নয়াদিল্লি: যন্তরমন্তরে ভেসে আসছে ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’। একপাশে স্বেচ্ছাসেবীদের অস্থায়ী ক্যাম্পে ব্যস্ততা, অন্যদিকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। কেউ পোস্টার লিখছেন, কেউ গলা ফাটাচ্ছেন। সাদা চার্ট পেপারের উপর সবুজ আর নীল স্কেচ পেনের আঁচড়ে পি হোসেন খান যেমন লিখলেন, ‘আমার প্রাক্তন প্রেমিকা আর এই সরকার, দু’জনেই হৃদয়হীন।’ লেখা শেষ হতেই চারপাশে হাসির রোল। কিন্তু ওই লেখার আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে ক্ষোভ, হতাশা আর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ। সে জন্যই চলছে প্রতিবাদ। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে। সোনাম ওয়াংচুকের সমর্থনে। এই প্রতিবাদের ভাষা নতুন করে লিখছে যুব সমাজ। মিম, রিল, ব্যঙ্গচিত্র, পপ কালচারের রেফারেন্স আছড়ে পড়ছে সেখানে। সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট। এই প্রতিবাদের চালিকাশক্তি এমন এক প্রজন্ম (জেন জি), যাঁরা জানেন হাসির মাধ্যমেও ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলা যায়।
২৭ বছরের হোসেন খানের কথায়, ‘সরকার যখন ছাত্রদের গুরুত্ব দিচ্ছে না, তখন হয়তো রসিকতার মাধ্যমেই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব। পাশাপাশি যাঁরা অন্ধভাবে সমর্থন করছেন, তাঁদেরও প্রশ্ন করা যায়।’ যন্তরমন্তরজুড়ে শত শত পোস্টার। কোথাও লেখা, ‘আমাকে কেউ টাকা দেয়নি, আমি বিনামূল্যে সরকারের সমালোচনা করছি।’ আবার কোথাও বলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘তু ঝুটি ম্যায় মক্কার’-এর পোস্টারে এডিট করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ধর্মেন্দ্র প্রধানের নাম। প্রতিবাদের অস্ত্র মহাভারতের দৃশ্যও। অর্জুনের জায়গায় ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বসিয়ে কৃষ্ণের সংলাপ—‘আগে পদত্যাগ করো।’ শুধু যন্তরমন্তরই নয়, প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের নানা প্রান্তে। সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে। রিল ও মিম প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে আন্দোলনকারীদের উপর ‘পুলিশি অত্যাচারের’ ছবি।
ক্ষমতার বিরুদ্ধে বারবার অস্ত্র হয়েছে রসিকতা। মুঘল দরবারে বীরবল হোক বা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের গোপাল ভাঁড়... ক্ষমতাকে এভাবেই বারবার প্রশ্ন করা হয়েছে কৌতুক আর বুদ্ধির জোরে। সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ থেকে ‘চরণদাস চোর’— ব্যঙ্গের আড়ালে শাসকের সমালোচনার উদাহরণ আরও রয়েছে। রুশ দার্শনিক মিখাইল বাখতিন এই প্রবণতাকে বলেছিলেন, ‘কার্নিভ্যালেস্ক’। হাসি, বিদ্রুপ যেখানে ক্ষমতার কাঠামোকে অস্বস্তিতে ফেলে। জেন জি সেই ঐতিহ্যকেই ডিজিটাল যুগের ভাষায় নতুন রূপ দিয়েছে। তাদের কাছে প্রতিবাদ মানে কেবল মিছিল নয়। মিম, রিল, পোস্টারও তাদের হাতিয়ার। প্রতিবাদের। প্রশ্ন করার। সরকারের সমালোচনার।