বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: ‘সোদপুর যেন হয় ভারতবর্ষের ম্যাঞ্চেস্টার।’ ১৯২৭ সালের দোসরা জানুয়ারি সোদপুর খাদি প্রতিষ্ঠানের আধুনিক ক্রাফট সেন্টারের উদ্বোধনে এ কথা বলেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। আর বলেছিলেন, ‘সবরমতি আমার সত্যের পরীক্ষা। আর সোদপুর আমার খাদি শিল্প ও স্বনির্ভরতার পরীক্ষা ক্ষেত্র।’ সেই সোদপুরে তাঁর প্রথমবার পা রাখার শতবর্ষ স্মরণ অনুষ্ঠান। তা শুরু হচ্ছে আজ, শুক্রবার।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের প্রিয় ছাত্র ছিলেন সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত। বেঙ্গল কেমিকেলের সুপারিনটেনডেন্টের বিপুল বেতনের পদ ছেড়ে গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে স্ত্রী হেমপ্রভাদেবীর সঙ্গে নিজেদের অর্থ খরচ করে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সোদপুর স্টেশনের পশ্চিমে ৩০ বিঘা জমির উপর আশ্রম গড়ে ওঠে। ১৯২৭ সালের দোসরা জানুয়ারি খাদির কর্মশালা উদ্বোধনে আসেন গান্ধী। সভা শুরুর আগে পানিহাটি পুরসভা, সোদপুর অ্যান্টি ম্যালেরিয়া সোসাইটি মানপত্র দিয়ে মহাত্মাকে অভিনন্দন জানায়। ওই অনুষ্ঠানেই উপস্থিত ছিলেন পণ্ডিত মতিলাল নেহরু, শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। সেদিন প্রায় ছ’হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল। গান্ধীজি বলেছিলেন, ‘এই স্থান শ্রীচৈতন্যর পদস্পর্শে পবিত্র হয়েছে। আপনাদিগকেও অনুরোধ করিতেছি, আপনাদের ঔদাসীন্যে এতবড় একটা মহৎ প্রচেষ্টা যেন ব্যর্থ না হয়। কলিকাতার বাজারে প্রতিদিন দশলক্ষ টাকার বিদেশি বস্ত্র বিক্রয় হয়। কিন্তু এমনি দুর্ভাগ্য আমাদের, সমস্ত বাংলা দেশে বৎসরে দশ লক্ষ টাকার খাদি বিক্রয় হয় না। ইহা অপেক্ষা আমাদের শক্তিহীনতা ও বুদ্ধিহীনতার প্রমাণ কি হইতে পারে? দেশের অধিকাংশ লোক অনাহারে জীর্ণ, অর্দ্ধাহারে জরাগ্রস্ত। সুতরাং এদেশের পক্ষে ম্যালেরিয়ার আক্রমণ—সে তো একান্ত স্বাভাবিক জিনিস। খাইতে দিবার ব্যবস্থা করিলে রোগের প্রভাবও কমিয়া যায়। খাদির ভিতরেই এই অন্নদানের শক্তি নিহিত রহিয়াছে।’ পরে এই সোদপুর খাদি প্রতিষ্ঠান অবিভক্ত বাংলা, বিহার, ওড়িশা ও অসমের খাদি আন্দোলনের মূলকেন্দ্র হয়ে ওঠে।
এই খাদি আশ্রমে শুধুমাত্র দেশজ পণ্যের উৎপাদন হতো তা নয়। পরাধীন ভারতের অন্যতম রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এই আশ্রম। গান্ধীজি বহুবার বলেছিলেন, ‘সোদপুর আমার দ্বিতীয় বাড়ি।’ তিনি ১৯২৭, ১৯২৯, ১৯৩৮, ১৯৩৯, ১৯৪৫, ১৯৪৬ এবং ১৯৪৭ সালে এই আশ্রমে এসেছিলেন। সপ্তমবারে তিনি ৬০ দিনের মতো ছিলেন। ১৯৩৯ সালের ২৭ থেকে ২৯ এপ্রিল এই প্রতিষ্ঠানে গান্ধীজি ও সুভাষচন্দ্র বসুর ঐতিহাসিক বৈঠক হয়। তারপর সুভাষ কংগ্রেস ত্যাগ করে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন ও পরবর্তীকালে ‘আইএনএ’ গঠন করেন। এছাড়া জওহরলাল নেহেরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ, শরৎচন্দ্র বসু, ডঃ শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়, খান আব্দুল গফফর খানের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতারা বিভিন্ন সময় এখানে নানা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিতে এসেছেন। পানিহাটির ইতিহাসবিদ ও সোদপুর খাদি প্রতিষ্ঠানের শুভানুধ্যায়ী ডঃ শেখর শেঠ বলেন, ‘সোদপুরের মাটিতে গান্ধীজির প্রথম পদাপর্ণের শতবর্ষের সূচনা হচ্ছে দোসরা জানুয়ারি। এই খাদি প্রতিষ্ঠানেরও শতবর্ষ চলছে। এর সংস্কারে রাজ্য সরকার প্রায় ৭৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে। আমরা মহাত্মার স্মৃতি সারা বছর মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব। পানিহাটির গর্বের ইতিহাস রক্ষায় সবার অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।’