সম্প্রতি পেরিয়ে এলাম আন্তর্জাতিক চা দিবস। বিকেলের চায়ের আসর ও তাকে ঘিরে মহিলাদের সাংস্কৃতিক ও মানসিক আদানপ্রদান বিশ্বজুড়েই স্বতন্ত্র মাত্রা বহন করে।
সম্প্রতি পেরিয়ে এলাম আন্তর্জাতিক চা দিবস। বিকেলের চায়ের আসর ও তাকে ঘিরে মহিলাদের সাংস্কৃতিক ও মানসিক আদানপ্রদান বিশ্বজুড়েই স্বতন্ত্র মাত্রা বহন করে।
ক কাপ চা। আর তাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে একটা গোটা সংস্কৃতি। তর্ক থেকে আড্ডা— চায়ের কাপে তুফান তুলেই যেন দারুণ এক স্বস্তি। নানা ইতিহাসেরও সাক্ষী এই চা। তবে আমাদের দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে যার এত নিবিড় যোগ, তার আবিষ্কার কিন্তু ব্রিটিশদের হাতেই হয়েছিল। তার আগে চীন দেশেই একমাত্র চায়ের উৎপাদন হতো। ১৯ শতকে এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী অসমে চা পাতার গাছ দেখে সেই উৎপাদনই বাড়িয়ে তোলেন। ক্রমশ পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চল দার্জিলিঙেও চায়ের চাষ শুরু করা হয়। অসম ও দার্জিলিঙের চা ক্রমশ ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সান্ধ্যকালীন আড্ডার মূল পানীয় হিসেবেও নিজের স্থান গড়ে তুলতে চায়ের খুব একটা সময় লাগেনি। টি ক্লাব গড়ে ওঠে শহরের বিভিন্ন জায়গায়।
শুরুর কথা
চা-চক্র বা চা ঘিরে আড্ডার কথা যখন উঠলই তখন একটা মজার তথ্য জানাই, বাঙালি সংস্কৃতিতে বৈকালিক চায়ের আসর বা আড্ডার সঙ্গে মহিলাদের এক সময় গভীর যোগ গড়ে উঠেছিল। এটা যে সময়ের কথা বলছি তখন মহিলারা অন্দরমহলের চার দেওয়ালের ভিতরেই মূলত বাস করতেন। বাইরের জগতের সঙ্গে তাঁদের সেই অর্থে যোগাযোগ ছিল না। রাঁধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধা— এই নিয়েই ছিল তাঁদের জীবন। এহেন বৈচিত্র্যহীন জীবনে বিকেলের চায়ের আড্ডা মহিলাদের কাছে ছিল খোলা হাওয়ার মতো। তাঁদের জীবনে ক্রমশ এই আড্ডা এক সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।
সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান
বাড়ির কাজে সারাটা দিন নাজেহাল বাড়ির গিন্নিরা এই বিকেলের সময়টা একখণ্ড অবসর উপভোগ করতেন। কর্তামশাই আপিস থেকে ফেরেননি। ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে খেলতে বেরিয়েছে। সংসারের কাজেরও তেমন তাড়া নেই। রাতের খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্তও খানিক বাদে শুরু করলেই চলে। অতএব বিকেলবেলায় ঘণ্টা খানেকের অবসর। আর সেই অবসর ঘিরেই জমে উঠেছিল গৃহিণীদের চায়ের আড্ডা। তাতে গালগপ্পর পাশাপাশি নানা সাংস্কৃতিক বিনোদনও যুক্ত থাকত। অনেকে একে-অপরকে সেলাইয়ের মতো সূচিকর্ম শেখাতেন। সদ্য বিবাহিতদের সংসারের পাঠ দিতেন আপাত সংসারী পাড়াতুতো কাকিমা বা ঠাকুমা স্থানীয়রা। রান্নাবান্না, ঘর গোছানো থেকে স্বামীর যত্ন করা, শ্বশুর-শাশুড়ির মন জুগিয়ে চলা, সংসারের আর পাঁচজনের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার পরামর্শও মিলত এই আড্ডায়। কারও বা গানের গলা ভালো, সে হয়তো দু’কলি গান গেয়ে চা চক্র আরও মধুর করে তুলল। পুজো পার্বণে সাজগোজের খবরাখবর থেকে শাড়ি গয়নার আলোচনা কোনও কিছুই বাদ যেত না। ঘরকন্নার পাশাপাশি গিন্নিরা অবসর বিনোদনের খোঁজ-খবরও নিতেন একে অপরের। কারও বাগানের শখ, কোন গাছে ফল ধরল, কোন ফুলটা বাগান আলো করে ফুটেছে, শীতে কেমন ডালিয়া বা চন্দ্রমল্লিকা লাগালেন তাঁরা বাগানে, এই সব খোঁজখবরই দেওয়া নেওয়া হতো। কেউ বা সাংসারিক অশান্তির কথা পাড়ার সইটিকে বলে খানিক হালকা হতেন। আবার কারও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ থাকলে তারও যে বিচার একেবারেই হতো না তাও নয়। পত্রপত্রিকায় কোনও গল্প পড়ে সে বিষয়ে আলোচনা হোক বা নিজের লেখা গল্প, রম্য, কবিতা ইত্যাদি পড়ে শোনানোই হোক, বক্তার পাশাপাশি শ্রোতার অভাব হতো না কোনও ক্ষেত্রেই।
চা এবং টা
চায়ের সঙ্গে টা-এর যোগ প্রবল। অর্থাৎ চা চক্র চলবে আর তাতে টুকটাক মুখরোচক খাবার থাকবে না তাও কি হয়? এই আড্ডায় গৃহিণীরা নিজেদের নিপুণ হাতে তৈরি নানারকম জলযোগের ব্যবস্থাও রাখতেন। খুব বেশি কিছু নয়, হয়তো বাড়ির সকলের জন্য বানানো কোনও নোনতা, ভাজা বা মিষ্টির থেকেই একাংশ তুলে এনে পরিবেশন করতেন তাঁরা এই চায়ের আড্ডায়। সেই থেকেই আবার রান্নার ক্লাসও শুরু হয়ে যেত। কারও ভালো লাগলে রন্ধন প্রণালী জানতে চাওয়া হতো খাবারটি যিনি বানিয়েছেন তাঁর কাছে। তিনি সংক্ষেপে সেই প্রণালী জানালে অন্য কেউ হয়তো পরে রান্নাটি বাড়িতেও বানিয়ে ফেলতেন। সেই থেকে রান্নার ধরনের আদান প্রদানও শুরু হয়। এই জিনিসটাই আবার বাড়তে বাড়তে একটা গোটা সংস্কৃতি তৈরি করে ফেলে। পাড়াতুতো রান্না, আঞ্চলিক রান্না ইত্যাদি নানা ধরন তৈরি হয়।
রেশটুকু থাক
সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গেই মহিলারাও সংসার ছাড়া অন্যত্র ব্যাপৃত হয়ে পড়েছেন। এখন তাঁরা ঘরে বাইরে সমানভাবেই কাজ করে অভ্যস্ত। ফলে ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছে মহিলা কেন্দ্রিক বিকেলের এই চা চক্র। তবু সংস্কৃতির রেশ আজও কিছুটা বজায় রয়েছে। বাঙালিদের (মহিলা পুরুষ নির্বিশেষ) আড্ডা এবং জমায়েতে তাই এখনও বড়সড় অংশ হয়ে রয়ে গিয়েছে চা।
কমলিনী চক্রবর্তী