সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: বিজেপি তথা মোদি সরকার জরুরি অবস্থার প্রবল সমালোচক। জরুরি অবস্থাকালে যে পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার প্রত্যেকটিকে সংবিধান হত্যা আখ্যাও দেওয়া হয়েছে। ১৯৭৬ সালে সেই সময়কালে সংবিধানের ৪২ তম সংশোধন করে ইন্দিরা গান্ধী সরকার একঝাঁক ধারা বদলে দিয়েছিল। যার অন্যতম ছিল বিচারবিভাগের অধিকার ও ক্ষমতা হ্রাস। ১৪, ১৯ এবং ৩১ নং ধারায় সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতি প্রয়োগের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করে সংসদ যে কোনও আইন তৈরি করতে পারে। এই সংশোধনীর পুনর্বিচারে আদালতে যাওয়া যাবে না। কেন্দ্রীয় আইনকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিতে হলে অন্তত সাতজন বিচারপতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বেঞ্চ বসাতে হবে। বিচারবিভাগের ক্ষমতা হ্রাস করার প্রয়াসের তীব্র সমালোচনা হয়। যদিও আবার জনতা দলের সরকার এসে ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর অনেকাংশ ফের পূর্বাবস্থায় নিয়ে যায়।
তারও আগে ১৯৭৩ সালে কেশবানন্দ ভারতী বনাম কেরল রাজ্যের মামলায় ২৪, ২৫ এবং ২৯ তম সংবিধান সংশোধনী এসেছিল সুপ্রিম কোর্টে রিভিউর জন্য। সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানায়, সংবিধানের মূল কাঠামো কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। বুধবার সংসদে পেশ হওয়া সংবিধানের ১৩০ তম সংশোধনী বিল নিয়ে বিতর্ক ও চাপানউতোর তুঙ্গে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা কোনও গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে ৩০ দিন পর তাঁদের পদচ্যুতি ঘটবে, এ আইনকে সংবিধানের মূল কাঠামো তথা মৌলিক অধিকারেরও লঙ্ঘন আখ্যা দিয়েছে বিরোধীরা। পক্ষান্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী কিরেন রিজিজু অথবা আইনমন্ত্রী অর্জুন মেঘওয়াল বলেছেন, দুর্নীতি প্রতিরোধেই এই আইন প্রয়োজন। দাগি মন্ত্রীর জেলে অবস্থান কালেও উচ্চপদে বসে থাকার দৃষ্টান্ত বিপজ্জনক। সাম্প্রতিককালে অরবিন্দ কেজরিওয়াল কিংবা হেমন্ত সোরেনদের কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেপ্তার করে। তাঁরা জেলে থেকেও দীর্ঘদিন ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর পদে। বিরোধীদের বক্তব্য, সংবিধানের ২১ নং ধারা আইনকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। দোষী প্রমাণিত না হলে কেউ দোষী নয়। সুতারং নিছক অভিযোগ অথবা সন্দেহের বশে কোনও মন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হলে, তাঁকে ৩০ দিনের বেশি সময় ধরে আটকে রাখা হল, অথচ পরে দেখা গেল তিনি নির্দোষ। তাহলে ৩১ দিনের মাথায় পদচ্যুতির সাজা হবে কীসের ভিত্তিতে? কংগ্রেসের মণীশ তিওয়ারি, এআইএমআইএমের আসাদউদ্দিন ওয়েইসি, রেভোলিউশনারি সোস্যালিস্ট পার্টির এন কে প্রেমচন্দ্রন, সমাজবাদী পার্টির ধর্মেন্দ্র যাদবরা বলেন, সংবিধানের ২১ নং ধারাই শুধু নয়, ৭৪ (১) নং ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি শুধুমাত্র মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শ মতোই কাজ করতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে গদিচ্যুত করার নির্দেশ দেবেন কখনও?
কিন্তু প্রশ্ন হল, এমন সময় কেন এই বিল আনল সরকার? এসআইআর নিয়ে এখন সরকারের লেজেগোবরে দশা। সেই দিক থেকে নজর ঘোরাতেই কি এই বিল? নাকি নীতীশকুমার এবং চন্দ্রবাবু নাইডুকে পরোক্ষে হুঁশিয়ারি দেওয়া?