবু জনমানসে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ‘প্রায় মৃত’ বলে পরিচিত এই ভাষা পুনরুজ্জীবনের জন্যই হাত উপুড় করে দিয়েছে মোদি সরকার। এতে অবশ্য কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে সরকারি তথ্যেই জানা যাচ্ছে, মোদি জমানায় ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে অর্থাৎ মোট এগারো বছরে শুধু সংস্কৃত ভাষা চর্চার জন্যই খরচ করা হয়েছে ২৫০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ। অথচ এই সময়ে দক্ষিণ ভারতের মোট পাঁচটি ভাষার জন্য কেন্দ্রের বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৪৭ কোটি টাকা! ভাষাগুলি হল, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়লম ও ওড়িয়া। তথ্য বলছে, ২০০৪ সালে দেশে প্রথম ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি পায় তামিল। পরের বছর সংস্কৃত। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এই তকমা পায় কন্নড়, তেলুগু, মালয়লম ও ওড়িয়া ভাষা। এর প্রায় দশ বছর পর ২০২৪-এ মারাঠি, পালি, প্রাকৃত, অসমিয়া ও বাংলা ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা পায়। সংস্কৃতের জন্য ঢালাও অর্থবরাদ্দ হলেও এই ভাষাগুলির ক্ষেত্রে বরাদ্দ অর্থের পরিমাণে বৈষম্য রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। সরকারি নানা তথ্যই বুঝিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় সরকারের আসল মতলবটা কী। অমিত শাহের মন্তব্য অনুসারে আগামী দিনে ইংরেজি বলতে লজ্জা পাওয়ার কারণের অন্তর্নিহিত বীজও লুকিয়ে রয়েছে এইসব ধারাবাহিক সরকারি কর্মকাণ্ডের মধ্যে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশ যত এগতে থাকে, ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তত অনুভূত হয়। বিশ্বায়নের ধাক্কায় তাই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের এত রমরমা। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। সেই বাস্তব সত্যটিকে আড়ালে রেখে হিন্দি ভাষার পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে তিনি যেভাবে ইংরেজি ভাষা প্রসঙ্গে ‘দাসত্বের মনোভাব’ রয়ে গিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তা থেকে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বলাই বাহুল্য, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টিতে বিজেপি বরাবরই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সেই বিতর্ককেই উস্কে দিয়েছে।