মেঝেয় বসে আড্ডা দেওয়ার দিন কি বাঙালির গিয়েছে? গিয়েছিল বটে। ইদানীং আবার শহরতলি ও গ্রামবাংলার মেঠো সুরেই ফিরতে চাইছে খাস শহর। পুরনো দিনের মতো মেঝেতে বসে আড্ডা, বৈঠকী অনুষ্ঠান সবই আয়োজন করছে নবীন প্রজন্ম। কেমন করে সাজাবেন মেঝে? রইল পরামর্শ।
মেঝেয় বসে আড্ডা দেওয়ার দিন কি বাঙালির গিয়েছে? গিয়েছিল বটে। ইদানীং আবার শহরতলি ও গ্রামবাংলার মেঠো সুরেই ফিরতে চাইছে খাস শহর। পুরনো দিনের মতো মেঝেতে বসে আড্ডা, বৈঠকী অনুষ্ঠান সবই আয়োজন করছে নবীন প্রজন্ম। কেমন করে সাজাবেন মেঝে? রইল পরামর্শ।
ঘরের মেঝেতে আয়েশ করে বসে বা আরাম করে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে গপ্পগাছা। আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরের নিয়মিত দৃশ্য ছিল। মাঝের সময়টা বিশ্বায়ন আর প্রযুক্তির হাত ধরে কিছু তছনছে প্রগতি এল বটে, জীবন থেকে হারিয়ে গেল অনেকগুলো ছোট ছোট শান্তির অভ্যাস। তবে কালের নিয়মে আজকাল মানুষ ফের পিছন ফিরে তাকাতে শুরু করেছে। ঘরোয়া আড্ডায় তাদের মেঝের সাজে ফিরে আসছে ফরাস, তাকিয়া, মোড়া, নানা ধরনের শীতলপাটি।
আজকাল ৮০০-১০০০ স্কোয়্যার ফুটের ফ্ল্যাটে জায়গার বড় অভাব। তবু তা আন্তরিকতা দিয়ে ঢেকে দিতে চেয়ে মেঝের সাজে বৈচিত্র্য খুঁজে আনতে পারেন আপনিও। জায়গা যতই কম হোক, নান্দনিক আয়োজনে সেই কম জায়গায় মনের মতো করে সাজাতে পারেন মেঝে। সাধারণ উপকরণ দিয়ে বসার একটি দৃষ্টিনন্দন ও আরামদায়ক ব্যবস্থা করার সহজ উপায় জানালেন ইন্টিরিয়র বিশেষজ্ঞরা।
প্রাথমিক আয়োজন
ঘরের মেঝেতে আড্ডার আসর বসাতে চাইলে প্রথমে খেয়াল রাখতে হবে ঘরে ঘন ঘন বৈঠকী আড্ডা বসে কি না। যদি প্রায়শই অনেকজন একসঙ্গে বসে গান-বাজনা ও আড্ডার আসর বসান, তাহলে মেঝেয় সুন্দর নকশা আঁকা শীতলপাটি বা মোটা বুননের শতরঞ্চি বিছিয়ে নিন। ঘরের পরদা ও দেওয়ালের রঙের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফরাস ও শতরঞ্চির রং বাছুন। শখের মাঝে সাধ্য বাধা হয়ে না দাঁড়ালে বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি স্টোরে ঢুঁ মারলেও পেয়ে যাবেন মনের মতো নকশা কাটা মাদুর ও গালিচা। মেঝের চার ধার বাকি রেখে গোটা ঘরেই বিছিয়ে দিতে পারেন এমন কয়েকটি মাদুর বা গালিচা। আড্ডার জায়গা যদি অনেক বড় হয়, তাহলে আড্ডা মারার জন্য দুটো আলাদা ‘জোন’-ও তৈরি করতে পারেন। মাঝে ইনডোর প্ল্যান্ট সহ রেডিমেড ডিভাইডার দিয়ে আড্ডাজোনকে ভাগ করলেও দেখতে ভালো লাগবে।
মেঝে ঢাকার কাজ সাঙ্গ হলে মেঝের যে কোনও ধার ঘেঁষে রাখুন একটি ছোট ডিভান বা ম্যাট্রেস। ঘরের জানালা যেদিকে সেদিকে ম্যাট্রেস পাতলে আড্ডার ফাঁকে অতিথিরা বাইরের দৃশ্যপটও সহজেই দেখতে পাবেন। ম্যাট্রেস বা ডিভানের উপর সুদৃশ্য চাদর পেতে রাখুন। যেসব অতিথির সরাসরি মেঝেতে বসতে অসুবিধা, তাঁরা ওই ম্যাট্রেস বা ডিভানে বসতে পারেন। ডিভানের ধার ঘেঁষে বিভিন্ন আকারের ফ্লোর কুশন রাখুন। চাইলে ফরমায়েশ দিয়ে বানিয়েও নিতে পারে পছন্দের নকশা ও আকারের কুশন। ভেলভেট কিংবা অন্য কোনও সিল্কের কাপড় ব্যবহার করতে পারেন কুশন কভার হিসেবে। সুতির কাপড়ের সঙ্গে পুরনো কাতান শাড়ির পাড় কেটেও এমন কুশন কভার বানানো যায়। ছোট ছোট অনুজ্জ্বল চুমকি বা বোতামের সাজও একটু অন্যরকম লুক এনে দেবে কুশনের। ডিভানের সঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট পাশবালিশও রাখতে পারেন। বালিশের ওয়াড়েও রাখুন নতুনত্ব নকশা। বসা অবস্থায় হাতের বিশ্রামের জন্য এই পাশবালিশ খুবই কাজে আসবে।
বিশেষ নজরদারি
অনেকেরই শারীরিক নানা সমস্যার কারণে একটা বয়সের পর মেঝেয় পা মুড়ে বসা বারণ হয়। তাঁদের জন্য এই ফরাস বা ডিভানের ব্যবস্থা কার্যকরী হবে না। সেক্ষেত্রে ঘরের মাঝে কিছু মোড়া, ছোট ছোট টুল, চেয়ার রাখতে পারেন। আড্ডা যদি ঘরোয়া হয়, তাহলে অন্দরসজ্জা খুব নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখলে দেখতে ভালো লাগবে না। তাই আড্ডার মেজাজ বুঝে এই টুল, চেয়ারগুলো সাজান। মোড়ার উপর পুরু গদি দিন, তাতে গ্রামবাংলার গামছাছাপা কিংবা সুতির নকশা ব্যবহার করতে পারেন। ছোট ছোট চেয়ারেও আলাদা সুতির গদি ব্যবহার করতে পারেন। তবে চেয়ারে কোমরে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য কুশনও রাখতে পারেন। অনেকের পিঠে ব্যথা হয়। তাঁদের জন্য টুল বা মোড়ার চেয়ে বেতের কিংবা কাঠের চেয়ারের ব্যবস্থা রাখুন। কোনও বয়ঃজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি আড্ডার মধ্যমণি হলে, তাঁর জন্য ঘরের মাঝ বরাবর দেওয়ালের ধার ঘেঁষে রাখতে পারেন বেতের ইজি চেয়ার। তাতেও দিন প্রয়োজনীয় গদি ও কুশন। ঘরের ভিতরেই রাখুন মনের মতো ইনডোর প্ল্যান্ট। পাতাবাহার, নানা অর্কিড এক্ষেত্রে প্রথম পছন্দ হতে পারে। কোনও লতানো গাছকে দরজার কোণে রাখলে তা দেওয়াল ধরে বেড়ে প্রবেশপথকে আরও মোহময় করে তুলবে।
মেঝের সাজবদল
মেঝেকে কীভাবে ঢাকবেন, সাজাবেন, তা না হয় হল! কিন্তু যদি পুরনো বৈঠকখানা কিংবা ছোট্ট ডাইনিংয়ের মেঝের সাজও বদলাতে চান? তাহলে উপায়? বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকাল অনেকেই মার্বেলের মেঝের বদলে পার্টেক্সের মেঝে করছেন। এই মেঝে দেখতেও উজ্জ্বল। মার্বেলের মেঝের মতো খুব একটা ঠান্ডা ওঠে না। এছাড়াও ইদানীং বৈঠকখানার জন্য অনেক পরিবারেই ফ্লোর টাইলস পছন্দ করছে। ইচ্ছে হলে পুরনো মেঝে না উঠিয়েও সলিউশান দিয়ে ফ্লোর টাইলস পুরনো মেঝের উপরেই লাগিয়ে ফেলা যায়। তবে ঘরের ভিত স্যাঁতসেঁতে হলে ও বাথরুমের মেঝের বেলায় ভিট্রিফায়েড টাইলস এড়িয়ে চলুন। এগুলি পিছলপ্রবণ।
ইদানীং মেঝের সাজে উডেন ফ্লোরিং ও রাবার ফ্লোরিং খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। রাবার ফ্লোরিং পছন্দ করলে তার ঘনত্ব দেখে নিন। আপনার মেঝের উপযোগী কোনটা হবে, তা বিশেষজ্ঞ কারিগর বা ইন্টিরিয়র ডেকরেটরের থেকে জেনে নেবেন। সাধারণ টাইলসের চেয়ে সামান্য বেশি খরচেই রাবার ফ্লোরিং পাওয়া যায়। তবে দেখতেও সুন্দর হবে সঙ্গে বহুদিন চলবে, এমন চাইলে উডেন ফ্লোরিং বেশি কার্যকর। এক্ষেত্রে সলিড উড ফ্লোরিংয়ে খরচ একটু বেশি পড়ে ঠিকই, তবে এই মেঝে দীর্ঘস্থায়ী ও দেখভালও নামমাত্র।
ব্যস, প্ল্যানিং শেষ! এবার বুকপকেট ও মনের সঙ্গে বৈঠক করে সাধ ও সাধ্য মিলিয়ে সাজিয়ে ফেলুন বৈঠকী মেঝে!
মনীষা মুখোপাধ্যায়